ফুয়েডের আলোর পাঠশালায় একদিন

আরাফাত শাহীন

শাহজাহান ভাই বললেন, ‘একদিন আমাদের ওখানে এসো।’
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কোথায়? আপনাদের বাড়ি?’
তিনি মুচকি হেসে বললেন, ‘না। আমরা আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছেলেমেয়েদের বিনামূল্যে পড়াই। তুমি একদিন গিয়ে ঘুরে এসো। তোমার ভালো লাগবে।’
শাহজাহান ভাইয়ের কথা আমার কৌতূহল বাড়িয়ে দিলো। হাবিবুল্লাহ ভাইও আমাকে অনুরোধ করলেন একবার ঘুরে আসার জন্য। বর্তমান সময়ে যেখানে কোচিং বাণিজ্যের রমরমা চলছে, সেখানে এমন পাড়াগাঁয়ে কিছু মানুষ সম্পূর্ণ বিনা লাভে নিজেদের মেধা ও শ্রম ব্যয় করছেন এলাকার কোমলমতি শিশুদের বিদ্যা শেখানোর কাজে; ব্যাপারটা আমাকে আশ্চর্য করল। সেই সাথে আমাকে আশাবাদীও করল। কারণ এখনো আমাদের সমাজের কিছু মানুষ শুধু নিজেদের কথা না ভেবে সমাজের আর ১০ জন মানুষকে নিয়েও চিন্তাভাবনা করেন। সুতরাং তাদের দু’জনের অনুরোধ কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারিনি।
আজ সকালে তাই ছুটলাম ফ্রেন্ডশিপ ফর ইউনিটি অ্যান্ড এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট (ফুয়েড) নামক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের উদ্যোগে পরিচালিত সেই আলোর পাঠশালার উদ্দেশে। আমার সাথে ছিল সদ্য চায়না সরকারের স্কলারশিপ পাওয়া ছোটভাই ওসমান গনি। শীতের তীব্রতা খুব বেশি না থাকলেও মোটামুটি শীত উপেক্ষা করে যখন বেজড়া-নারান্দিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পৌঁছলাম, হাতঘড়ি ততক্ষণে জানান দিলো সকাল ৮টা বেজে গেছে। শাহজাহান ভাই মনে হলো আমাদের পথ চেয়ে বসেছিলেন। একটু পরে এলেন হাবিবুল্লাহ ভাইও। আমরা চারজন এবার শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করলাম।
ক্লাসরুমে প্রবেশ করে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। ভোরসকালের এই শীত উপেক্ষা করে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা দলবেঁধে ক্লাস করার জন্য হাজির হয়ে গেছে। হয়তো সকালের নাশতাটাও ওরা কেউ করে আসেনি। তা না হলে কী হবে! ওদের মুখে ফুটে ওঠা হাসির রেখাই বলে দিচ্ছে ওরা ঠিক কতটুকু উপভোগ করছে। ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে শুরু করে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত তিন ক্লাসে বিভক্ত হয়ে ক্লাস করছিল ওরা। একে একে আমরা তিনটি ক্লাসেই প্রবেশ করলাম। আমি বিস্ময়ের সাথে তাদের শৃঙ্খলা এবং দায়িত্ববোধ লক্ষ করলাম। ওখানে যারা শিক্ষক হিসেবে পাঠদান করছেন তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার নিজেরাই ছাত্র! বিভিন্ন সরকারি কলেজে তারা অনার্সে পড়াশোনা করছেন। আরেকটা ব্যাপার আমি আশ্চর্যের সাথে লক্ষ করলাম, শিক্ষার্থীদের মাঝে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সংখ্যাই বেশি। আজকাল পাড়াগাঁয়ের মেয়েরাও যে পড়াশোনায় ব্যাপকভাবে এগিয়ে আসছে এটা তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।
সত্য কথা বলতে কী, বর্তমান সময়টা হলো স্বার্থপরতার যুগ। ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের ব্যাপারে সব মানুষ বড্ড বেশি সচেতন। যেখানে ব্যক্তিগত লাভ নেই সেখানে মানুষ খুব একটা এগোতে চায় না। তারপরও কিছু ব্যতিক্রমী মানুষ আজো আমাদের সমাজে বর্তমান। তাই তো সমাজটা আজো ধ্বংস হয়ে যায়নি। আজো বেঁচে আছে কিছু স্বার্থহীন মানুষের ভালোবাসায়। তেমনি একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ফ্রেন্ডশিপ ফর ইউনিটি অ্যান্ড এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট (ফুয়েড)। বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ছাড়াও অসংখ্য সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে সংগঠনটি। তরুণদের মাদকের হাত থেকে ফিরিয়ে রাখতে মাদকবিরোধী প্রচারণা এবং সেই সাথে খেলাধুলার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করে থাকে। ফলে খুব বেশি দিন বয়স না হলেও সংগঠনটি ইতোমধ্যে মাগুরা জেলার নহাটা অঞ্চলে ব্যাপক সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছে।
ফুয়েডের অন্যতম পরিচালক সরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা মো: শাহজাহান মিয়া বলেন, ‘প্রায় তিন বছর যাবৎ আমরা এই কার্যক্রমটি পরিচালনা করে আসছি। এতে আমরা এলাকায় অভূতপূর্ব সাড়া লক্ষ করেছি। একবার আমাদের এখানে এইচএসসির ফল বিপর্যয় ঘটে। তখন থেকেই আমার মাথায় স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো কিছু করার চিন্তা আসে। সেই চিন্তাধারা থেকেই মূলত কাজটা শুরু করা। এ ছাড়া বর্তমান সময়ের রমরমা কোচিং বাণিজ্যের বিপরীতে শুদ্ধ চিন্তা থেকে ছেলেমেয়েদের জন্য কিছু করার তাগিদ সবসময় অনুভব করেছি। আমাদের বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। যথাযথ কর্তৃপক্ষ যদি আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে তাহলে আমাদের জন্য বেশ সুবিধা হতো।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.