কুয়াকাটায় বঙ্গোপসাগরে ধরা পড়ছে বিরল প্রজাতির ফ্লাওয়ার কাঁকড়া

এইচ এম হুমায়ুনকবির (পটুয়াখালী)

সমুদ্র সৈকত কুয়াকাটা সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে জেলেদের জালে ধরা পড়ছে বিলুপ্তপ্রায় বিরল প্রজাতির কাঁকড়া। স্থানীয়রা এটিকে টাইগার কাঁকড়া বললেও এটি ফ্লাওয়ার কাঁকড়া, নীল অমৃত কাঁকড়া বা স্যান্ড কাঁকড়া হিসেবে পরিচিত। এক মাস ধরে এক-দেড় ইঞ্চি সাইজের হাজার হাজার কাঁকড়া জেলেদের জালে ধরা পড়ায় জেলেরা এগুলো বিক্রি করতে না পেরে পা দিয়ে পিষে শুকিয়ে মাছের খাদ্য তৈরি করছে। সাগর ও নদীতে হঠাৎ করে বিরল প্রজাতির এই কাঁকড়া ধরা পড়ায় এই প্রজাতির কাঁকড়া রক্ষা ও নিধন রোধে জরুরি উদ্যোগ নেয়ার দাবি জানাচ্ছেন পরিবেশবিদেরা।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, হালকা বাদামি রঙের এই কাঁকড়ার উপরিভাগের শক্ত খোলস চিতা বাঘের মতো ডোরাকাটা কালো দাগ। খোলসের দুই পাশে নিজেদের রক্ষার জন্য এক ইঞ্চি সাইজের বড় দু’টি হুল রয়েছে। মা কাঁকড়ার দেহ হালকা হলুদ বা হালকা বাদামি বর্ণের এবং এর দেহ মোটামুটি গোলাকার। পুরুষ কাঁকড়ার দেহ উজ্জ্বল নীলবর্ণ এবং ছোট ছোট সাদা দাগ বিশিষ্ট। কুয়াকাটায় ধরা পড়া কাঁকড়াগুলো বল্টু-সুইমার কাঁকড়ার পুরুষ জাতের।
কলাপাড়া মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানায়, বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রজাতির কাঁকড়ার চাষ দেখা গেলেও ফ্লাওয়ার কাঁকড়া বা টাইগার কাঁকড়া দেখা গিয়েছিল প্রায় অর্ধশত বছর আগে। এই জাতের কাঁকড়া ভারত মহাসাগর ও ভূ-মধ্যসাগরের উপকূলসহ আফ্রিকা, দনিপূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, পারস্য সাগর উপকূলে দেখা গেছে। বাংলাদেশে এই জাতের কাঁকড়া এখন আর দেখা যায় না। তবে সুন্দরবনের কিছু এলাকায় এই মওসুমে এই প্রজাতির কিছু কাঁকড়া দেখা যায়।
জানা যায়, এই টাইগার প্রজাতির কাঁকড়া শীত মওসুমে সমুদ্রে ডিম ছাড়ার জন্য উপকূলের কাছাকাছি চলে আসে। ডিমের লার্ভাগুলো সাগরের জোয়ারের তোড়ে উপকূলে চলে আসে। গভীর সমুদ্রে ডিম ছাড়ার কারণে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগ পর্যন্ত ছোট কাঁকড়াগুলো উপকূলের কাছেই বিচরণ করে। এগুলো ১৮-২৪ মাসের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক হয়। এটি প্রাপ্তবয়স্ক হলে ৩৫০ গ্রাম থেকে ৬০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়।
কলাপাড়ার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, শত শত শ্রমিক এই কাঁকড়া শুকানোর কাজ করছেন। প্রতিদিন সাতটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে এরা কাঁকড়া শিকার করেছে। প্রতিটি গ্রুপে প্রতিদিন অন্তত ৩ মণ কাঁকড়া শিকার করে তা পিষে মেরে বালুচরে শুকাচ্ছে। কুয়াকাটা সৈকতে পশ্চিম দিকে কাঁকড়া শুকানোর কাজ করছে জেলে মো: সোহেল। তার নেতৃত্বে অন্তত ৩০ শ্রমিক এই গ্রুপে কাঁকড়া শুকাচ্ছেন।
তিনি জানালেন, সাগরের তিন কিলোমিটারের মধ্যে খুটা জেলেদের জালে এই কাঁকড়া বেশি ধরা পড়ছে। জালে অন্য মাছের সাথে ছোট ছোট এই কাঁকড়া বেশি ধরা পড়ায় তা বাছাইয়ের কাজ করছেন ১৫ শ্রমিক। মাছ থেকে এই কাঁকড়া আলাদা করে মাছ বিক্রি করলেও এই কাঁকড়া বিক্রি না হওয়ায় তা পিষে শুকিয়ে মাছের খাদ্য তৈরি করছে। প্রতি মণ শুকনো কাঁকড়ার গুঁড়া ১২ শ’ টাকায় স্থানীয় বাজারেই বিক্রি হচ্ছে।
কাঁকড়া বাছাইয়ের কাজে নিয়োজিত ষাটোর্ধ্ব আকলিমা বেগম বলেন, ‘মোর বাহে জাইলা আছিল। জামাই, পোলারা হগলডিই জাইলা। কিন্তু অ্যাতো বছরেও এই কাঁড়রা দেহি নাই। কাঁড়রাগুলা দ্যাখতে সুন্দর। মারতে মোন চায় না। কিন্তু এত কাঁড়রা কী হরবে। হেইয়ার লাইগ্যা বাইচ্ছা হুগাইতাছি।’
কুয়াকাটায় ভ্রমণে আসা পর্যটক সাইদুর রহমান, অঞ্জলী মণ্ডল, অরিত্র দেবনাথ বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বিলুপ্তপ্রায় জীববৈচিত্র্য নিয়ে পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা। কিন্তু শুধু জীবিকার প্রয়োজনে যে হারে মাছ শিকারের নামে বিলুপ্তপ্রায় সামুদ্রিক প্রাণী সূক্ষè ফাঁস ও নেট জাল দিয়ে নিধন হচ্ছে তা ভয়াবহ। কারণ চিংড়ি পোনা ধরার নামে প্রতিদিন লাখ লাখ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা মেরে ফেলা হচ্ছে। আর এখন নিধন হচ্ছে বিলুপ্ত প্রজাতির এই ফ্লাওয়ার কাঁকড়া। এই কাঁকড়া তারা অস্ট্রেলিয়া বিচে দেখেছেন। এগুলো নিধন বন্ধে এখনই ব্যবস্থা নেয়া উচিত। আলীপুর ও মহীপুরের একাধিক মৎস্যব্যবসায়ী জানান, তারা এই বিরল প্রজাতির ফ্লাওয়ার কাঁকড়া ক্রয় করেন না। তবে যারা শুঁটকি মাছের ব্যবসা করেন তারা এ প্রজাতির কাঁকড়া পা দিয়ে পিষে শুকিয়ে মাছের খাদ্য তৈরি করছেন।
কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো: কামরুল ইসলাম জানান, কুয়াকাটা সৈকতে ধরাপড়া কাঁকড়া খুবই বিরল ও মূল্যবান প্রজাতির। বাংলাদেশে এই কাঁকড়া দেখা না গেলেও এগুলো ভূ-মধ্যসাগরের উপকূলসহ আফ্রিকা, দনিপূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, পারস্য সাগর উপকূলের কিছু এলাকায় দেখা যায়। এই জাতের কাঁকড়া ইন্দো-প্রশান্ত অঞ্চলে খাদ্য হিসেবে ব্যাপকভাবে সমাদৃত। এশিয়া ও পারস্য অঞ্চলেও এ কাঁকড়ার বেশ খাদ্যচাহিদা আছে। পুরুষ কাঁকড়ার চেয়ে মা কাঁকড়ার মূল্য বেশি। তবে এই কাঁকড়া ধরা বিষয়ে কোনো আইন না থাকায় তারা কিছুই করতে পারছেন না। তবে সূক্ষè ফাঁস কিংবা কারেন্ট জাল দিয়ে যাতে এগুলো শিকার করতে না পারে তার জন্য তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.