দায়বদ্ধতা

মোহাম্মদ অংকন

ষষ্ঠ শ্রেণীর ছোট্ট ছেলে আতিক হাসান। বায়না ধরেছে সাইকেল কিনবে। এ বায়না এক দিনের নয়। যখন সে জিপিএ ৫ পেয়েছে, তখন থেকেই স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছে। তার একটি সাইকেল থাকবে। দুরন্তপনায় গোধূলি বিকেল পার করবে। কখনো সাইকেলে চেপে স্কুলে রওনা দেবে। ছুটির দিনে সাইকেল চেপে নানাবাড়ি যাবে। তিসিখালী মেলা দেখতে যাবে। গ্রামের আঁকাবাঁকা পথে সাইকেল নিয়ে ছুটবেÑ এমন নানা রকম স্বপ্ন তার। সব স্বপ্ন একটি সাইকেলকে ঘিরে।
তার এমনও দিন গেছে ‘সাইকেল কিনব, সাইকেল কিনব’ বলে চিৎকার করেছে। সকালে ভাত খায়নি। স্কুলে যায়নি। বিকেলে খেলতে যায়নি, কিন্তু সাইকেল পাওয়া হয়নি। বাবা-মা কথা দিয়েছিলÑ ‘বাবারে, তুই যদি জিপিএ ৫ পাস, তাহলে সাইকেল কিনে দেবো।’ তারা কথা রাখতে পারেনি। তাই তো আতিকের মনটা ভীষণ খারাপ থাকে। তার অনেক বন্ধু জিপিএ ৫ না পেয়েও সাইকেল কিনেছে। তাই তারও শখ, যদি একটি সাইকেল থাকত।
বাবা-মা যখন বলেছিল সাইকেল কিনে দেয়া হবে, তার পর থেকে আতিক অন্যের সাইকেল জোগাড় করে চালানো শিখে নিয়েছে। ছোট দুটো পায়ে প্যাডেল দুটো স্পর্শ করতে পারত না। বারবার মাটিতে পড়ে যেত। হাত-পা আলতোভাবে কেটে যেত। সামান্য রক্ত ঝরত। দূর্বাঘাস চিবিয়ে লাগাত। কখনো বুনোকচুর রস লাগাত। বেশ যন্ত্রণা করত। একটু চোখের পানিও ঝরত। আর এসব কিছু বাবা-মায়ের কাছে লুকিয়ে রাখত এ ভেবে যে, এসব খুনসুটির কথা জেনে যদি সাইকেল না কিনে দেয়।
তার বাবা-মা তাকে কেন সাইকেল কিনে দেয় না, সে তা একদম বুঝতে পারে না। এখনো বোঝার বয়স হয়নি হয়তো। নামমাত্র ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠেছে, কিন্তু সে অনুযায়ী বয়স অনেক কম, চেহারা দেখলেই বোঝা যায়। বাবাকে সে প্রতিদিন একবার জিজ্ঞেস করেÑ ‘বাবা, কবে সাইকেল কিনে দেবে?’ বাবা প্রতিবার আশ্বাস দিয়ে বলেÑ ‘এই তো ধান বিক্রি করেই কিনে দেবো। আর ক’টা দিন দেরি কর না।’ আতিকের যে দেরি সয় না, এ কথা বাবাকে কিভাবে বোঝাবে ভেবে না পেয়ে ‘আমি পড়ব না, আমি স্কুলে যাবো না, আমি ভাত খাবো না’ বলে বইখাতা বিছানায় ছিটিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমিয়ে হয়তো স্বপ্ন দেখে, সে সাইকেল চেপে কোনো রাজদরবারে হাজির হয়ে গেছে।
এভাবে একদিন ঘুমের ঘোরে আতিক স্বপ্ন দেখছিল। স্বপ্ন দেখছিল, সে তার সবচেয়ে পছন্দের একটি লাল সাইকেল কিনেছে। সাইকেল চালাচ্ছে আর ঘামছে। বেল বাজিয়ে লোকজনকে পাশ কাটিয়ে ছুটে চলছে কোথায় যেন, সে নিজেও জানে না। নতুন সাইকেল নিয়ে বন্ধুদের সাথে প্রতিযোগিতা করছে। আবার গ্রামের আধাপাকা রাস্তায় চলতে গিয়ে ঢলে পড়ছে। নতুন সাইকেলে কাদা লাগছে ভেবে মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। সাইকেলের নামও দিয়েছে। কী চমৎকার নামÑ ‘আতিকের দুরন্ত সাইকেল’। সাইকেল নিয়ে স্কুলে যাওয়া শুরু করে দিয়েছে। দফতরি নানা বেশ পাহারায় রাখছেন। এমনিভাবে রাত ফুরিয়ে যায়, তবুও সাইকেল নিয়ে তার স্বপ্ন দেখা শেষ হয় না।
একদিন আতিক স্কুল থেকে ফিরে দেখে, তার বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ভীষণ অসুস্থ। তার মা নিরুপায় হয়ে শুধু কান্না করে যাচ্ছে। ডাক্তার ডাকা আবশ্যক হয়ে পড়েছে। অনেক দূরের পথ। আতিক ভাবনায় পড়ে গেল। ডাক্তার ডাকতে ডাকতে তার বাবা পৃথিবীতে হয়তো থাকবে না। কিন্তু ডাক্তার তাকে ডাকতেই হবে। বাবাকে বাঁচাতেই হবে। স্কুল থেকে সবে ফেরা ক্ষুধার্ত শিশুটি কিভাবে ডাক্তার ডেকে আনবে? তার মাথা কাজ করছিল না। হঠাৎ তার বন্ধু মাহবুবের সাইকেল চালানো দেখে বুদ্ধির উদয় হলো। তাকে সাইকেল চালিয়ে ডাক্তার ডেকে আনতে হবে।
অতঃপর চটপট মাহবুবের কাছ থেকে সাইকেল নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারের দিকে রওনা হলো। সাইকেল চালাচ্ছে আর উত্তপ্ত রোদে ঘামছে। অবশেষে ডাক্তার নিয়ে বাড়ি ফিরে তার বাবার চিকিৎসা করায় এবং বাবাকে মৃত্যুর পথ থেকে ফিরিয়ে আনে। হয়তো এই দুঃসময়ে তার বন্ধুর সাইকেলটি না থাকলে নিভৃত পলøীতে এত দ্রুত ডাক্তার ডেকে আনা সম্ভব হতো না। তার সাইকেল চালানো শেখা থাকায় বিপদ অনেকাংশে কেটে গেল। বাবাকে যেন ফিরে পেল। মায়ের মুখে হাসি ফুটাল। নিতান্ত গরিব বাবার যদি প্রাণ চলে যেত, তাহলে কী হতো তার পরিবারেরÑ এই ভেবে আতিকের সেদিনের ভয়াবহ মুহূর্তটি পেরিয়ে যায়।
সপ্তাহখানেক পর আতিক স্কুল থেকে ফিরে দেখে তার বারান্দায় একটি লাল সাইকেল। তারপর মাকে জিজ্ঞেস করেÑ ‘এটি কার সাইকেল?’ মা উত্তরে বলেÑ ‘বাবা, তোর জন্য কিনে এনেছে।’ দৌড়ে সাইকেলের কাছে গিয়ে সাইকেল জড়িয়ে ধরে ভাবতে থাকে, সেদিনের কারণে হয়তো বাবা আমার জন্য এ সাইকেলটি কিনে এনেছে। আমাকে খুশি করতেই বাবার এ উপহার। কিন্তু বাবা টাকা পেল কোথায়? এত টাকা বাবাকে কে দেবে? গতকাল পরীক্ষার ফি চেয়ে পেলাম না। বাবা বলল, বড় অভাবে আছি। কিন্তু সাইকেল কেনার এত টাকা কোথা থেকে এলো? বাবা কি তার জমি চাষ করার জন্য জমানো টাকা দিয়ে কিনেছে সাইকেলটি? তবে চাষাবাদ কিভাবে হবে? সারা বছর খাবো কী? সাইকেল নিয়ে আতিকের মন নানা প্রশ্ন আর উত্তরের খেলা খেলতে শুরু করে দিলো। বারবার ভাবতে থাকল, আমি এ কোন দায়বদ্ধতায় পড়লাম।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.