কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গতকাল সর্বস্তরের মানুষের ঢল : আবদুল্লাহ আল বাপ্পী
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গতকাল সর্বস্তরের মানুষের ঢল : আবদুল্লাহ আল বাপ্পী

বিনম্র শ্রদ্ধায় ভাষাশহীদদের স্মরণ করল জাতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় ভাষা আন্দোলনের মহান বীর শহীদদের স্মরণ করল জাতি। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ ফুলে ফুলে ভরে ওঠে দেশের সব প্রান্তের প্রতিটি শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ। গান, কবিতা আবৃত্তি, দোয়া, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ গতকাল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে দিনব্যাপী চলে আরো নানা আয়োজন।
বাংলাদেশের সাথে সাথে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।
রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একুশের প্রথম প্রহরে জাতির প থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মহান ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। রাত ১২টা ১ মিনিটে প্রথমে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এবং পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় রেকর্ডে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গান বাজানো হয়। পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী কিছুণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন।
রাষ্ট্রপতি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পৌঁছলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো: আখতারুজ্জামান তাকে স্বাগত জানান।
এরপর জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
পরে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলের সিনিয়র নেতাদের সাথে নিয়ে দলের প থেকে শহীদ মিনারে ফের পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
এ সময় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আবুল মাল আবদুল মুহিত, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী ও মোহাম্মদ নাসিম, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, শিামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক, খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ ও আবদুর রহমান, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন, শ্রমবিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান সিরাজ, দফতর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, উপদফতর সম্পাদক বিপ্লব বড়–য়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ দলীয় নেতাদের নিয়ে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
পরে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়া শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিমের নেতৃত্বে ১৪ দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর সেনা, বিমান ও নৌবাহিনী প্রধান পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। বাংলাদেশ পুলিশের প থেকে মহাপুলিশ পরিদর্শক পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
পরে অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার এবং ঢাকা দণি সিটি করপোরেশনের প থেকে ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।
বিশিষ্ট ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সর্বস্তরের জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয় শহীদ মিনার চত্বর। রাত ১২টা বাজার আগে থেকেই শহীদ মিনার এলাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের লোকজন জড়ো হতে থাকেন । একুশের প্রথম প্রহরের আনুষ্ঠানিকতার পর ভোররাত থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ঘিরে মানুষের ঢল নামে । এ সময় হাজার হাজার মানুষ খালি পায়ে বুকে শোকের প্রতীক কালো ব্যাজ লাগিয়ে হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ গানে কণ্ঠ মিলিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার অভিমুখে এগিয়ে যান। ভোরের সূর্য ওঠার পর বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে থাকে মানুষের বাঁধভাঙা জোয়ার। দিনব্যাপী চলতে থাকে জনতার জোয়ার। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সহযোগী সংগঠন, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ছাত্র, যুব, শ্রমিক, কৃষক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ একে একে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে শুরু করেন। পুরো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পরিণত হয় মানুষের মেলায়। ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় শহীদ মিনার এলাকার বিশাল চত্বর। শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসা সব বয়সী মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদ এবং শরীরে ছিল একুশের ছাপ। শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীদের গালে, বাহুতে একুশের আল্পনা যেমন ছিল তেমনি একটু বয়স্কদের পোশাক পছন্দের ক্ষেত্রে দেখা গেছে একুশের শোকের ছাপ। সাদা-কালো ম্যাচ করা পোশাক পরিধানের সাথে সাথে অনেকের মাথায় ছিল একুশের স্লোগান লেখা ফিতা। অনেকের বুকে ছিল শোকের প্রতীক কালো ব্যাজ।
দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বে বিএনপি, রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে ওয়ার্কার্স পার্টি, হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের নেতৃত্বে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, খালেকুজ্জামান ভূইয়ার নেতৃত্বে বাসদ, দিলীপ বড়–য়ার নেতৃত্বে সাম্যবাদী দল, অধ্যাপক ড. মো: আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যাপক ডা: কামরুল হাসান খানের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান।
এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক সমিতি ও সিনেট সদস্য, সেক্টরস কমান্ডার্স ফোরাম, গণফোরাম, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দণি, আওয়ামী যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ, বাংলা একাডেমি, সভাপতি মুহম্মদ শফিকুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক ফরিদা ইয়াসমিনের নেতৃত্বে জাতীয় প্রেস কাব, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, ঢাকা সাবএডিটরস কাউন্সিল, শিল্পকলা একাডেমি, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী নাগরিক দল, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট, ছাত্র ফেডারেশন, মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিণ প্রতিষ্ঠান আজিমপুর, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, গণতন্ত্রী পার্টি, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন ভাষা শহীদদের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
সকালে আওয়ামী লীগের প থেকে প্রভাতফেরিসহ আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের কবরে ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে বিভিন্ন শহর, বন্দর, রাস্তার মোড়ে, মাঠে নতুন অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে শিশু- কিশোর এবং তরুণ যুবসমাজ। বন্ধু-বান্ধব মিলে আয়োজন করে নানা অনুষ্ঠান। মাইক লাগিয়ে দিনব্যাপী প্রচার করা হয় দেশাত্মবোধক গান ও কবিতা।
অমর একুশে উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন দোয়া, আলোচনা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে।
মহান শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলে ইসলামিক ফাউন্ডেশন আয়োজিত পবিত্র কুরআনখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। সকালে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তর, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, ইসলামী যুব আন্দোলন, গণফ্রন্ট, আই ই এস স্কুল অ্যান্ড কলেজ দোয়া ও আলোচনা অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন ধরনের আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালন করে দিবসটি।
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে আমাদের ছাত্র-তরুণরা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত করেছিল। তাদের সেই সংগ্রাম এবং ত্যাগের স্মরণে প্রতিবছর শ্রদ্ধার সাথে পালিত হয়ে আসছে একুশে ফেব্রুয়ারি।
ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালে ঐতিহাসিক একুশের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ঘোষণার পর থেকে আন্তর্জাতিকপর্যায়েও দিবসটি পালিত হচ্ছে।
শহীদ দিবস উপলে গতকাল ছিল জাতীয় ছুটির দিন। এ দিন সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, শিাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি ভবনগুলোয় জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়।
এ উপলে সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ এবং বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো একুশের বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করে।
রাজধানীর স্কুল ও কলেজগুলোতে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.