অতঃপর ঐন্দ্রিলা

তারিকুল ইসলাম লিমন


‘জোছনা রাত সব মানুষের জীবনে আলো বিলায় না। কিছু মানুষের হৃদয় অজানা এক অন্ধকারের প্রাচীরে ঢাকা থাকে; সেখানে চাঁদের আলো কখনোই পৌঁছায় না।’
খড় রোদের প্রচণ্ড তাপে তাবিনের প্রাণ ওষ্ঠাগত। পথ চলছে, হাতে জ্বলছে সিগারেট। সিগারেটে পেট ভরে না। ক্ষুধার্ত হয়ে রাস্তার পাশে একটা চায়ের দোকানে দাঁড়াল। এক কাপ চা সাথে একটা রুটি। তখন হয়তো ঐন্দ্রিলা বন্ধুদের সাথে থাই অথবা ইন্ডিয়ান কোনো রেস্টুরেন্টে বিদেশী মজাদার খাবারে পেটপূজা করছে। ঐন্দ্রিলা মাটন চপে ওয়ান বাইট। উম্ম-ম-ম ডিলিশাস, টেস্টি, সেক্সি ফুড। আই লাভড ইট। পাশ থেকে এক বন্ধু বলে উঠল, ও ধঢ়ঢ়ৎবপরধঃব ুড়ঁ.
শুকনো রুটি চিবাতে ভালো লাগছে না। তাবিন দ্বিধায় পড়ে গেল; চায়ের কাপে রুটি ভিজাবে কিনা। এটা তো অভদ্রতা। সে ভিজিয়ে মুখে তুলে নিল। তার লজ্জা লাগছে। ধার সময় কিসের লজ্জা বলে আবার মুখে দিলো। তার রুটি ভিজে নরম হয়ে চায়ের কাপে পরে গেল। সে আঙুল দিয়ে তুলে মুখে দিল। এবার অভদ্রতা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাল। তাবিন একটা সিগারেট ধরিয়ে ফুঁকতে লাগল। মনে মনে বলল আমি এত গরিব কেন?
সারা দিন অনেকটা পথ হেঁটেছে; শরীর ক্লান্ত। আজ তার আর টিউশনিতে যাওয়া হবে না। নতুন একটা টিউশনি পেয়েছে। মেয়েটা উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ে। নাম রজনী। রজনী দেখতে কেমন তাবিন তা কিছুতেই মনে করতে পারছে না। কি আশ্চর্য!
বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে তাবিন তৃপ্তি করে খেল। তারপর শুয়ে পরল। একটা কথা মনে পড়ে গেল তার। ঘুমানোর আগে তাকে একটা সিগারেট খেতে হয়, নাহলে ঘুম আসে না। এ অভ্যাস নতুন, আগে ছিল না।
বারান্দায় গিয়ে একটা সিগারেট ধরাল। বেশ সুন্দর একটা চাঁদ দেখা যাচ্ছে। আচ্ছা জোছনা চলে গিয়ে অমাবস্যা কেন আসে? সারা বছর কেন থাকে না? ও অমাবস্যা যদি না আসে তবে কেউ জোছনার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারত না। তাবিনের মাথায় এখন কয়েকটা লাইন ঘুরছে। সে চটজলদি লিখে ফেললো।
গড়ড়হ পধহহড়ঃ পড়সব ড়হ বধৎঃয ও পধহ’ঃ মড় ঃড় ঃযব সড়ড়হ; ঞযবৎব রং ধ যঁমব ফরংঃধহপব নবঃবিবহ ঁং, নঁঃ বি ষড়াব বধপয ড়ঃযবৎ. ও রহংরংঃ ঃযব সড়ড়হ- ঈড়সব ড়হ, পড়সব ড়হ, পড়সব ড়হ.
আজ তাবিনের ক্লাসে ক্লাস পার্টি, সবাই মিলে মজা করবে। অরগানাইজার বলল, ঊধপয যধং ঃড় পড়হঃৎরনঁঃব ড়হব ঃযড়ঁংধহফ ঃধশধ ড়হষু. এক হাজার টাকা। ওরে বাবা। এটা তাবিনের সংসারের সপ্তাহ খানেকের বাজার। তবু তাবিনের খুব যেতে ইচ্ছে করছে। আনন্দের জন্য নয়, ঐন্দ্রিলাকে দেখার জন্য। হুম, সেও যে আসবে। তাবিন পকেটে হাত দিয়ে দেখল ২০০ টাকা আছে। সে কিছুক্ষণ বসে থেকে বাজারে রওনা হলো। চিংড়ি মাছ আর কচুরলতি কিনল, এক হালি লেবু কিনল, সাথে বোম্বাই মরিচও নিল।
ঐন্দ্রিলা বন্ধুদের সাথে অনেক আনন্দ করছে। একেকজন সস্তা জোকস বলছে আর তাতেই সবাই হইহই করে হেসে গড়াগড়ি যাচ্ছে।
তাবিন বাসায় গিয়ে খেতে বসল। অনেকদিন পর মায়ের সাথে খাচ্ছে। বাইরে বাইরে ঘুরাঘুরি করে এক সাথে খাওয়া হয় না। খেতে খেতে মা আরো একটু কচুর লতি প্লেটে তুলে দিলো। ‘বাজারে কোনো সাগরের বড় মাছ পেলি নারে।’Ñ মা বলল। তাবিন বলল, কাল আনব। তাবিন জানে কাল সে আনতে পারবে না। তাবিন মনে মনে বলে ওঠে আমি এত গরিব কেন?
রোজা শুরু হয়ে গেল। তেমন কোনো আয়োজন করা গেল না। বন্ধুরা সবাই এখানে সেখানে ইফতার পার্টি করছে। কেউ কেউ চকবাজারের ইফতারি খেতে গেল। ঐন্দ্রিলাও তাদের সাথে গেল। তাবিনের যাওয়া হলো না। সে ওখানে দামি দামি খাবার খাবে আর মা একা চিঁড়া-মুড়ি চিবাবে; ঐ খাবার তাবিনের গলা দিয়ে নামবে না।
মা ইফাতারি বানিয়েছে। চিঁড়া দিয়ে লেবুর সরবত, খেজুর ও মুড়ি ভর্তা। তখন ঐন্দ্রিলা হয়ত মজেছে মুখরোচক নানান বাহারি খাবারে। থাক। ঐসব খাবারের বর্ণনা এখন দিতে ইচ্ছে করছে না। ঐন্দ্রিলা বন্ধুদের সাথে সেলফি, রেলফি-ফি-ফি আরো কত ফি তুলে ফেসবুকে সো-ডাউনে ব্যস্ত তখন তাবিন ব্যস্ত নিজের দারিদ্র্যতাকে লুকাতে। দারিদ্র্যকে কি লুকানো যায়? তাবিন ইফতার শেষ করল। মা বলল, ‘বাইরে গেলে দুধ আর কলা নিয়ে আসিস, সাহরিতে খাবো।’
বাড়ি ফেরার সময় হলো। তাবিন দুধ-কলা কিনতে পারল না। টাকা নেই। তার মনটা খুব বিষণœ লাগছে। বিষণœতার সময় তাকে সিগারেট খেতে হয়। এখন তার কাছে প্রিয় ব্র্যান্ডের সিগারেট কেনার টাকা নেই। অসুবিধে কোথায়? অ্যাডজাস্ট করে নিতে হয়। সে একটা সস্তা সিগারেট কিনল। সিগারেটের ধোঁয়া তার গলায় বিঁধল। অনেক কাশি হচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে একটা লেকের কাছে এসে দাঁড়াল। তাবিনের প্রতিবিম্ব লেকের পানিতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তাবিন ছায়ার দিকে তাকিয়ে বললÑ আমি এত গরিব কেন? তাবিনের অনেক কষ্ট হচ্ছে। কষ্টের সময় প্রিয়জনের কথা চিন্তা করলে, কষ্ট কমে যায়। তাবিন চোখ বুজে চন্দ্রাবতীকে দেখার চেষ্টা করছে কিন্তু কিছুতেই দেখতে পারছে না। তাবিন চোখ বন্ধ করে বলল, ‘নয়ন তোমারে পায়না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে। হৃদয় তোমারে পায়না জানিতে, হৃদয়ে রয়েছ গোপনে।’

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.