নিয়োগ পরীক্ষাগুলো বিভাগভিত্তিক হোক
নিয়োগ পরীক্ষাগুলো বিভাগভিত্তিক হোক

নিয়োগ পরীক্ষাগুলো বিভাগভিত্তিক হোক

রাজু আহমেদ

চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে শূন্য আসন যে সংখ্যায় থাকুক তাতে আবেদনের সংখ্যা কোনোভাবেই লাখের নিচে থাকছে না। এতে প্রমাণ মিলছে, দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে; কিন্তু তুলনামূলক কর্মসংস্থান বাড়ছে কম। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষার সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারীদের দীর্ঘ বেকার জীবন কতখানি হতাশার তা অভিজ্ঞ মাত্রেরই সঠিক উপলব্ধির বিষয়। যন্ত্রণার বাড়তি অনুষঙ্গ হিসেবে আবেদনের শর্তে সংযুক্ত ৫০০-৭০০ টাকার ব্যাংক ড্রাফটের বাধ্যবাধকতা বেকার চাকরিপ্রার্থীকে চরম ভোগান্তিতে ফেলছে। আর্থিক সঙ্কটের সময়ে প্রায় প্রত্যেকটি চাকরির পরীক্ষা রাজধানী কেন্দ্রিক হওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে প্রার্থীদের সেথায় উপস্থিত হয়ে অংশ নেয়া জীবন-মরণের চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে। তা ছাড়া নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, ঘুষেররীতি, যুক্তির লাঘামহীন কোটাপদ্ধতি- এসব দিকের কথা না হয় আড়ালেই রইল। সুশাসনের অনুষঙ্গগুলো যখন কেবল কাগজে সাঁটা আর বক্তৃতার মঞ্চে ঝঙ্কারিত হয়েই তার কর্ম ক্ষান্ত করে সেখানে খুব বেশি ভালোর আশা থাকে না। 

চাকরি হোক বা না হোক, চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিতে পারার মধ্যে এক ধরনের প্রশান্তি আছে। অনিয়মের দুর্ভেদ্য দেয়াল ভুলে অন্তত চিত্তকে সান্ত্বনা দেয়া যায়, যোগ্য ছিলাম না বলেই লক্ষ্যে পৌঁছেনি। সবদিকের সুবিধার্থে প্রায় প্রতি শুক্রবার রাজধানীতে কোনো না কোনো নিয়োগ পরীক্ষা থাকে। বেকারদের রাজধানীতে ছুটতে হয়। ধার-কর্জের অর্থ ব্যয়ে দীর্ঘ ভোগান্তির পথ পাড়ি দিয়ে পরীক্ষার আসনে বসতে হয়। তিরিশ বছর পর্যন্ত এভাবেই স্বপ্নরা বেঁচে থাকে। কয়েক ডজন বার ব্যাংক ড্রাফট কাটতে হয়, দেশের শেষ সীমানা থেকেও জীবিকার স্থায়ী নিশ্চয়তার সন্ধানে রাজধানীতে আসতে হয়। পদে পদে ভোগান্তি বহাল দেখে যখন শুনতে হয় প্রশ্ন ফাঁস ছিল কিংবা দেখতে হয় কারো ‘মামার সুপারিশ কিংবা টাকার ক্ষমতা নতুবা বিশেষ ব্যানারের’ বদৌলতে চাকরি হয়ে গেছে, তখন ধিক্কার জাগে। যে রাষ্ট্র প্রত্যেক নাগরিককে তার কাছে ঋণী করল, সেই রাষ্ট্র এবার নাগরিকদের কাছে ঋণী হতে শুরু করে। নিয়ম-শৃঙ্খলার মাঝে প্রকাশ পায় দৈন্যভাব। অনিয়ম চড়ে বসে নিয়মের ঘাড়ে।
বেকার চাকরি প্রার্থীদের সুবিধার্থে এবং রাষ্ট্রের কল্যাণে অন্তত দুটো কাজ করতেই হবে।

প্রথমত, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত হিসেবে ব্যাংক ড্রাফটের প্রথা বাতিল করা সময়ের দাবি। প্রত্যেক আবেদনে ৫০০-৭০০ টাকা বেকারদের পক্ষে জোগাড় করা রীতিমতো কঠিন সংগ্রামের। এজন্য পরিবারের সদস্যদের কালো চেহারা দেখতে হয়, পরিচিতদের উপহাস সহ্য করতে হয়। কাজেই এ ভার বহন করার সামর্থ্য বেশির ভাগ বেকারের নেই। প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্র তার প্রয়োজনে যোগ্য কর্মী বাছাই করবে, সেখানে প্রায় হাজার টাকা বেকারের কাছ থেকে নেয়া হবে কোনো যুক্তিতে? ব্যাংক ড্রাফটের আয়োজন করে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার নামে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান চাকরি দেয়ার প্রতারণার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ খোঁজার সংবাদও মাঝে মধ্যে প্রকাশ পায়। এসবে আমরা অবাক হই না! কেননা রাষ্ট্র যখন দুর্নীতির সুযোগ দেয় তখন ঠগদের থেকে সুনীতি আশা করলে সেটা আব্দার হিসেবে অন্যায়ের মোড়কবদ্ধ হবে হয়তো!

দ্বিতীয়ত, যেসব নিয়োগ পরীক্ষায় অন্তত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা লাখের গণ্ডি স্পর্শ করে, সেসব পরীক্ষার আয়োজন বিভাগভিত্তিক করার সময়ের সবচেয়ে বড় এবং যৌক্তিক দাবি। দেশের বিভিন্ন বিভাগের প্রত্যেকটি থেকে ২০-৩০ হাজার পরীক্ষার্থীর রাজধানীতে গিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেয়া মোটেই সুখকর নয়। দেশের সামগ্রিক যোগাযোগব্যবস্থার কিঞ্চিৎ করুণ দশা, যানবাহনের প্রতিকূল পরিবেশ, পথে পথে জ্যামের ভোগান্তিতে নাকাল হওয়া এবং রাজধানীতে অতিরিক্ত জনসমষ্টির আবাসন সঙ্কটের যে তীব্র যন্ত্রণাতে চাকরি প্রার্থীদের অবতীর্ণ হতে হয়, তা বর্ণনাতীত দুঃসহ অভিজ্ঞতার। বিশেষ করে নারী প্রার্থীদের ক্ষেত্রে নানাবিধ প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে রাজধানীতে অবতীর্ণ হওয়া প্রায় অসম্ভবের কোঠায়। দেশের বিভিন্ন শহর থেকে ছেলেরা রাজধানীতে গিয়ে পরীক্ষার কেন্দ্র খুঁজে একাকী পরীক্ষা দিয়ে ফিরতে সক্ষম হলেও মেয়েদের সাথে তার অভিভাবক হিসেবে কাউকে না কাউকে যেতেই হয়। কেননা, নিরাপত্তার প্রশ্নে মেয়েদের নিরাপত্তা এখনো রাষ্ট্রের সর্বত্র সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এসব বিভিন্ন দিকের বিবেচনায় কর্তৃপক্ষের উচিত অন্তত বড় দাগের নিয়োগ পরীক্ষাগুলো বিভাগভিত্তিক আয়োজন করার ব্যবস্থা নেয়া। বাংলাদেশে সিভিল সার্ভিসের পরীক্ষা দেশের বিভাগভিত্তিক সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করা যেহেতু সম্ভব হচ্ছে কাজেই অন্য পরীক্ষাগুলো বিভাগভিত্তিক আয়োজন করা মোটেই অসম্ভব নয়। 

raju69alive@gmail.com

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.