ভাষা দিবসের ভাবনা

নূরুল ইসলাম খলিফা

ভাষা আল্লাহর এক অপূর্ব দান, এক বিশেষ নেয়ামত। নিজেকে প্রকাশ করার মাধ্যমই হচ্ছে ভাষা। ভাষা যেমন মৌখিক আছে, তেমনি লিখিত আছে- আছে শারীরিক ভাষা (নড়ফু ষধহমঁধমব)। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজিদে বলেছেন, ‘তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষাসমূহ ও দেহের বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানী লোকদের জন্য বহু নিদর্শন বিদ্যমান রয়েছে’ (সূরা আর-রুম : আয়াত-২২ )। 

ভাষা মানুষের প্রকাশের মাধ্যম। আর মানুষ বিভিন্ন সম্প্রদায়ভুক্ত। তার নিজস্ব প্রকাশভঙ্গি আছে, আছে নিজস্ব স্টাইল। ভাষার সাথে মানুষের বোধ-বিশ্বাস, ধর্ম-সংস্কৃতি ও সভ্যতা সংস্কৃতি সম্পর্ক রয়েছে। ইংরেজি একটা ভাষা হওয়া সত্ত্বেও স্কটিশ, আইরিশ এবং ব্রিটিশদের ইংরেজির কথা বলার মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। এটি আঞ্চলিক পার্থক্য যার সাথে তাদের হাজারো বছরের অভ্যাস ও ঐতিহ্যের সম্পর্ক।

বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের মানুষের ভাষা এক হলেও এতে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। তেমনি বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান ও হিন্দুদের বাংলা ভাষার মধ্যে লক্ষণীয় পার্থক্য রয়েছে। ভাষার সাথে মানুষের বোধ-বিশ্বাসের বা ঈমান-আকিদার সম্পর্ক আছে। কাজেই ‘মরহুম’কে ‘প্রয়াত’ লিখে যারা ভাষাকে অসাম্প্রদায়িক বানাতে চান তাদের আচরণের যৌক্তিক নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। মরহুম শব্দটির সাথে একজন মুসলিমের বোধ বিশ্বাসের সম্পর্ক আছে, যা ‘প্রয়াত’ শব্দ দিয়ে প্রকাশিত হয় না। ‘কালেমা’ কথাটির শব্দগত অর্থ কথা বা বাক্য। কিন্তু একজন মুসলিম বিয়ের ‘কালেমা’ বললে যা বুঝবেন, বিয়ের ‘বাক্য’ বললে তা বুঝবেন না। এখন বাক্য বা কথা না বলে ‘কালেমা’ বলার কারণেই ভাষা সাম্প্রদায়িকতার দোষে দুষ্ট হয় না। মা-বাবার মৃত্যুর পরে তাদের ‘শেষকৃত্য নয়, তাদের ‘দাফন কাফন’ করব। এ পরিভাষা আমার বিশ্বাসের সাথে জড়িত। মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য এ শব্দটিকেই প্রাধান্য দেবো এবং এটাই আমার স্বাভাবিক ভাষা।

পৃথিবীর সব ভাষাই অন্য ভাষার শব্দভাণ্ডার থেকে সমৃদ্ধ হয়েছে। ইংরেজি ল্যাটিন থেকে এবং আমাদের বাংলা ভাষা সংস্কৃত, আরবি, ফারসি, তুর্কি ও ইংরেজি ভাষার শব্দভাণ্ডার থেকে সমৃদ্ধ হয়েছে। এখন যারা বাংলা ভাষাকে আরবি, ফারসি শব্দ মুক্ত করে ‘অসাম্প্রদায়িক’ বানাতে চাইলে তা হবে বিকৃত মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ। অনেকের কাছে মুসলিম ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ছাপ রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ তার কাব্যে কমই আরবি বা ফারসি শব্দ ব্যবহার করেছেন; পক্ষান্তরে নজরুল, ফররুখ প্রমুখ কবি তাদের কাব্যে অসংখ্য আরবি, ফারসি শব্দ মোক্ষমভাবে ব্যবহার করেছেন। এটি এ কারণেই হয়েছে যে, প্রত্যেকেই তাদের পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় ইতিহাস ঐতিহ্য ও বোধ বিশ্বাস দ্বারা পরিচালিত। তাদের কাউকেই ‘সাম্প্রদায়িক’ বলার সুযোগ নেই। আসলে ভাষা সাম্প্রদায়িক হয় না, সাম্প্রদায়িক হয় মানুষ। আর একজন প্রকৃত বিশ্বাসী মানুষ যিনি খোদাভীরু হন, তিনি কখনো ধর্মান্ধ, উগ্রবাদী বা সাম্প্রদায়িক হতে পারেন না। তিনি জানেন প্রতিটি মানুষ আল্লাহর সৃষ্টি। সুতরাং ভাষা, বর্ণ বা বিশ্বাসের কারণে কারো প্রতি বৈষম্য করার যুক্তি নেই। করলে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এ কারণে স্রষ্টার কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

ভাষা দিবসে আজ আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে, আল্লাহর একটি নিদর্শন ও নেয়ামত হিসেবে ভাষাকে আমরা কিভাবে ব্যবহার করছি। এর দ্বারা আমরা তাওহিদের প্রকাশ ঘটাচ্ছি নাকি শিরকের প্রকাশ করছি। ভাষার মতো অনন্য সম্পদ দিয়ে আমরা সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের প্রচার ও প্রসারে কাজ করছি, নাকি অশ্লীল, অকল্যাণ, মিথ্যা ও চরিত্রহননের কাজ করছি। আজ এটাই আমাদের ভাবনা হওয়া উচিত। বাংলা ভাষা আমার মায়ের ভাষা। এ ভাষাতেই নিজেকে প্রকাশ করি; আমার হাসি আনন্দ, হরিষ বিষাদের বাহন এটি।

লেখক : ব্যাংকার

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.