গল্পকার চারাগল্প

জোবায়ের রাজু

রাজীব তরুণ গল্পকার। দেশের শীর্যস্থানীয় পত্রিকাগুলোর সাহিত্য আয়োজনে তার গল্প প্রতিনিয়ত ছাপা হচ্ছে। ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখার আনন্দ বরাবরই তার কাছে বিরল। তার গল্প পড়ে আজকাল অনেকেই তাকে ফোনকলে লেখার অভিব্যক্তি জানাচ্ছেন। এটা বেশ ভালো লাগে রাজীবের।
রাজীবের খুব ইচ্ছে, এবার বইমেলায় নিজের লেখা বই প্রকাশ করবে। সেই ইচ্ছেবোধ থেকে গতকাল সে প্রকাশক তাজুল ইসলামের কাছে গেছে বই প্রকাশের কথা জানাতে।
Ñমূলত কোন ধরনের লেখা লিখেন আপনি?
Ñছোট গল্প স্যার।
Ñআচ্ছা। পাণ্ডুলিপি এনেছেন?
Ñআনিনি। তবে আপনি বললে মেইল করে দিবো।
Ñওহ। তা আপনার কী ধারণা আপনার বই পাঠক কিনবে?
Ñআমার মোটামুটি কিছু পাঠক আছে।
Ñকিন্তু মিস্টার রাজীব, আমরা তো মূলত সেলিব্রেটিদের বই প্রকাশ করি। দেশের নামকরা বেশির ভাগ তারকা লেখকের বই আমরাই প্রকাশ করেছি।
Ñও আচ্ছা। আমার ছোট বোনও সেলিব্রেটি।
Ñতাই নাকি! কে সে?
Ñনীপা। নীপা হক।
Ñসত্যিই? ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী নীপার ভাই আপনি?
Ñজি।
Ñতাই নাকি? এক কাজ করুন রাজীব সাহেব, আমরা এখন প্রেসের কাজ নিয়ে ব্যস্ত। আপনি ফোন নাম্বার দিয়ে যান। আপনাকে শিগগিরই নক করব।
মনে খুশির নাচন ওঠে রাজীবের। যাক কাজ হয়ে গেল তাহলে! একখানা কাগজে নিজের ফোন নাম্বার লিখে দিয়ে প্রকাশকের কাছ থেকে বিদায় নেয় রাজীব।
২.
রাতে কম্পিউটার খুলে পাণ্ডুলিপি শেষবারের মতো ভালো করে দেখে নেয় রাজীব। প্রকাশক যেকোনো সময়ে কল করলে পাণ্ডুলিপি পাঠিয়ে দেবে। বইয়ের নাম কী হবে ও মোট কয়টি গল্প থাকবে, সব কিছুতেই তীক্ষèদৃষ্টি রাজীবের। উৎসর্গটা নীপাকেই করতে হবে। মূলত নীপার কারণে প্রকাশক কোনো কথা না বলে এভাবে রাজীবের নাম্বারটা চেয়ে নিলো। নীপা এখন কাতারে আছে নাটকের শুটিং নিয়ে। দেশে ফিরলে বোনকে সব বলবে রাজীব।
রাতে ঘুমের ঘোরে রাজীব স্বপ্নে দেখে সে একুশের বইমেলায় বিশাল এক স্টলে বসে আছে। পাঠকেরা তার বই কিনছে হুমড়ি খেয়ে। প্রকাশক বই দ্বিতীয় সংস্করণ করতেও প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সকালে ঘুম ভেঙে উঠে রাতের স্বপ্নের কথা ভেবে রাজীবের চোখে পানি চলে এলো। সাড়ে দশটার দিকে তার ফোনটা বেজে ওঠে।
Ñআমি প্রকাশক তাজুল ইসলাম বলছি।
Ñওহ স্যার, আপনি?
Ñজি। পাণ্ডুলিপি রেডি তো?
Ñজি স্যার।
Ñআমি আপনাকে এসএমএস করে ইমেল পাঠিয়ে দেবো, তবে একটা অনুরোধ আছে রাজীব সাহেব।
Ñবলুন স্যার।
Ñআপনার গল্পগুলো দিয়ে কিন্তু আপনার বোনের নামে বই হবে। যেহেতু নীপা ম্যাডাম একজন পপুলার স্টার।
Ñমানে?
Ñমানে খুব সোজা। তারকাদের বই বের হলে মানুষ বই কিনতে মরিয়া হয়ে ওঠে, প্রিয় তারকার অটোগ্রাফ পেতে কিংবা ছবি তুলতে। আর তাতে আমাদেরও প্রচুর বই বিক্রি হয়। আপনার বোন যেহেতু তারকা, তো সমস্যা কী? বোনের নামে বই হবে।
Ñকিন্তু স্যার...।
Ñহ্যাঁ, আমার প্রস্তাব ভেবে দেখুন। বিকেলে আবার কল করব। ভালো থাকুন।
প্রকাশকের কথায় আকাশ থেকে পড়ে রাজীব। এটা কী করে সম্ভব! নীপার নামে বই! না, কখনোই না। গল্প যে রাজীবের প্রাণ, সে গল্পের রচয়িতা অন্য কেউ হবে কেন? শব্দ, ভাষা, বর্ণ, বাক্য, কথা, বাণীÑ এসব তো তার ভালোবাসা। এই ভালোবাসা সে অন্য কারো নামে চালাতে পারবে না। বিকেলে তাজুল ইসলাম কল করলে রাজীব বলে দেবে ‘আমার বই লাগবে না। আমার গল্প আমার কাছেই থাক।’ রাজীব এসব ভাবছে আর হাসছে, কিন্তু তার মনটা ভীষণ খারাপ।
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.