মধুচাষি মুয়াজ্জিন হোসেনের সাথে লেখক
মধুচাষি মুয়াজ্জিন হোসেনের সাথে লেখক

মধুচাষি মুয়াজ্জিন

মো: জভেদ হাকিম

এ দেশ, সমাজ-সংসারে চলতে গিয়ে কত মানুষের সাথে দেখা; অতঃপর আলাপ-পরিচয় হয়, তার কোনো হিসাব থাকে না। নিয়মিত এ ধারার মধ্যে কদাচিৎ কিছু মানবের দেখা মেলে, যারা সত্যিই হতাশাগ্রস্ত তরুণদের জন্য আলোকবর্তিকা। তাদের জীবনী নিয়ে আলোচনা হতে পারে, আরো অনেক মানুষের জন্য পথ চলার শক্তি। আজ তেমনি এক তরুণের জীবনগল্প তুলে ধরব, যিনি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েও পড়ে থাকেন খোলা আকাশের নিচে। নাম তার মুয়াজ্জিন হোসেন। বাড়ি ঢাকা জেলার সাভার উপজেলায়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসিডেন্সি থেকে এমবিএ করেছেন। বর্তমানে এইচআরএমের ওপর পিএইচডি করছেন। তথ্য-প্রযুক্তির ওপরেও বেশ দখল রয়েছে। বেশ ভালো ভালো জায়গায় চাকরিও করেছেন, কিন্তু স্বাধীনচেতা এ তরুণের তা ভালো লাগত না। সর্বশেষ কর্মস্থলের অফিস বসের জারি সহ্য করতে না পেরে চাকরি ছেড়ে দেন। নিজে কিছু করব, এ মন্ত্রে বলীয়ান হয়ে নেট-পত্রিকাসহ আশপাশে খোঁজখবর নিতে শুরু করলেন। কী করা যায়? অনেক কিছু ঘেটে মধু চাষের প্রতি আগ্রহী হলেন। প্রশিক্ষণ নিলেন প্রশিকা থেকে। কাজও শুরু করলেন কিন্তু পরপর দুইবার তিনি হলেন ব্যর্থ। অদম্য মুয়াজ্জিন দমে যাওয়ার পাত্র নন। আরো বেশি মধু চাষের প্রতি আগ্রহী হয়ে নানা অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নিতে থাকলেন। ২০১৫ সালে তিনি মধু চাষের ওপর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সেমিনারে যোগ দিলেন। পরিচয় হলো প্রফেসর শাখাওয়াতের সাথে। তিনি মুয়াজ্জিনকে কিছু টিপস দিলেন। এর পর সে তৃতীয়বারের মতো মধু চাষে হাত দিলেন। এবার আর তাকে পিছু ফিরে তাকাতে হলো না। ‘পারিব না পারিব না এ কথাটি বলিও না আর/একবার না পারিলে দেখ শতবার’। বড় মনীষীদের জীবনের ইতিহাস তেমনটিই সাক্ষ্য দেয়। হতাশ হলে চলবে না। জীবনে সফলতার স্বাদ পেতে হলে ব্যর্থতার উটকো গন্ধ শুকার দৃঢ় মনোবল থাকা চাই। হুট করে আসা সাফল্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বুমেরাং। আজকাল পড়ালেখা শেষ করে চাকরির পিছু ছুটে তরুণের দল। চাকরি না পেয়ে বা কাক্সিক্ষত জায়গায় সুযোগ না পেলে হতাশায় ভোগে। কখনো কখনো তা অত্যন্ত মেধাবীদেরও অন্ধকার গলি চেনায়। মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ে। সন্তানকে নিয়ে মা-বাবার সুন্দর সাজানো স্বপ্নে বজ্রপাত পড়ে। ফলে দেখা দেয় পারিবারিক অশান্তি। হতাশাগ্রস্ত শিক্ষিত বেকার তরুণ-যুবকেরা পরিবারের পাশাপাশি দেশের জন্যও চরম বোঝা। একসময় তারা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডেও নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। অথচ ড. মো: ইউনুসের মতো যদি চিন্তা করতেন, চাকরি হলো আধুনিক দাসত্ব। তাহলে দাস হওয়ার জন্য আর হতাশ হয়ে জীবনটাকে অগোছালো করতেন না কেউ। শিক্ষিত বেকার যুবকদের প্রতি মুয়াজ্জিন বলেন, আমাদের দেশ অত্যন্ত ছোট, তাই চাকরির জায়গাও খুব কম। পড়ালেখা শেষ করার পর সবাই যে চাকরি পাবে, এরকম ভাবাটাও ঠিক না। তাই তিনি তরুণ-যুবকদের চাকরির পেছনে না ছুটে মধু চাষের প্রতি আগ্রহী হওয়ার পরামর্শ দিলেন। কারণ স্বল্পপুঁজিতে মধু চাষ বেশ লাভজনক একটি পেশা। ভালোমানের মধু পাইকার বা দাদনব্যবসায়ীদের কাছেই প্রতি কেজি সাত-আট শ’ টাকা দরে বিক্রি করা যায়। চাষপদ্ধতিও খুব জটিল নয়। শুরু করার আগে ভালোভাবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করাই যেন মধু চাষের মূল পুঁজি। সাফল্য তখনই ধরা দেবে, যখন ব্যর্থতা সইবার শক্তি থাকবে। এগিয়ে যাওয়ার পথ তখন সুগম হবে যখন কাজের প্রতি আগ্রহ ও একাগ্রতা থাকবে। আট ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয় হলেন মুয়াজ্জিন হোসেন। উচ্চ শিক্ষিত এই তরুণ নিজেই শুধু এগিয়ে চলছেন তা নয়, পথ দেখাতে পারেন অনেককেই। তিনি যেন শিক্ষিত বেকার তরুণ স্বাধীনচেতা যুবকদের জন্য হতে পারে এক নম্বর পথপ্রদর্শক।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.