ভালো থেকো ভালোবাসা চারাগল্প

মোনোয়ার হোসেন

পার্কের একটা বেঞ্চে বসে আছে পাপন। পাশে একগুচ্ছ গোলাপ ফুল । বেঞ্চে বসে উদাস দৃষ্টিতে সামনে পুকুরটার দিকে তাকিয়ে আছে সে।
এই পুকুরপাড়ের বেঞ্চেই তার প্রথম দেখা হয়েছিল মিথিলার সাথে। সেটা আচমকাই।
দিনটা ছিল বর্ষার দিন। পড়ন্ত বিকেল বেলা। অফিস শেষ করে এই পার্কের মাঝপথ দিয়েই শর্টকাট পথে বাসায় ফিরছিল সে। পার্কের মধ্যে প্রবেশ করতেই শুরু হলো বৃষ্টি; ঝুমবৃষ্টি।
পাপন হাতে ধরা ছাতাটা ফোটাল ।
এক্সকিউজ মি!
চমকালো পাপন। এই ঝুমবৃষ্টির মাঝে পার্কের মধ্যে মেয়েকণ্ঠ এলো কোথা থেকে। থমকে দাঁড়িয়ে চার পাশে তাকাল সে। দেখে পুকুরপাড়ের বেঞ্চে বসে আছে একটা মেয়ে।
মেয়েটার চোখে চোখ পড়তেই মেয়েটা বলল, প্লিজ! আপনার ছাতাটা দিয়ে আমাকে একটু হেল্প করুন ।
পাপন কোনো উত্তর দেয়ার আগেই মেয়েটা বেঞ্চ থেকে উঠে দৌড়ে এলো তার কাছে। ছাতাটা নেয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলো। প্লিজ!
পাপন না করতে পারল না আর।
ছাতাটা দিলো।
মুচকি হাসল মেয়েটা। ধন্যবাদ।
তারপর বলল, জানেন, আমার বৃষ্টিতে ভেজা একদম বারণ। টনসিল সমস্যা আছে। ডাক্তার বৃষ্টিতে ভিজতে বারণ করেছেন।
তাহলে সাথে ছাতা নিয়ে আসেননি কেন?
কে জানে আচমকা বৃষ্টি নামবে। দুপুর থেকে তো আকাশ ছিল পরিষ্কার। চনমনে রোদও ছিল।
কোথায় তো আছে দু’টি জিনিসের কোনো বিশ্বাস নেই।
কোন দু’টি জিনিস?
এক. বর্ষার আকাশ। দুই. একটু থামল পাপন। থাক সেটা।
বলুন প্লিজ!
রাগ করবেন না তো?
না, একদম না। আপনি বলুন।
নারীর মন।
শুনে হো হো করে উঠল মেয়েটা। তাই বুঝি?
হুম ।
ততক্ষণে তারা এসে গেছে গেটের কাছে। আচমকা বৃষ্টি, আচমকাই থেমে গেল। এখন রোদ উঠেছে। বিকেলের ঝলমলে রোদ। সেই রোদে বৃষ্টির পানিতে ভেজা গাছের পাতাগুলো চকচক করছে। মোহিত চার পাশের পরিবেশ।
দুইজনে দাঁড়াল গেটের কাছে।
মেয়েটা ছাতাটা দিতে দিতে বলল, স্যরি, আমার জন্য আপনাকে কাকভেজা হতে হলো।
ঠিক আছে। আপনার তো উপকার হলো, বিশেষ করে আপনার টনসিল বন্ধুর।
এবার কাচভাঙা শব্দে রিনঝিন করে হেসে উঠল মেয়েটা। আপনি কথা জানেন বটে!
মেয়েটার কাচভাঙা হাসি দেখে চমকাল পাপন। মেয়েদের হাসি এত সুন্দর হয়? এত সুন্দর হাসি কোনো দিন দেখেনি সে।
মেয়েটা বলল, আপনি কি রোজ এই পথেই অফিস থেকে ফেরেন?
জি।
তাহলে দেখা হবে নিয়মিত।
মানে?
আমি রোজই এই পার্কে আসি। ওই পুকুরপাড়ে বসে থাকি। প্রকৃতি দেখি। প্রকৃতি খুব টানে আমায়। বলতে পারেন প্রকৃতিপ্রেমিক আমি ।
হাসল পাপন। চমৎকার তো! কী নাম আপনার?
মিথিলা।
আমি পাপন। ঠিক আছে আজ বাই। কাল দেখা হবে।
ওকে। বাই।
তার পর থেকে দু’জনের নিয়মিত দেখা হতো। গল্প হতো। তারপর ভালো লাগা এবং ভালোবাসা।
এলো ১৪ ফেব্রুয়ারি।
পাপন বলল, মিথিলা, তুমি আজ বিকেলে শাড়ি পরে পার্কে আসবে। আমি নয়নভরে তোমাকে দেখব।
ঠিক আছে।
শাড়ি পরেছিল মিথিলা। আসছিল পার্কে। পাপনের কাছে।
বাবা মারা যাওয়ার পর তাদের সংসার যেন থমকে যায়। অভাব এসে দরজায় দাঁড়ায়। সেই অভাবের কারণে মিথিলার টনসিল অপারেশন করব করব করেও আর করা হয়নি।
পার্কে আসার সময় গলায় প্রচণ্ড ব্যথা ওঠে তার। যন্ত্রণায় রিকশা থেকে মাথা ঘুরে পড়ে যায়। আর ঠিক তখনই বিপরীত দিক থেকে ধেয়ে আসে একটি ঘাতক বাস। নিভিয়ে দেয় মিথিলার জীবনবাতি। কবর হয় একটি স্বপ্নের।
পাপন আজো ভুলতে পারেনি মিথিলাকে। শত ব্যস্ততার মধ্যেও প্রতিটি ভালোবাসা দিবসে ছুটে আসে এই পার্কে। পুকুরপাড়ের বেঞ্চে। যেখানে তারা বসে গল্প করে কাটিয়ে দিয়েছিল অনেকগুলো দিন।
আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি।
পাপন এসেছে পার্কে। বসে আছে বেঞ্চে। বেঞ্চে বসে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনে পুকুরটার দিকে। এমন সময় কাচভাঙা শব্দে রিনঝিন করে উঠল একটি হাসির শব্দ। হাসির শব্দে সংবিত ফিরে পায় পাপন। চমকে উঠে চার দিকে তাকায়। মিথিলা! মিথিলা!! দেখে কোথাও মিথিলা নেই। বুঝতে পারে এটা তার মনের ভুল।
সূর্য ডুবে গেছে। চার দিকে অন্ধকার নেমে আসছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে। তারপর গিয়ে পুকুরের পানিতে ভাসিয়ে দিলো গোলাপগুচ্ছ। ভালো থেকো মিথিলা। ভালো থেকো ভালোবাসা।
সেতাবগঞ্জ, দিনাজপুর

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.