অলঙ্করণ : হামিদুল ইসলাম
অলঙ্করণ : হামিদুল ইসলাম

আদরপ্রিয় রায়ান

শওকত নূর

বৃদ্ধ খালেদ সাহেবের ছোট্ট একটা নাতি আছে। তার নাম রায়ান। বয়স পাঁচ বছর। এই ছোট্ট নাতিটাকে তিনি খুব ভালোবাসেন। বাসায় থাকলে প্রায় সারাক্ষণ কাছে রাখেন। তাকে আদর করেন, তার সাথে খেলা করেন, গল্প করেন। খালেদ সাহেব একা মানুষ। তাই রায়ানের বাবা অকালে মারা যাওয়ার পর রায়ান ও তার মাকে এনে নিজের কাছে রেখেছেন। রায়ানের মা তার একমাত্র সন্তান। তিনজন মিলে মোটামুটি ভালো আছেন। কারণ, তারা প্রত্যেকে প্রত্যেককে খুব ভালোবাসেন। খালেদ সাহেব ছোটখাটো কাজে বাইরে গেলে রায়ানকে সঙ্গে নিয়ে যান। মাঝেমধ্যে শিশু-পার্ক বা চিড়িয়াখানায় নিয়ে যান। রায়ান তাই তার খুব ভক্ত। তাকে ছাড়া কিছুই বোঝে না।
রায়ান খুব শান্ত স্বভাবের শিশু। কথা যেমন খুব কম বলে, চেঁচামেচিও তেমন করে না। যেসব কথা বলে তা খুব মিষ্টি করে বলে। বাড়িতে কোনো অতিথি এলে সে তাদের কাছে তেমন যায় না। পর্দার আড়ালে বা অন্য ঘরের একটু ভেতরে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে তার নানুর সাথে তাদের কার্যকলাপ দেখে। তার ফুটফুটে সুন্দর চেহারা ও মায়াবী টলমলে চাউনিতে অতিথিদের কারো চোখ পড়লে তিনি বা তারা অবশ্যই হাত ইশারায় তাকে কাছে ডাকেন। রায়ান নড়ে না। তাদের দিকে অবাক হয়ে চেয়েই থাকে। এ সময় খালেদ সাহেব ডেকে ওঠেন - নানু ভাই, আসছো না কেন? চলে আসো।
রায়ান একটু একটু করে এগিয়ে আসে। অতিথিরা তাকে কোলে কিংবা পাশে বসান। জিজ্ঞেস করেন, তুমি কেমন আছ ? সে টানা মিষ্টি কণ্ঠে বলে, সুন্দর। তিনি বা তারা প্লেট থেকে খাবার তুলে দেন রায়ানের মুখে। খাবার চিবিয়ে গেলার পর অতিথি বলেন, কেমন লাগল?
সুন্দর। রায়ান পলকহীন চোখে বলে।
তোমার নানু কেমন মানুষ?
সুন্দর।
আমরা কেমন?
সুন্দর।
তুমি পড়ো?
হুঁ, পড়ি।
পড়তে কেমন লাগে?
সুন্দর।
সেদিন ক’জন অফিস কলিগ প্রথমবার এসেছেন খালেদ সাহেবের বাসায়। খালেদ সাহেব ড্রয়িং রুমে তাদের আপ্যায়ন করছেন। তিনি বাঁ হাত দিয়ে রুমালে মুখমণ্ডল ঢেকে ডান হাতে তাদের আপ্যায়ন করছেন। এক ফাঁকে হঠাৎ মুখ থেকে রুমালটি পড়ে যায়। কলিগদের একজন তার মুখমণ্ডলের দিকে চেয়ে বলে ওঠেন, এ কী খালেদ সাহেব? পাখপাখালির কবলে পড়েছিলেন নাকি? নখর দিয়ে আক্রমণ করেছে মনে হয়?
জি, না।
তাহলে? বিড়ালের খামচি? এক পাঁজি বিড়াল একবার ঘুমানো অবস্থায় থাবা দিয়ে আমাকেও এমন করেছিল। তামাম মুখমণ্ডল চিরে দিয়েছিল।
না না তেমন কিছু না। খালেদ সাহেব মুখে রুমাল তুলে বলেন।
তাহলে?
নাতিটার কাজ। খালেদ সাহেব শান্ত গলায় বলেন।
বয়স কত নাতির?
পাঁচ হলো এবার।
খুব দুষ্টু বুঝি?
না। একদম শান্ত। খুবই নিরীহ।
তাহলে?
মাঝেমধ্যে হঠাৎ খুব ক্ষেপে যায়?
কারণ?
ওর মা ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করলে। তবে এটা খুব কম।
কিন্তু আপনাকে খামচাল যে?
ওই রাগান্বিত অবস্থায় ধরতে গিয়েছিলাম, তাই।
ও বুঝতে পেরেছি। ছোটরা প্রায়ই এমন হয়। টিভিটুভি মনে হয় একটু বেশি দেখে।
হুঁ।
যাক, ওর সাথে বেশি বিরোধে না গিয়ে বুঝিয়ে শান্ত করবেন। ওর ভাবে ভাবে চলবেন।
তাই চলি।
ওকে, আমরা আসি।
অতিথিরা জুতামোজা পরে বাইরে পা দিলেন। সন্ধ্যা ঘনিয়েছে। একটু হেঁটে তাদের রিকশা নিতে হবে। মাত্র ক’ কদম হেঁটেছেন তারা। এরই মধ্যে খালেদ সাহেবের বাসার ভেতর থেকে তীব্র চিৎকার ভেসে এলো। মনে হচ্ছে এক বনমানুষ আরেক বনমানুষকে অথবা পেঁচার দল এক পেঁচাকে আক্রমণ করেছে। এমনি কর্কশ চিৎকার। অতিথিরা থমকে গেলেন। কী হলো ভেতরে? বলাবলি করতে লাগলেন তারা। সাতপাঁচ ভেবে ফিরে এলেন তারা। বিষয়টা না জেনে চলে যাওয়া ঠিক হয় না। এমন বিভৎস চিৎকার।
ফিরে এসে খালেদ সাহেবের দরজায় কলিংবেল টিপলেন তারা। সঙ্গে সঙ্গে ভেতরের শব্দটি বন্ধ হয়ে গেল। খালেদ সাহেব দরজা খুলে কলিগদের দেখে বললেন, কী ব্যাপার? কোনো সমস্যা?
না না, এমন শব্দ হলো ভেতরে। তাই ফিরলাম। ভাবলাম কী না কী হলো। কী হয়েছে?
কিছু না। নাতিটা ক্ষেপেছে।
কী কারণ? এতক্ষণ তো কোনো সাড়াশব্দ ছিল না।
প্রতিবার অতিথি এলে তারা ডেকে কাছে আনেন; কথা বলেন, আদর করেন। আপনারা এমনিতে চলে গেছেন।
ওহ্হো রে। আমরা তো এসব জানি না। তা ছাড়া দেখিওনি ওকে।
অতিথি এলে ও পর্দার আড়ালে বা ও ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে তাদের দিকে তাকায়। আজ সাহস করেনি। আমার মুখের দাগ নিয়ে কথা হচ্ছিল আপনাদের সাথে।
ওহ্হো। তাহলে এখন কী করা?
ওই তো দাঁড়িয়ে আছে।
অতিথিরা সামনে চেয়ে দেখলেন ও ঘরের দরজায় করুণ চোখে চেয়ে আছে রায়ান। তারা হাত ইশারা করলেন, কিন্তু সে দাঁড়িয়েই রইল। খালেদ সাহেব বললেনÑ নানু ভাই, আসছো না যে? আসো।
রায়ান এক পা দু’পা চলে আসে। কাছে এলে অতিথিদের একজন কোলে তুলে নেন তাকে। আদর করে বলেন, তুমি নাকি খুব ভালো? কিন্তু এভাবে কাঁদছ কেন? নানুকেই বা খামচে দিয়েছ কেন? এসব কি ভালো? ভালো ছেলেরা এসব করে?
রায়ান কিছু না বলে এক লাফে খালেদ সাহেবের কোলে গিয়ে তার বুকে মাথা গুঁজল।
অতিথিরা তার মাথায় হাত বুলিয়ে খালেদ সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাইরে এলেন।
হাঁটার ফাঁকে তারা কান পেতে রইলেন পেছনে। কিন্তু রিকশায় ওঠা পর্যন্ত কোনো প্রকার সাড়াশব্দ শুনতে পেলেন না।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.