শওকত আলী : ছোটগল্পের কারিগর

আশরাফ উদ্দীন আহমদ

মানুষ গল্প ভালোবাসে, সেটা শুনতে বা বলতে তা যেভাবেই বলা হোক না কেনো। ইউরোপীয় সাহিত্যে আধুনিক অর্থে গল্পের লক্ষণ ফুটে ওঠে। ফরাসি ছোটগল্প সাহিত্যে প্রথম সার্থক গাল্পিক ‘র‌্যাবলে’, ফ্রান্সের মোপাসাঁ, আমেরিকার অ্যাডগার অ্যালেন পো-জ্যাক লন্ডন এবং রাশিয়ার নিকোলাই গোগোল---ফরাসি সাহিত্যে এমিল জোলা-আলফাস দোঁদে-অনাতোল ফ্রাঁস, রুশসাহিত্যে পুশকিন-নিকোলাই গোগোল-লিও টলস্টয়-তুর্গেনিভ-ম্যাক্সিম গোর্কি-চেখব এবং ইংরেজি সাহিত্যে গলস্ওয়ার্দি-সমারসেট সম-ও হেনরি আর বাংলা সাহিত্যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্পকার হিসেবে বিবেচিত। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
পরবর্তীসময়ে প্রভাতকুমার-চারুচন্দ্র-মণিলাল-সৌরিন্দ্রমোহন-প্রেমাঙ্কুর প্রমুখ সাহিত্যিক ছোটগল্পের ইতিহাসে বিশেষ অবদান রেখেছেন। প্রমথ চৌধুরী ছোটগল্প রচনার পাশাপাশি চলিত ভাষারীতি প্রবর্তন করেছেন, রাজশেখর বসু-প্রেমেন্দ্র মিত্র-কাজী নজরুল ইসলাম-অচিন্ত্যকুমার-মাণিক-তারা-বিভূতি-সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ-জগদীশচন্দ্র-নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়-শামসুদদীন আবুল কালাম-সুবোধ ঘোষ-কাজী আবদুল ওদুদ-প্রবোধকুমার-সৈয়দ মুজতবা আলী-জ্যোতিরিন্দ্র-শওকত ওসমান-সমরেশ- হুমায়ুন কবীর-রমাপদ-বিমল কর প্রমুখ সাহিত্যিক বাংলা ছোটগল্পকে সমৃদ্ধ করেছেন, দিয়েছেন প্রাণশক্তি, এনেছেন বিষয়ের বৈচিত্র্য-চরিত্রের ভিন্নতা-বর্ণনায় অভিনবত্ব-চিন্তার গহনে হয়েছে উৎকর্ষমণ্ডিত।
সে ধারাবাহিকতার পথ ধরেই ষাট দশকে সার্থক কথাসাহিত্যিক শওকত আলী (১৯৩৬) বাংলাসাহিত্যে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ আসনে অলঙ্কৃত হয়েছেন। প্রবন্ধ-উপন্যাসে যেমন তার কৃতিত্ব, তেমনি ছোটগল্পের শাখাটিকেও সমানভাবে কৃতিত্বের সৌরভে ভরিয়ে তুলেছেন। আধুনিক বাংলাসাহিত্যের বিশেষ করে ছোটগল্পের একজন অনবদ্য শিল্পী তিনি। বাক্যে যেমন আন্তরিকতার পরিচয় মেলে, তেমনি প্রকাশভঙ্গিতে আছে গভীর দৃষ্টিবোধ। ঘটনায়-বাস্তবতায় যে ছোঁয়া, তাকে আরো সাবলীল আরো নির্মোহ আরো জীবন্ত করে ফুটিয়ে তুলেছেন, গল্পের প্রকরণ বা আঙ্গিক এবং বিষয়বস্তুর ভেতর চমৎকৃত্যের একটি ঝোঁক সর্বত্র পরিলক্ষিত, আর তাই তার বৃহৎ গল্পের সমুদ্রে ডুব দিলে মনে হবে কোনো কৃতীমান কুশীলব মনের গহনে নতুন সুরের মূর্ছনায় ভরিয়ে দিলো, অথবা কদাচিৎ মনে হবে শিল্পের ক্যানভাসে হারিয়ে গেছি অবলীলায়। গ্রাম বা শহর কিংবা মফস্বল বা রাজধানী যে প্রেক্ষাপটে তার গল্পের বীজ রোপিত হোক না কেনো, তা অবশ্যই অঙ্কুরিত হবে। প্রকৃতপক্ষে শওকত আলী মধ্যবিত্ত বা নি¤œমধ্যবিত্ত মানুষের চালচিত্রই ফুটিয়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। বাংলা গল্পের ধারায় তার অবদান অবশ্যই বিশিষ্ট এবং ব্যতিক্রমধর্মী। অভাব-সঙ্কট-দারিদ্র্য এবং ধনী-গরিবের বৈষম্যের পাশাপাশি, গ্রামীণ মহাজন বা নগরের ভূমিদস্যু-দালাল-শোষকশ্রেণীর চরিত্রও বিনির্মাণ করেছেন গল্পের ক্যানভাসে। বস্তুবাদী সমাজচিন্তার এই শিল্পী বাংলা ছোটগল্পকে প্রাণের বীণায় সপ্তসুরের ঝঙ্কারে দোলায়িত করেছেন বলতে দ্বিধা নেই। ছোটগল্পে আছে তার ঢের সাফল্য। ‘উন্মুল বাসনা’ (১৯৬৮)‘ লেলিহান সাধ’ (১৯৭৮) ‘শুন হে লখিন্দর’ (১৯৮৮) ‘বাবা আপনে যান’ (১৯৯৪) ‘দিনগুজরান’ (২০০৬) পাঁচটি গল্পগ্রন্থের ৮০ ভাগ গল্পের পটভূমি গ্রামীণ জীবনাবলম্বী। বাংলাভাষার গল্পসাহিত্যের ধারায় তার অবদান বহুমাত্রিক। নাগরিক মধ্যবিত্ত জীবনের অসঙ্গতির চিত্রাঙ্কনের ষাট দশকের মৌল প্রবণতার পথ ছেড়ে গল্পে তিনি বিচরণ করেছেন গ্রামীণ জীবনতটে, গ্রামের নিরন্ন-নিঃস্ব খেটে খাওয়া মানুষের জীবন যন্ত্রণা-সংগ্রাম ও দহনের পোড়োজমিতে। শওকত আলী বরাবরই শ্রেণীসচেতন শিল্পী। আর তাই তুলে ধরেছেন গ্রামীণ মহাজনদের শোষণ-শাসনের ভয়াবহ চিত্র, যা প্রতিনিয়ত মানুষকে ভাবায়-ভাসায় চোখের জলে এবং নির্মাণ করেন সর্বহারা মানুষের সংগ্রাম ও উত্তরণের জয়গাঁথা। শাসন নামক শোষণ যেন একপ্রকার নিপীড়ন, সে কথা বোঝাতেই তার প্রতিবাদী বাঁক। বিগত অর্ধশতাব্দী বাংলাসাহিত্য এবং বাঙালি মুসলমানের জীবনের শিল্পিত দলিল। তার জীবনোপলব্ধি-পর্যবেক্ষণের ভঙ্গি মূলত অন্তরাশ্রয়ী, শ্রেণিবিভক্ত-শোষণমূলক সমাজের মধ্যবিত্তের বিকৃত জীবনচর্যা, লোকায়ত জীবনের অস্তিত্বগত টানাপড়েন ও আত্মাবিষ্কারের দুর্মম প্রচেষ্টা। সমষ্টিজীবনের অস্থির রূপান্তর-প্রক্রিয়া শওকতের গল্পভুবনকে আরো সমৃদ্ধ এবং সক্রিয় করেছে, করেছে বেগবান। তার গল্পের বিরাট অংশ যে বাংলাদেশের গ্রামীণ প্রেক্ষাপটের এবং তা গ্রামজীবনকে আরো কাছাকাছি এনেছে; সেই গ্রামীণ পটভূমি ও শোষণক্লিষ্ট মানুষের জীবন-সংগ্রামের অনবদ্য আলেখ্যসমূহের সমন্বয়ে শওকত আলী প্রাণবন্ত করে তুলেছেন তার গল্পগুলো।
‘উন্মুল বাসনা’ শওকত আলীর প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, নরনারীর কামনা-বাসনার কথা স্বভাবসূলভ ভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছে। যেমন ‘রঙ্গিণী’ গল্পে মানুষের জৈবিক প্রবৃত্তি তার হিংসা-বিদ্বেষ ও সন্দেহের আবহ দেখতে পাওয়া যায়। এভাবেই মানুষ কখনো-সখনো নিজেই যেন নিজের কাছে ধরা দেয়।
‘দুই গজুয়া’ গল্পের কাহিনী অকিঞ্চিৎকর হলেও ব্যাপ্তি বেশ বিস্তৃত। হাসি-বেদনার খণ্ড চিত্র রেখাপাত হয়েছে, গল্পটি হাস্যরস সৃষ্টির মধ্য দিয়েই একটু একটু এগিয়ে গেলেও নতুন স্বাদ এসেছে কাহিনী-বয়ানে ও প্রেক্ষাপটে।
মহাজন শ্রেণীর চরিত্র নিয়ে ‘শুন হে লখিন্দর’ গল্পেও রক্তচোষা মহাজনকে দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু মহাজন কখনো-সখনো আবার প্রজাকে যে ভয় করে, সে চিত্রও দেখানো হয়েছে, সমাজের অপাঙ্ক্তেয় মানুষগুলো যে সমাজের অংশ এবং তাদেরও একটা জীবন আছে, তাদের সুখ-দুঃখ প্রেম-ভালোবাসা আছে। শওকত আলী সে সব মানুষের জীবনকথা অঙ্কিত করেছেন পরম মমতায়, দরদি কলমের আঁচড়ে অতি সাধারণ মানুষও হয়ে গেছে অসাধারণ-মহানায়ক।
‘শুন হে লখিন্দর’ গল্পে উন্মাদ সাঁওতাল সাপুড়ে গুপীনাথ জীবন্ত সাপ দেখিয়ে মহাজন লক্ষীকান্তকে ভয় দেখায়, তার পাওনা বুঝে পাওয়ার জন্য মাধ্যরাতে যে নাটক করে, তাতে মহাজন সত্যি সত্যি ভয় পেয়ে তার বাকি পাওনা বুঝিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। এখানেই মহাজনের যে পরাজয়, তার একটা ছবি বেশ দরদের সাথে শওকত এঁকেছেন। মানুষ সে যতই নীচু হোক; প্রতিবাদী না হলে তাকে কেউই পাত্তা দেয় না, পায়ের তলে জুতোয় পিষ্ট করে ফেলে। কিন্তু গুপীনাথ সত্যি সত্যিই নিজের জায়গা থেকে বের হয়ে শক্ত প্রতিবাদ করেছে। হয়তো সে কারণেই তাকে ভয় করেছে ধনশালী লক্ষী।
বৃষ্টি মাথায় হাড় কাঁপানো কনকনে শীতে কম্বল ছাড়াই নিঃস্ব গুপীনাথকে ফিরে আসতে হয় নিজের ঘরে। একটি কম্বলের জন্যই গিয়েছিল পাদ্রীটার কাছে। ওরা নাকি বিলি করবে গরিবদের মধ্যে, শুধুই আশ্বাসে থেকে অবশেষে ব্যর্থ হয়েই কাকভেজা ভাঙা শরীর নিয়ে এক বৃদ্ধ রাণীগঞ্জে ফিরে আসে, ফিরতে হয় তাকে। পাদ্রীরা যতই সহজ-সরল ভাবমূর্তি নিয়ে থাকুক না কেনো, মূলত ওরা যে মিশন খুলে বসেছে (আদিবাসী সাঁওতালেরা যেন দলে-দলে খ্রিষ্টান হয়) সেই ঘুঘু ধরার ফাঁদ গুপীনাথ মনে-মনে ঠাওর করে ফেলে, ‘রাণীগঞ্জ অনেক দূর’ গল্পে এভাবেই ভণ্ডামীর নীলনকশা গাল্পিক পাঠকদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন। গল্পে গোপন থাকা মানুষের বিবেক-মনুষ্যত্বকে ঝাঁকিয়ে-ঝুঁকিয়ে দেখে বিচার করা যায়। মানুষ প্রকৃতপক্ষে স্বার্থ ছাড়া চলতে পারে না, মানুষের প্রতি মানুষের কোনো ভালোবাসা-মমতা নেই, আছে স্বার্থের বিভীষিকা আর স্বার্থের রোশানল। এভাবেই মানুষ নিজের ভেতর লুকিয়ে থাকে গোপন স্বার্থ নিয়ে। ধরা না গেলেও বোঝা যায়, মানুষ শুধু নিজ বা স্বার্থের প্রয়োজনেই মানুষকে কাজে লাগায়।
নারীর প্রতি ভালোবাসা নিবেদিত হয়েছে, ‘কোথায় আমার ভালোবাসা’ গল্পে। দেশের মুক্তির জন্য, দেশের স্বাধীনতার জন্য মাহমুদ যোগ দেয় মুক্তিযুদ্ধে। কথা ছিল একদিন দেশ মুক্ত করে ভালোবাসাকে তার সঠিক সম্মান দেবে, ঘরে তুলে নেবে। কিন্তু তা আর হয়নি। মাহমুদের লাশটাও কেউ পায়নি। কোথায় যে তার লাশটাকে পুঁতে দিয়েছে ওরা, তা তো কেউই জানে না। ভালোবাসার মেয়েটি এখনো অধীর অপেক্ষায়। হয়তো একদিন আসবে। তার স্মৃতিতে ঘুরে-ফিরে সে সব দিনগুলো আসে। মানুষের মৃত্যু হলে লাশ হয় এবং তারপর হাড়গোর হয়। কিন্তু মাহমুদ কোথায়, তার লাশই বা কোথায়, কেউ হদিস দিতে পারেনি।
‘বিহঙ্গী ফেরে না’ বাস্তববাদী চিত্র দ্বারা নির্মিত একটি গল্প, নাটকীয় আবহ বেশ ছুঁয়ে গেছে গল্পের শরীরে। রায়হানা এবং আসিফের দাম্পত্যজীবন এখানে একটি দোলাচলে দুলতে থাকে। ছয় মাসের সংসারজীবন পালন করে চাকরি এবং শহর ছেড়ে একদিন আসিফ পালিয়ে যায়। কারণ শহরের কোলহল আর প্রতিযোগিতামূলক জীবন থেকে বাঁচতে চাওয়া তার কাছে বড় পাওয়া। তিন তিনটে বছর ধরে উধাও হওয়া একজন মানুষকে খুঁজতে বের হয় রায়হানা। স্বামীর নিজ গ্রামে গিয়ে হতভম্ব হয়। যান্ত্রিক জীবন থেকে একেবারে ভিন্ন আরেক পরিবেশ, এখানে মাটি এবং মানুষ কতো নিবিড়ভাবে জড়িয়ে- ছড়িয়ে আছে একে অপরের মধ্যে, তারপর একটু-একটু নিজেকে আবিষ্কার করে সেও যেন আসিফের মতো কেমন হয়ে গেছে। এ যেন প্রকৃতির ভালোবাসা। হয়তো প্রকৃতি মানুষকে এভাবেই কাছে টেনে নেয় পরম মমতায়, সেখানে আকাশের নিচে সবুজ অরণ্যের ভেতর মানুষ নিজেকে হারিয়ে ফেলে আবার খুঁজে পায়, রামধনুর রঙের মতো ওই জীবন তাকে আকৃষ্ট করে।
‘ফাগুয়ার পর’ গল্পে এক ধরনের জীবনের নানা দিক ফুটে উঠেছে। সুখলালকে নিয়ে গল্পের কাহিনী এগিয়ে গেছে। সে এক অবালবৃদ্ধ, সংসারের বোঝা বলে কেউ তার খোঁজ-খবর নেয় না। ছেলেরা বদ্ধমাতাল হয়ে এসে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করে। সুখলাল যৌবনকালে স্টেশনের কুলি ছিল, তখন গায়ে শক্তি ছিল, তাগদ ছিল। বয়সের কাছে আজ হার মেনেছে সেই শক্তি এবং যৌবন।
পাঁচজন গ্রাম্য ডাকাতের গল্প ‘জ্যোৎস্না রাতে দাও বন্দুকের খেলা’, যদিও ডাকাত কিন্তু সেভাবে তারা নিজেদের সেই স্থানে নিয়ে যেতে পারে না, অভাব তাদের আজ অন্ধকারে নিয়ে এসেছে, কিন্তু তাদের পেটে অন্ন নেই। আর গ্রামের মানুষও তেমন; কারো বাড়িতে সেভাবে সুখ নেই, অর্থ নেই, ক্ষুধা তাদের প্রতিনিয়ত সঙ্গী হয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। পাঁচজনের এই ডাকাত দলের একমাত্র মরণাস্ত্র বন্দুক। এই বন্দুকের শক্তি নিয়ে ওরা ডাকাতি করে। কিন্তু যখন গ্রামের সোমক্ত গেরস্থবাড়িতে ডাকাতি করতে ব্যর্থ হয়, তখন শুকবর মিয়ার বাড়ি হানা দেয়। বন্দুক-রামদার ফলা দেখে শুকবর হতবাক। গল্পে দেখা যায় পাঁচজনই এতই ক্ষুধার্ত, যে তাদের গাভীন ছাগলটাকে মধ্যরাতে গলা কাটে এবং মাংস রান্না খেয়ে, পুরনো দুর্গন্ধময় একটি কাঁথা নিয়ে ফিরে যায়। শীতে ওটার প্রয়োজন সবারই, পথে ওই কাঁথা নিয়ে ঝগড়া বাধে। মানু সরদার কাঁথাটাকে দু’ টুকরো করে দেয়, কারো কাজেই লাগে না। তখন দিয়াশলাই দিয়ে আগুন জ্বালায়, আগুনে হাড় কাঁপানো জাড় থেকে মুহূর্তে পাঁচজন রক্ষা পায়।
‘পুনরায় বেয়নেট’ গল্পে মুক্তিযুদ্ধকালীন ভয়াবহ অত্যাচারের চিত্র উপস্থিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এ’ গল্পে শওকত আলী চিত্রায়িত করেছেন দেশ-মাটি এবং স্বাধীনতাকে, যা একটা দেশকে পরিচিত করে তুলেছে, একটা জাতিকে বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে দাঁড় করতে শিখিয়েছে। বাঙালি যে হাজার বছরের স্বাধীনতাহারা, সে একটি স্বাধীন বাংলাদেশ চেয়েছে, যার জন্য মৃত্যু তার কাছে সামান্য। তারপরও সে মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়তে চায়। একটি জানোয়ারকে খতম করে দেশমাতৃকাকে সম্মান দিতে সে কার্পণ্য করেনি।
‘মধ্যরাতের বাণিজ্য যাত্রা’ গল্পে মূল বিষয়Ñ নারী পাচারের মতো ঘটনা। এলাকার এক ঠিকাদার, যে গ্রামের বিভিন্ন জায়গা থেকে চেনাপরিচিত মেয়েদের চাকরি প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে পাচার করে, তেমনি এক ঘুটঘুটে কালো রাত্রে বর্ডার পার করে দেয়ার ঘটনা নিয়ে গল্পটির আখ্যান নির্মিত হয়েছে।
‘আর মা কান্দে না’ গল্পে দেখা যায় দুঃখ-দারিদ্র্যের একটি ছবি, কাজ-কাম নেই, অন্ন নেই, বেঁচে থাকার প্রয়োজনটুকুও যেন হারিয়েছে। মা কাঁদে, দিনরাত্রি কাঁদে। সে কান্না যে কোনোভাবেই থামে না, পেটে ঘা হয়ে গেছে না খেতে পেয়ে। ছেলে অসহায় কী করবে জানে না। বাড়ি থেকে ঘর থেকে পালিয়ে যেতে চায়। মূলত সে জীবন থেকে পালিয়ে বাঁচতে চায়, কিন্তু বৃষ্টি তাকে যেতে দেয় না। তাই রমজান আলী অসহ্য গলায় ডেকে বলে, তুই আর কান্দিস না, তোর খোদার দোহাই...অথচ মহাজনের বাড়িতে গোলা ভরা ধান। রমজান আলীর জমি নেই, নিয়ে গেছে মহাজন। একজন মেয়েমানুষ তার দরকার, কিন্তু পেটে অন্ন নেই। বড় কষ্টে দিনকাল যাচ্ছে। মা কান্দে, খালি কান্দে, পেটের ভেতর অনেক ভেতরে দিনরাত্রি ধিকিধিকি আগুনের মতো দগদগে ঘা। সেই আগুনের জ্বালা জুড়োয় না, কান্না থামে না।
শওকত আলীর গল্পে জীবন যেভাবে এসেছে, তা পঞ্চাশ এবং ষাট দশকের ছন্নছাড়া কানাগলির জীবন। কিন্তু দেশ যেমন অনেক এগিয়েছে, জাতি হিসেবে বাংলাদেশের বাঙালি অনেকখানি স্বাবলম্বী হয়েছে তা গ্রাম বা মফস্বল কিংবা নগর বা মহানগর যা বলা যাক না কেনো; শওকত আলীর সীমাবদ্ধতা হয়তো এখানেই। তার গল্পের প্রেক্ষাপট-আঙ্গিক ভাষা ব্যবহার অনেকটা সেকেলে। গল্প নির্মাণে শওকত আলীর দক্ষতা অপরিসীম, বিশেষ করে ভাষা ব্যবহারে। আঞ্চলিক ভাষা প্রয়োগে তার কাহিনী স্বাভাবিক উত্তরণ ঘটেছে আশ্চর্যজনকভাবে। ভাষায় স্বাচ্ছন্দ এবং বেগবান গতি সচরাচর লক্ষ করা যায়। যার দরুণ কাহিনীতে এসেছে মানবিকবোধের স্পন্দন, চরিত্রের ধারাবাহিকতায় দিয়েছে প্রাণশক্তি। ভাষা ব্যবহারে শওকত আলীর চরম দক্ষতার যে পরিচয় পাওয়া যায় গল্পের ছত্রে-ছত্রে, কখনো আঞ্চলিক ভাষা প্রয়োগে তার যে অতৃপ্ত ফোটে, সেখান থেকে বিচ্যুত হননি। যেমন : প্রকরণ-বিষয়বস্তুর প্রতি তার সচেতনতা প্রবলভাব চিত্রায়িত হয়েছে। সরল আঞ্চলিক লোকজীবনের কাহিনীবিন্যাসই তার গল্পের প্রধান উপজীব্য। বঞ্চিত-লাঞ্ছিত গ্রামীণ সমাজের যে দুর্গতি তাও এসেছে কলমের ডগায়। তার সাহিত্য নিয়ে সেভাবে তেমন আলোচনা না হলেও মহাকাল তাকে একদিন অবশ্যই খুঁজে নেবে। তখন আজকের অনেকে হয়তো ঝরে যাবে; যারা সমকালে নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত অথবা একে-ওকে বলে বিশেষ সংখ্যা বা একটু আলোচনা করিয়ে নিজেকে মহান সাহিত্যিকের আসরে নাম কুড়িয়ে নিচ্ছে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.