মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান তাঁর গানের বৈভব

মনসুর আজিজ

কবিতা এক নান্দনিক সৌন্দর্যের নাম। আকাশের শুভ্র মেঘমালা যেমন দ্রষ্টাকে আনন্দ দেয়, তেমনি নান্দনিক পঙ্ক্তিমালাও রচিত হলে আনন্দ সাম্পানে ভাসেন কবি। ভালো লাগার ঊর্মিদোলায় আচ্ছন্ন হয় মনাকাশ। হৃদয়ের অলিন্দে ঘোরলাগা স্বপ্নের ভেতর পাড়ি দেন মায়াবী উদ্যানের সন্ধানে। এই মায়াকাননের সন্ধান সবাই পান না। স্বপ্ন ভেঙে ভুলে যান মায়াবী উদ্যানের কথা। আর কেউ চোখের সামনেই দেখতে পান সেই উদ্যানের বৃক্ষরাজি। বর্ণিল ফুলের সুবাসে আমোদিত হয় তার মন। নেচে ওঠে ঝরনার কলকল সুরে। এই নন্দনকাননের এক স্বপ্নবাজ রাজকুমার মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান। শব্দনির্মাতা সুরের মূর্ছনা ঢেলে দেন শিল্পীর কণ্ঠে। যার মূর্ছনায় বিমোহিত হয় স্রোতা। জাগতিক বিষয়-আশয় ভুলে হেলান দেন গানের পানসিতে।
শুদ্ধতার শুভ্রতায় তিনি এক ভোরের তারার মতো উঁকি দেন ঊষার আলোয়। মায়াবী চাদরে আচ্ছাদিত কবিপ্রকৃতির রঙরূপ, নদী-নিগর্স পার হয়ে অপার এক সৌন্দর্যের জমিনে ফলাতে থাকেন শুদ্ধতার ফসল। সে ফসল গানের। সে ফসল প্রাণের। যার টসটসে বীজের ভেতর জন্ম দেয় শুদ্ধতার নতুন চারাগাছ। আলোড়িত করে নাড়িয়ে দিয়ে যায় অশুদ্ধ-অশুচির তাবৎ সংসার। গানের ভেতর প্রাণ সঁপে দিয়ে রফিকউজ্জামান নির্মাণ করেন জামানীয় গানের ধারা। চর্যার চারাগাছ যেমন মেলে ধরে মাটির শুদ্ধতা, তেমনি তিনিও ভাটি-বাংলার মাটিসংলগ্ন কবি। আমাদের ঐশ্বর্যময় গীতল ধারায় তার কবিতা শতধারায় প্লাবিত করে অনাবাদী জমিনে ফলিয়ে যান গানের সোনালি বৈভব। তাই গীতিকবিতায় খুঁজে পাওয়া যায় রাষ্ট্র থেকে দেশ। মানুষ থেকে মানবিকতা। দারিদ্র্য-শোষণ থেকে মুক্তির পথ। সাধনার ভেতর থেকে মুক্তি। পার্থিব লোভলালসা ভুলে এক অপার্থিব মুক্তির সোপান। আশাজাগানিয়া শব্দের ভেতর তাই শুনতে পাই দেশপ্রেম, দেশমাতৃকার প্রতি ভালোবাসা, মুক্তিযুদ্ধ ও প্রত্যয়ের আকুতিÑ
মাঠের সবুজ থেকে সূর্যের লাল
বাংলাদেশের বুক এতোই বিশাল
এখানে মানুষ জাগে জীবনের অনুরাগে
পুবের আকাশে আসে নতুন সকাল।
[হৃদয়ের ধ্বনিগুলি, পৃÑ২৯]
পদ্মা, মেঘনা, রূপসা, সুরমা, তিস্তা, যমুনা,
নদী পাড় সবুজ শাড়ি ঘুরিয়ে পরেছো তো বেশ
ও আমার দেশ ও আমার রূপবতী দেশ।
[ঐ, পৃÑ২৯]
মাগোÑ বিলের শাপলা আমার সঙ্গে বাংলায় কথা বলে
পাখির ভাষাও তোমারই তো ভাষা
নদীও তোমার ভাষার স্বরেই ‘কল-কল’ বয়ে চলে।
ভোরের সূর্য ‘স্বাগত’ জানিয়ে উজ্জ্বল হয় আর
সাঁঝের বেলায় ‘বিদায় বিদায়’ বলে হয় অবনত।’
[ঐ, পৃÑ৬৮]
প্রতিজ্ঞা আজো করছি তোমাকে ছুঁয়ে
এতোটুকু দাগ লাগে যদি মাগো
রক্তে দেবো তা ধুয়ে
তোমায় মলিন দেখে ভীরু মনে
নয়নের জলে ভাসবো না।
[ঐ, পৃÑ৩১]
রফিকউজ্জামানের দেশপ্রেমের গান নতুন একমাত্রায় পৌঁছে দেয় শ্রোতাকে। উজ্জয়নের ডানায় তুলে দেয় নতুন পালক। স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা নতুন চেতনার বীজে বুনে দেয় অনাবাদী মনে। নিরাশার বুকে শোনা যায় আশার অনুরণন।
‘আমার মন পাখিটা যায়রে উড়ে যায়’, ‘আমার বাউল মনের একতারাটা’, ‘সেই রেল লাইনের ধারে’, ‘মাঠের সবুজ থেকে সূর্যের লাল, চির অয় তুমি বাংলাদেশ, যেখানে মাটির দাওয়ায় পিদিম জ্বেলে, নদীর ধারেই পথ, পথ পেরোলেই গাঁ’Ñ এসব গানের ভেতর পাওয়া যায় এক দেশপ্রেমিক রফিকউজ্জামানকে; যিনি বাউলের একতারার মতোই সুরের জাদু ছড়িয়ে দেন বাংলার ঘরে ঘরে।
মরমবাদ মোহাম্মাদ রফিকউজ্জামানের গানের আরেক বৈভব। ‘ঘোর’, ‘দেহখেয়ায় দেবো পাড়ি’ এ ধারার গানের সঙ্কলন। ১৯৯৯ সালের ১০ নভেম্বর প্রচণ্ড জ্বরের ভেতর অবচেতনে লিখে চলেন বা তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নেন দশটি মরমি গান। এক অদৃশ্য ইশারায় সাধক যেন খুঁজে পান আত্মার ভেতর পরমাত্মার সন্ধান। ২০০০ সালে ১২২টি গান নিয়ে বের হয় ‘ঘোর’। আর ২০১১ সালে বের হয় ‘দেহখেয়ায় দেবো পাড়ি’। কয়েকটি নমুনা দেয়া যাক এ ধারার গানের।
দেহখেয়ায় দেবো পাড়ি
যাবো বন্ধু তোমার বাড়ি
তুমিÑ বেন্ধে রেখো ঢেউএর আড়ি
ওজন যেন সয়
নইলে তুমি কেমন দয়াময়।
[দেহখেয়ায় দেবো পাড়ি, পৃÑ১৫]
তুমিÑ ঘরের দুয়ার রেখে খোলা
থাকো কেনো আপন ভোলা
জামান দ্যাখে ভরা গোলা
শূন্য হয়ে গ্যালো।
[ঐ, পৃÑ৪৫]
তুমিÑ শুনতে পেলে সাঁইজির বাণী
সত্য সুপথ হয় রুহানী
জামান রে তুই শুনিস মিছে
অভাজনের কানাকানি।
[ঐ, পৃÑ১৩৪]
এইসব গানের ভেতর দিয়ে অন্য আরেক জামানের সন্ধান পাওয়া যায়। আত্মার সাথে পরমাত্মার সংযোগ। দেহের সাথে মনের। নিজের সাথে নিজের এক অনবরত কথোপকথনের ভেতর জগতের সব কিছু তুচ্ছ করে অন্য জগতের দিকে নিজেকে ধাবিত করার বাসনাই থাকে কবিমনে। রূপ-অরূপের সন্ধান খুঁজে আর লাভ নেই। ক্ষণিকের এই ডেরা ছেড়ে অনন্ত ‘মোকাম’ খরিদ করার ইচ্ছাই প্রবল হয়ে ওঠে। এখানে গানকে তিনি ধ্যানের পর্যায়ে নিয়ে যান। একজন ধ্যানীর মতোই তাই বলতে পারেনÑ গানের কথা বোঝার আগে/ ধ্যানের কথা বোঝ রে পাগল/ না হলে এই কথার প্যাঁচে/ বাধবে শুধু গণ্ডগোল (দেহখেয়ায় দেবো পাড়ি, পৃÑ৯৯)।
১১ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ রফিকউজ্জামানের ৭৫তম জন্মবার্ষিকী। তাকে জানাই জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.