ফিরতে হবে বইয়ের কাছে

আফতাব চৌধুরী

‘অদ্ভুত আঁধার এক’ ক্রমাগত ঘনিয়ে উঠছে আমাদের চার পাশে। বইয়ের বদলে ই-বই, জ্ঞানের বদলে তথ্য। তথ্য বিস্ফোরণের এই সময়ে তথ্যকে দাঁড় করিয়ে দেয়া হচ্ছে নলেজের সহজ বিকল্প হিসেবে। ছাপা বইতে মগ্ন হওয়ার অভ্যাস কমছে, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের ভেতর। ইন্টারনেটে ডাউনলোড করা ই-বই হয়ে দাঁড়াচ্ছে ছাপা বইয়ের সস্তা বিকল্প। প্রযুক্তি চাইছে তথ্যে তথ্যে আপনার, আমার, আমাদের ছেলেমেয়েদের মগজগুলোকে ঠেসে ভরে দিতে। বিজ্ঞান বলছে, মাত্রাতিরিক্ত তথ্যের ধাক্কায় মগজের নেটওয়ার্ক সেভাবে বাড়ছে না নতুন প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীদের। মগজে ফুটে উঠছে না নতুন নতুন ‘চোখ’। যে চোখ জ্ঞান বাড়ায়, যে চোখ তৈরি হয় নিয়মিত নানান বিষয়ে ছাপা বই পড়লে। পুরনো হয়ে যাচ্ছে টিভি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্মার্টফোন ও নেটে সময় কাটাচ্ছে ছেলে-মেয়েরা। টিনএজারদের মধ্যে চলমান টেলিফোনে ব্যাপক আসক্তি আশঙ্কা বাড়াচ্ছে মগজের নানা টিউমার ও কানে কম শোনার। বড়দের বেলায় স্মৃতিভ্রংশের রোগ অ্যালঝেইমারের, পারকিনসনস ডিজিজের। নেটবাহিত অসভ্যতা, অশ্লীলতার প্রভাব পড়তে শুধু করেছে কমবয়সীদের আচার-আচরণে। প্রযুক্তির দাস বনে যাচ্ছে মানুষ, দ্রুতলয়ে। কমছে সামাজিকতা, বন্ধুত্ব। বাড়ছে নিঃসঙ্গতা, একাকিত্ব। আড্ডার বদলে চ্যাট, আনন্দের বদলে যৌনতা, বই পড়া ছেড়ে স্মার্টফোন আর নেটের মৌতাত! সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছি অনেক দিন আগে এখন পরিবার থেকে, সব শেষে নিজেই নিজের কাছ থেকে। বাচ্চারা তো কবেই হারিয়ে ফেলেছে শৈশব। ‘নালক’ নেই, ‘আবোলতাবোল’ নেই, নেই ‘ঠাকুমার ঝুলি’। শৈশবে গল্প শোনানোর দাদী, ফুফু, বোন হারিয়ে গিয়েছেন কবে। প্রযুক্তির হাত ধরে অতি দ্রুত বড়দের জগতে ঢুকে পড়ছে শিশুমন। তৈরি হতে পারছে না, হলেও ভেঙে চুরমার হচ্ছে শৈশবের সুকুমার প্রবৃত্তিগুলো। বাচ্চারা চাইছে ‘আরো, আরো’। বড় হতে হতে বাড়ছে চাওয়া-পাওয়ার ফারাক। মিলিয়ে যাচ্ছে আনন্দ, বাড়ছে বিষাদ। চাইল্ডহুড আর পেরিপিউবারটাল ড্রিপেশনে আক্রান্ত ছেলেমেয়ের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ওদের অনেকের মধ্যে দেখা দিচ্ছে আগ্রাসী, আক্রমণাত্মক আচরণ। বাড়ছে কম বয়সেই অপরাধ, খুন, জখম, ধর্ষণ ও গণপ্রহারের ঘটনা।
টিনএজারদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা দুই দশকে প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। এর পেছনে অনেকটাই দায়ী প্রযুক্তি, জানাচ্ছেন ভারতের ব্যাঙ্গালুরু ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ’-এর একদল বিজ্ঞানী। অন্ধকারই শেষ কথা নয়, আঁধার পেরিয়ে আলোর স্বপ্ন থাকে চিরকাল। পিঠ ঠেকে গেছে দেয়ালে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিভি, নেটের সামনে বসে চুপচাপ দেখে যাওয়ার দিন শেষ। বাচ্চারা শেখে বড়দের থেকে, বড়দের দেখে। যেকোনো ছোট পর্দার দেখা বা শোনা তথ্য গভীর ছাপ ফেলতে পারে না আমাদের স্মৃতির সড়কে। ‘মেমরি পাথওয়ে’কে দুরন্ত করে তুলতে পারে ছাপা তথ্যের সঙ্কেত। বাড়াতে পারে মগজের নেটওয়ার্ক।
বই পড়ে যে তথ্য পাওয়া যায়, তা শুধু মানুষের মগজের নেটওয়ার্ক বাড়ায় না, বাড়ে তথ্যসংশ্লেষের মতা। সৈয়দ মুজতবা আলীর কথায়Ñ ‘বই পড়তে পড়তে মনের নিত্যভুবন বড় হয়। ‘মুখ ঢেকে’ দেয়া বিজ্ঞাপনের এই সময়ে, প্রযুক্তির এই রমরমার যুগেও তথ্যজ্ঞান নয়, ‘তথ্যের বাজার’ যা-ই বলুন। এটাই বাস্তব। তথ্য সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে, মগজ পৌঁছে যেতে পারে বিরাট একটা ছাতে। ওই ছাতাটাই জ্ঞান। তথ্যের সঙ্কেত যথেষ্ট তীব্র না-হলে সিঁড়ি ভাঙা থেমে যায় মাঝপথে। তথ্য তথ্যই থেকে যায়, ‘নলেজ’-এ উত্তরণ আর ঘটে না। ইলেকট্রনিক মিডিয়া অবশ্যই লাখ লাখ তথ্য জোগাতে পারে। প্রিন্টিং মিডিয়া শুধু তথ্য জোগায় না। বই পড়ে কল্পনা বাড়ে, বিস্তৃত হয় মগজের নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্ক যত বড় হবে, তত বাড়বে স্মৃতি, বুদ্ধি, মেধা, বিশ্লেষণের দতা, তুলনা আর বিচারের মতা। প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বিদায় জানানো আজ অসম্ভব, তার দারকারও নেই। ভাবুন একটু অন্যভাবে। টিভি, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ইন্টারনেট থাক। শুধু এগুলোর ব্যবহারে দরকার রাশটানা। বিশেষ করে, কম বয়সে সেলফোন আর নেট-ব্যবহারে চাই কঠিন নিয়ন্ত্রণ। যেকোনো বয়সে জরুরি বা দরকারি কাজ ছাড়া কেন ব্যবহার করবেন স্মার্টফোন বা নেট? একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কম্পিউটার ব্যবহারে শুধু মগজ বিবশ হয় না, আশঙ্কা থাকে ভিডিও ফুটেজ, নেক-শোল্ডার সিনড্রোম বা আরো জটিল নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার। ফিরতেই হবে ছাপা বইয়ের কাছে, বিকল্প নেই। কী ভাবছেন? স্কুল-কলেজেই তো কত বই পড়ছে আপনার ছেলেমেয়ে। হক কথা, পণ্ডিত বানানোর স্কুল-কলেজে এখন পড়তে হয় বিস্তর বই। তবে সেই বই পড়ার ল্য শেষ পর্যন্ত পরীায় পাস করা। শুধু পাঠ্যবই পড়ে মনের ভুবন বড় করা অসম্ভব। পড়ার বই থাক, তার পাশাপাশি চাই পড়ার বইয়ের বাইরের পড়া।
বুকে হাত রেখে বলুন, বাংলা-সাহিত্যের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার কতটুকু জানে আপনার সন্তানসন্ততি? কবি নজরুল, রোকেয়া, রবীন্দ্রনাথের অমূল্য সাহিত্য সম্পদের সাথে ওদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার দায় আপনারও। অস্থির, অন্ধকার এই সময়ে টিভি, স্মার্টফোন বা নেট নয়, অন্ধকার ঘোচাতে ‘হাতে রইল পেন্সিল’, আর হাজার হাজার বই। ‘শেষের কবিতা’, ‘মাকু’, ‘পাকদন্ডী’, ‘জাগরি’, ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’, ‘ছোটবেলা’, ‘কঙ্কাবতী’-রা থরে থরে সেজে বসে আছে আপনার আমার ঘরে, আজ-কাল-পরশুর অপু-দুর্গা-কাজলদের অপোয়। চলুন আবার ফিরে যাই বইয়ের আশ্রয়ে। বই কিনুন, পড়–ন একটু একটু করে। পড়ান ছেলেমেয়েদের। দয়া করে না পড়ে বইগুলোকে ঘর সাজানোর সামগ্রী বানাবেন না। বইয়ের দাম অনেক? ‘বই কিনে কেউ কোনো দিন দেউলিয়া হয় না’, সেই কবে বলে গিয়েছেন মুজতবা আলী।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.