উপলব্ধি চারাগল্প

তন্ময় আলমগীর

বউয়ের জন্য সিটিগোল্ডের একজোড়া কানের দুল, গলার চেইন এবং কিছু চুড়ি দোকান থেকে কিনে সন্তর্পণে ব্যাগে গুছিয়ে রাখল তুহিন। এই প্রথম নারীজাতির জন্য কোনো উপহার কিনল সে। ছোট দু’বোনের জন্য কোনো দিন কিছু কেনেনি। দু’বোনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। মা মাঝে মধ্যে দুয়েক পোঁটলা হাতে ধরিয়ে দিলে বোনদের বাড়িতে শুধু পৌঁছে দেয়া ছাড়া আর কোনো দায়িত্ব পালন করতে হয়নি।
পায়েলটা কেনা বাকি এখনো। দু-তিনটি দোকান ঘুরেছে। পছন্দ হচ্ছে না। নাশরাকে কল করে পছন্দটা জেনে নিলে ভালো হতো। নাশরার পায়েল পরার খুব শখ। অনেক দিনের ইচ্ছেÑ বিয়ের পর স্বামী নিজ হাতে তার পায়ে পায়েল পরিয়ে দেবে।
বসুন্ধরা জুয়েলার্সে ঢুকবে কি ঢুকবে না কিছুক্ষণ ভাবল তুহিন। বন্ধুর দোকান। বিয়ের ঘটনাটা জানলেও তাকে দাওয়াত দিতে পারেনি পারিপার্শ্বিক সীমাবদ্ধতার কারণে। বন্ধুটি নিশ্চয় ওর ব্যাপারে অপ্রতিভ কিছু ভেবে রেখেছে। ভাবলে ভাবুক। লজ্জার মাথা খেয়ে দোকানে ঢুকে বন্ধুর মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল সে। বন্ধু সহাস্যে বলল, কেমন চলছে নতুন জীবন? তুহিন খানিক্ষণ লাজুক ভঙ্গিতে হাসল। মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, এই তো চলছে। তুহিন পায়েল দেখানোর কথা বলে একটু নিশ্চুপ হয়ে রইল। বন্ধু কয়েকটা পায়েল দেখাতে দেখাতে বলল, নারীজাতির প্রতি তোর টান আছে তাহলে!
পায়েলটা নিয়ে দ্রুত বের হয়ে এসে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়াল। তুহিনের বেশ ভারী লাগছে নিজেকে। মায়ের কথা মনে পড়তেই চোখ দুটো টলমল করে উঠল। অসময়ে মায়ের কথা মনে পড়ার কারণ, এই অতিক্রান্ত জীবনে কোনো দিন মায়ের জন্য কিছু কেনেনি সে। অবশ্য মায়ের তেমন চাহিদাও ছিল না। অল্পতেই চালিয়ে নিতে পারতেন। সাধ্যের বাইরে কখনোই মা চাপ দিতেন না। বাড়ি থেকে কোনো কাজের জন্য বের হলে মা সব সময় বলতেন, বাবা, কখন কী করতাছ, কল কইরা জানাইও। কল দিত না। কল দেয়ার প্রয়োজনই মনে করত না তুহিন। তবু মা বিরক্ত হয়ে রাগ ঝাড়তেন না। হাসি হাসি মুখটাতে প্রশান্তির হাসি দিয়ে তুহিনের সব ভুল ধুয়েমুছে দিতেন। বলতেন, অন্তত কল করে তোর খবরটা তো দিতে পারতি!
একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে লাচ্ছি খেলো তুহিন। মার্কেটে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে গেছে। দুপুর থেকে সন্ধ্যাÑ অনেকটা সময় লাগলেও বউয়ের জন্য কেনাকাটা করতে খারাপ লাগেনি। হাসিমাখা মুখটা চোখে ভাসলেই বুকের ভেতরে কেমন পুলক অনুভূত হয়। মুঠোফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে আরো বেশি পুলকিত হলো তুহিন। বউ কল করেছে, মার্কেট থেকে বেরিয়ে গেছ?
-হুম, কেন?
-কোমরের বিছা লাগবে। নীল শাড়ির সাথে ম্যাচিং করা কোনো বিছা নাই বাসায়।
- আজ না, অন্য দিন আনি?
- না না, এখনই লাগবে। বিয়েতে যাবো। প্রেস্টিজের ব্যাপার।
- আরে, বিছা এ যুগে চলে না।
- সেটা আমি বুঝব। আনতে বলছি আনবে, ব্যাস।
আবার মার্কেটে গেল তুহিন। অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে ঘুরে ঘুরে নীল রঙের বিছা কিনল। বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেছে। বউ খাবার রেডি করে বসে আছে টেবিলে। ফ্রেশ হয়ে একসাথে খেলো দু’জন। এবার কেনাকাটার জিনিসপত্র খুলে দেখার পালা। রাত প্রায় বারোটা বেজে গেছে। তুহিনের ক্লান্ত শরীরটা বারবার ছুটে যেতে চাচ্ছে বিছানায়। ঢুলুঢুলু চোখে এ যেন রাজ্যের ঘুম। বউ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব জিনিসপত্র দেখছে। পায়েলটা দেখিয়ে তুহিনের উদ্দেশে বলল, এটা কয় আনা?
তুহিন বলল, পাঁচ আনা।
আমি ভেবেছিলাম ছয় আনা হবে। উচ্ছ্বসিত গলার স্বর কিছুটা যেন ম্রিয়মাণ শোনাল। চুপসানো সুরে আবার জানতে চাইল, কত ক্যারেট হবে? নিশ্চয় আঠারো ক্যারেট। তুহিন বালিশে মাথা এলিয়ে দিতে দিতে বলল, না, আট ক্যারেট। উত্তর শুনে এতক্ষণের সব উৎফুল্লতা এক লহমায় মিইয়ে গেল বউয়ের। জোর করে খানিকটা হাসতে চাইল সে। যে হাসিটাতে লেপটে আছে গভীর মলিনতার ছাপ।
তুহিনের ঘুম যখন ভাঙল রাত তখন ৩টার কাঁটা ছুঁইছুঁই। স্বপ্নে মায়ের মুুখটা ভেসে উঠতেই ঘুম ভেঙে গেল তার। ড্রয়ারে রাখা মায়ের ছবিটা বের করে ঝরঝর করে কেঁদে দিলো তুহিন। মা দেখো, তোমার ছেলে এখন কত দায়িত্বশীল হয়েছে। সবার খোঁজখবর নেয়। প্রত্যেকের প্রয়োজন মেটায়। কেবল তোমাকে ছাড়া। আচ্ছা মা, তুমি কি এখনো আমার ফোনকলের অপেক্ষায় থাকো? মৃত্যুর আগে যেমন থাকতে!
বাংলা প্রভাষক, কিশোরগঞ্জ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.