একজন ফিস্টুলা রোগীর কেসহিস্ট্রি

অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল হক

বয়সে তরুণ, ৩৫ বছর। পেশায় চিকিৎসক। উত্তরবঙ্গের একটি হাসপাতালের হাড় ও জোড়া বিশেষজ্ঞ কনসালট্যান্ট। হঠাৎ করে মলদ্বারে ব্যথায় আক্রান্ত হন। ধরা পড়ে মলদ্বারে ফোঁড়া হয়েছে। অপারেশন করালেন ঢাকার একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে। কয়েক মাস পর আবার ফুলে উঠে ব্যথা হয়, পুঁজ পড়ে। এবারো অপারেশন করা হলো। কিছু দিন ভালো থাকলেন। আবার যথারীতি ব্যথা ও পুঁজ যাওয়া। এবার অন্য একজন সার্জনকে দেখালেন ও অপারেশন হলো। কয়েক মাস পরে আবার সেই একই সমস্যা। এবার আরো সিনিয়র বিশেষজ্ঞের সাথে পরামর্শ করলেন এবং অপারেশন করানো হলো। কিন্তু কয়েক মাস পর আবারো একই অবস্থা। এ অবস্থায় বারবার সমস্যা দেখা দেয়ায় আরো তিনবার অপারেশন করা হলো, কিন্তু সমস্যা যাচ্ছে না। মোট সাতবার অপারেশন করেও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। মলদ্বারের পাশের মুখ দিয়ে ফুলে উঠে ব্যথা হয় এবং পুঁজ যায়। রোগী (যিনি নিজেই ডাক্তার) হতাশায় ভেঙে পড়লেন। একজন বিশেষজ্ঞ সার্জনের পরামর্শে রোগী লেখককে দেখান। লেখক তাকে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অপারেশনের কথা বললেন। যেহেতু এটি জটিল ধরনের ফিস্টুলা (ভগন্দর) তাই রোগীকে তিন ধাপে সিটন পদ্ধতিতে অপারেশন করতে হবে বলে উপদেশ দিলেন। তিন ধাপে ওই রোগীকে সিটন প্রয়োগ করে অপারেশন করা হলো। নিয়মিত ড্রেসিং করা হলো। ডাক্তার রোগীর স্ত্রীও একজন এমবিবিএস ডাক্তার। তাই ড্রেসিংয়ে তিনি অনেক সাহায্য করলেন। আল্লাহর রহমতে রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হলেন।
ফিস্টুলা রোগ অপারেশন করলে আবার হতে পারে এটিই প্রচলিত ধারণা, এমনকি চিকিৎসকদের মধ্যেও। সার্জারি বইয়ের ভাষায় ‘ফিস্টুলা রোগটি নিয়ে চিকিৎসকেরা বিগত দুই হাজার বছর ধরে বড়ই বিপাকে আছেন। ফিস্টুলা অপারেশনের পর চিকিৎসকদের যত বদনাম হয়েছে অন্য কোনো অপারেশনে ততটা হয়নি।’ মলদ্বারের রোগের এই জটিলতার কারণে ১৮৩৫ সালে লন্ডনে একটি আলাদা হাসপাতাল হয় যার নাম সেন্ট মার্কস হাসপাতাল ফর দ্য ডিজিজেস অব কোলন অ্যান্ড রেকটাম। অর্থাৎ, বৃহদান্ত্র ও পায়ুপথ সার্জারির জন্য আলাদা হাসপাতাল। আজ থেকে ১৭০ বছর আগে চিকিৎসকেরা এ জাতীয় রোগের বিশেষত্ব বুঝে আলাদা হাসপাতাল করেছেন, যা এখন লন্ডনে রয়েছে। পৃথিবীর সব উন্নত দেশে বৃহদান্ত্র ও পায়ুপথ সার্জারির জন্য আলাদা বিশেষজ্ঞ বিভাগ হিসেবে স্বীকৃত।
লেখক বিগত পাঁচ বছরে মলদ্বারের সমস্যায় আক্রান্ত আট হাজার ৪৮২ জন রোগীর ওপর গবেষণা করে দেখেছেন। এদের ৩৫ শতাংশ এনালফিশার, ১৮ শতাংশ পাইলস, ১৫ শতাংশ ফিস্টুলা ও ২ দশমিক ৬৫ শতাংশ ক্যান্সারে আক্রান্ত। এই গবেষণায় দেখা যায়, ফিস্টুলা রোগীদের ৮৪ শতাংশ সাধারণ ফিস্টুলা এবং ১৬ শতাংশ জটিল ফিস্টুলা। লেখকের দেখা ফিস্টুলা রোগীদের ১৭ শতাংশ বার বার অপারেশনে ব্যর্থ হওয়া রোগী। যার মধ্যে বিদেশে একাধিকবার অপারেশন করে ব্যর্থ হওয়া রোগীও আছেন। অল্পসংখ্যক রোগী পাওয়া গেছে, যাদের ক্যান্সারের কারণে ফিস্টুলা হয়েছে।
রেকটাম ও মলদ্বার মানবদেহের একটি জটিল অঙ্গ। এ বিষয়ে বিশেষভাবে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন সার্জন অপারেশন করলে ফিস্টুলা রোগটি বারবার হওয়ার সম্ভাবনা সর্বনি¤œ পর্যায়ে রাখা যায়। লেখক এ বিষয়ে তার গবেষণা প্রবন্ধের জন্য জুন ২০০০-এ যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইন্টারন্যাশনাল স্কলার সম্মাননা লাভ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্বখ্যাত মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন প্রবন্ধে। গবেষণা প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল্ল ‘অস্ত্রোপচার সত্ত্বেও বারবার ফিস্টুলা হওয়া কি রোগটির ধর্ম, নাকি পূর্ববর্তী অস্ত্রোপচারের ত্রুটি।’
লেখক : এমবিবিএস, এফসিপিএস, এফআইসিএস, বৃহদন্ত্র ও পায়ুপথ বিশেষজ্ঞ, ফেলো, কলোরেকটাল সার্জারি (সিঙ্গাপুর), ইন্টারন্যাশনাল স্কলার, কলোরেকটাল সার্জারী (যুক্তরাষ্ট্র), প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, (অব) কলোরেকটাল সার্জারী বিভাগ, বিএসএমএমইউ, ঢাকা।
চেম্বার : ইডেন মাল্টি-কেয়ার হসপিটাল, ৭৫৩, সাতমসজিদ রোড, (ষ্টার কাবাব সংলগ্ন) ধানমন্ডি, ঢাকা। ফোন : ০১৭৫৫৬৯৭১৭৩-৬, ৫৮১৫০৫০৭-১০।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.