পাকুম পুকুম পিঁপড়া

সারমিন ইসলাম রত্না

টেবিলের ওপর বড় বড় মিষ্টি রাখা। সেই মিষ্টির গন্ধে ছুটে এলো দুটো পিঁপড়া। বড় বড় চোখ করে দেখতে লাগল। নিশ্চয়ই আজ কোনো ধনী ব্যক্তির বিয়ে। বরের পক্ষ থেকে এসেছে এই মিষ্টি। অতিথি চলে আসার আগেই সবাইকে ডেকে নিয়ে আসি। তার পর দলে দলে ছুটে এলো পিঁপড়ারা। ঝাঁপিয়ে পড়ল মিষ্টিগুলোর ওপর। সবাই মিলে পাকুম পুকুম করে খেতে লাগল আর বলতে লাগল আহা! কী মজার মিষ্টি! কী মজা, কতদিন খাই না এমন মিষ্টি, আহা! মিষ্টির কত স্বাদ।

খাব-দাব নিয়ে যাব
রসে ভরা মিষ্টি
ছানা-পানা খেয়ে দেয়ে
পাবে কত পুষ্টি।

পিঁপড়ারা পেটপুড়ে খেয়ে ছানা-পানাদের জন্য মাথা বোঝাই করে মিষ্টি নিয়ে গেল তাদের ডেরায়। ছানা-পানারাও ঝাঁপ দিলো সেই মিষ্টির ওপর। কত্ত বড় মিষ্টি, কী মজার মিষ্টি। মুহূর্তের মধ্যে সব মিষ্টি সাবাড়। পিঁপড়ারা বলল দাঁড়া, আমরা আরো আরো মিষ্টি নিয়ে কিছুক্ষণ পর আসছি। হই হই করতে করতে পিঁপড়ারা আবার মিষ্টি আনতে বেরিয়ে পড়ল।
চার দিকে বিয়ের শোরগোল, লাল-নীল বাতি জ্বলছে। কী সুন্দর লাল টুকটুকে শাড়ি পরে, ঝকমকে চকমকে গহনা পরে কনে বসে আছে বিয়ের মঞ্চে। ঢাকঢোল পিটিয়ে, বাজনা বাজিয়ে বর এলো। ফুল ছিটিয়ে, আতশ ফুটিয়ে বরকে স্বাগত জানানো হলো। বর গিয়ে বসল কনের পাশে। আহা! কী সুন্দর জুটি। কত্ত মানিয়েছে দু’জনকে। একটি পিঁপড়া বলে উঠল, দেখেছিস মেয়েটি কী সুন্দর! আমার ছেলের জন্য ঠিক এমন সুন্দরী বউ ঘরে আনব। যাদের ঘরে বিয়ের উপযুক্ত ছেলে পিঁপড়া আছে তারা সেই পিঁপড়ার সাথে তালেতাল মিলিয়ে বলে উঠল, হ্যাঁ হ্যাঁ, আমাদের ছেলের জন্যও ঠিক এমন একটি মেয়ে বউ করে আনব। আরেকটি পিঁপড়া বলে উঠল, আমার মেয়ের জন্য এমন একটি জামাই আনব। যাদের ঘরে বিয়ের উপযুক্ত মেয়ে আছে তারা সবাই একসাথে বলে উঠল, আমরাও আমাদের মেয়ের জন্য ঠিক এমন একটি জামাই আনব। সানাই বাজিয়ে, আনন্দ উলøাস করে বিয়ে হলো। এখন সবার মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করা হবে। পিঁপড়ারা এই মুহূর্তটির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল এতক্ষণ। সবাইকে হাতে হাতে মিষ্টি খেতে দেয়া হলো। সবাই ঠোঁট মাখিয়ে, গাল মাখিয়ে মিষ্টি খেল। একটি পিঁপড়া নাচতে নাচতে বলে উঠল-

পিঁপড়া খাওয়া মিষ্টি
মানুষেরা কত্ত বোকা
নেইকো দেখার দৃষ্টি
পিঁপড়া খাওয়া মিষ্টি।
ধুমধাড়াক্কা করে, দামি দামি গøাস-প্লেটের টুং টাং শব্দ বাজিয়ে খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শেষ হলো। এখন কনে চলে যাবে শ্বশুরবাড়ি। কনের বাবা বরের বাবার কাছে এসে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বললেন, আমার মেয়েটাকে আপনাদের হাতে তুলে দিলাম, বড় আদরের মেয়ে আমার, একটু দেখে রাখবেন। বরের বাবা মৃদু হেসে বললেন, হ্যাঁ বেয়াই সাহেব, তা তো অবশ্যই; কিন্তু আপনি যে আপনার কথা রাখলেন না? কনের বাবা অবাক হয়ে বললেন, কোন কথা? ওই যে আমার ছেলেকে একটি গাড়ি দেয়ার কথা ছিল। এত এত মানুষের সামনে এ কথা শুনে কনের বাবা বড্ড লজ্জা পেয়ে গেলেন, মুখটা কাচুমাচু করে বললেন, আমি তো আমার যা কিছু বলার আপনাকে বলেই দিয়েছি- এখন না হয় এসব কথা থাক। বর একটু মুচকি হাসি দিয়ে বলল, শ্বশুর আব্বা, আপনি কিন্তু খুব বেশি দেরি করবেন না, গাড়িটা আমার অনেক প্রয়োজন। লাল শাড়িতে সজ্জিত নতুন বউ বলে উঠল, আমি এই পরিবারে যাবো না, আর এই রকম বরের সাথেও সংসার করব না।
চার দিক থেকে আকাশ কালো করে প্রতিবাদের ঝড় উঠল, হ্যাঁ হ্যাঁ আমরাও মানি না এই বিয়ে, আমরা আমাদের মেয়েকে কখনোই এমন বরের হাতে তুলে দেবো না। পিঁপড়ারাও বাজ পড়ার মতো উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদ জানাল, আমরাও মানি না এই বিয়ে। একটি বয়স্ক পিঁপড়া, যে পিঁপড়ারা তাদের মেয়ের জন্য এমন একটি বর চেয়েছিল তাদের উদ্দেশে বলল, সত্যি কি তোমরা তোমাদের মেয়েদের জন্য এমন বর চাও? পিঁপড়ারা ভয়ার্ত কণ্ঠে বলে উঠল, না না, আমরা আমাদের মেয়ের জন্য কখনোই এমন বর চাই না। এবার বয়স্ক পিঁপড়াটি, যে পিঁপড়ারা তাদের ছেলের জন্য এমন একটি মেয়েকে বউ করতে চেয়েছিল তাদের উদ্দেশেও বলল, তোমাদের কি এরকমই একটি মেয়ে চাই? পিঁপড়ারা সমস্বরে বলে উঠল, হ্যাঁ হ্যাঁ, এরকমই একটি মেয়েকে বউ করে আনতে চাই। সব পিঁপড়া একসাথে বলে উঠল এখন তো যে মিষ্টি খেয়েছি তা উগরে ফেলে দিতে ইচ্ছে করছে, মিষ্টিগুলো তো এই ছেলের বাবাই নিয়ে এসেছিল। চলো চলো আমরা আমাদের ডেরায় ফিরে যাই। হ্যাঁ হ্যাঁ, চলো চলো। এমন সময় একটি লাল পিঁপড়া চোখ নাচিয়ে বলল, কিন্তু তার আগে সবাইকে একটি কাজ করতে হবে। উপস্থিত পিঁপড়ারা বুঝে ফেলল কী করতে হবে। লাল পিঁপড়া বলল, তোমরা প্রস্তুত? হ্যাঁ আমরা প্রস্তুত। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই বরসহ বরের বাবা ও তাদের সব আত্মীয়-স্বজনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল পিঁপড়ারা। বর চিৎকার করে বলল, ষড়যন্ত্র ষড়যন্ত্র পালাও পালাও। মুহূর্তেই বর তার সব দলবল নিয়ে সেখান থেকে উধাও। হা হা হি হি হো হো হাসির বন্যা বয়ে গেল। কিন্তু এত এত পিঁপড়া হঠাৎ কোথা থেকে এলো কেউ কিছুই বুঝতে পারল না। পিঁপড়ারা ছুটে এসে লাল টুকটুকে শাড়ি পরা কনেকে দেখতে লাগল। কত্ত সুন্দর মেয়ে! ঠিক রানীর মতো! পিঁপড়ারা সে রানীকে ঘিরে নাচতে নাচতে ছড়াগান গাইতে লাগলÑ

চাই না এমন বর
যৌতুকের লোভে যারা
ভাঙতে পারে ঘর
চাই না এমন বর।

চাই এমন কনে
যে কনেরা যৌতুককে
পাঠায় নির্বাসনে
চাই এমন কনে।
আহা! চাই এমন কনে।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.