আওয়ামী লীগের তৃণমূলে সঙ্ঘাত

মনিরুল ইসলাম রোহান

আওয়ামী লীগের তৃণমূলে একের পর এক সঙ্ঘাত ও খুনোখুনি লেগেই আছে। এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না দলটির হাইকমান্ড। ঢাকায় ডেকে এনে অনুনয় বিনয় করে কিংবা ধমক দিয়েও তৃণমূল নেতাকর্মীদের বাগে আনতে পারছে না দলটি। গতকাল বুধবারও নোয়াখালীর হাতিয়ায় আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। আগের রাতের ঘটনার রেশ ধরে মঙ্গলবার ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের দুই পথে সংঘর্ষ হয়েছে। গত সোমবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত দুই দিনব্যাপী ছাত্রলীগ ও পুলিশের মধ্যে থেমে থেমে চলা ত্রিমুখী সংঘর্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রিত হল থেকে দু’টি এলজি ও বস্তাভর্তি রামদাসহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ।
বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে আওয়ামী লীগে অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ হয়েছে ১৫০টি। এতে ২৯ নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ২৪৬৬ নেতাকর্মী। আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের মধ্যে ৩টি সংঘর্ষ হয়েছে। এতে তিনজন নিহত এবং ৪৩ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে ৭টি। এতে নিহত হয়েছেন একজন এবং আহত হয়েছেন ৪৫ জন। ছাত্রলীগ-যুবলীগের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে ৭টি। এ ঘটনায় নিহত হয়েছেন একজন এবং আহত হয়েছেন ৪৩ জন। গত বছর যুবলীগে অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ হয়েছে ১১টি। এতে নিহত হয়েছেন একজন এবং আহত হয়েছেন ৫০ জন। গত বছরে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিহত হয়েছেন ৫ জন। এদের মধ্যে ২৯টি অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ২৪১ জন। গত বছর সারা দেশে রাজনৈতিক সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ৫২ জন। এর মধ্যে ৪০ জনই ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এবং তার সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মী। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য মতে, ২০১৬ সালে রাজনৈতিক সঙ্ঘাতে দেশে ১৭৭ জনের প্রাণহানি ঘটে। এর মধ্যে শুধু মতাসীন আওয়ামী লীগেরই ৮৩ জন। আর ২০১৫ সালে রাজনৈতিক সঙ্ঘাতে প্রাণহানি হয়েছে ১৫৩ জনের। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের সঙ্ঘাতে নিহত হয়েছেন ৩৩ জন। এর আগের বছর ২০১৪ সালে নিহতের সংখ্যা ছিল ১৪৭। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ৩৪ জন।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনোদপুর ফটকের সামনে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এর আগে ১৬ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীর পাঁচলাইশে পুলিশের তল্লাশি চৌকিতে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা গুলিবর্ষণ করে। এ ঘটনায় দুই দফায় ৬ নেতাকর্মীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। একই দিনে নড়াইলের দিঘলিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও লোহাগড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক লতিফুর রহমান পলাশকে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় সন্দেহের তীর প্রতিপক্ষের দিকে গড়ায়। শেষমেশ জেলা আওয়ামী লীগের নেতা শরীফ মনিরুজ্জামানসহ ১৫ জনকে আসামি করে মামলা করে ভুক্তভোগীরা। একই দিনে নড়াগাতি থানার কলাবাড়িয়া ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি বিপ্লবের বাড়িতে হামলা করে প্রতিপক্ষের লোকজন। ওই একই দিনে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে নতুন কমিটি গঠন নিয়ে যুবলীগের দুই গ্রুপে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে রাবার বুলেট ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। এ ছাড়াও শরীয়তপুরের নড়িয়ায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এক পক্ষ অন্য পক্ষের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করে। ১৪ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার মেঘনায় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি ফেনীর সোনাগাজীতে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। গত ৩ ফেব্রুয়ারি সিলেটে ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ৫ জন গুলিবিদ্ধ হয়। একই দিনে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের ছয়ানী ইউনিয়নে যুবলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ হয়। এক পক্ষ অন্য পক্ষের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এর আগে ২ ফেব্রুয়ারি বাগেরহাটের চিতলমারিতে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিনেও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বগুড়ায় ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে বইমেলা পণ্ড হয়ে যায়। বছরের শুরুতেও ক্ষমতাসীন দল ও তার সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীরা মারামারি, হানাহানি ও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ৩১ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হামলায় যুবলীগকর্মী জাকির হোসেন নিহত হন। এ ছাড়াও গত বছরের মে মাসে নরসিংদীর রায়পুরায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বাঁশবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সিরাজুল হক এবং সাবেক চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমানের সমর্থকদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রাজনগর গ্রামের জয়নাল মিয়া ও সোবহানপুর গ্রামের আরশ আলী নিহত হন। এর আগে গত ১৯ এপ্রিল একই এলাকায় ওই দুই গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে দুইজন নিহত হন। এর আগে কক্সবাজার উখিয়া গ্রামে দুই পক্ষের সংঘর্ষ চলাকালে কিশোর মজিবুর রহমান জাবু নিহত হয়। সে পালংখালী উচ্চবিদ্যালয়ের স্কুল ছাত্রলীগ কমিটির সভাপতি ছিল। একই দিন রাতে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে নিজ বাড়ির সামনে করের হাট ইউনিয়ন যুবলীগের সহসভাপতি গোলাম মোস্তফার রক্তাক্ত লাশ পাওয়া যায়। গত ৭ মে পিরোজপুর সদর উপজেলার কদম তলা গ্রামে প্রতিপক্ষের হাতে খুন হন সাকিব হাওলাদার। গত ৩০ এপ্রিল ফরিদপুরের সালথা আটঘর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে নিহত হন প্রবাসী জিয়াউর রহমান জিয়া। ১৮ এপ্রিল মঙ্গলবার রাতে কুমিল্লার মুরাদনগরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও ইউপি সদস্য আলী আশ্রাফ এবং আলাউদ্দিন আনিস গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আওয়ামী লীগ কর্মী ফারুক ও সাইদুর নিহত হন। এর আগে গত বছর ২০ জুলাই শরীয়তপুরের নড়িয়ার জবসা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান শওকত আলীর সমর্থকেরা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা জাকির হোসেন হাওলাদারকে কুপিয়ে হত্যা করে। গত বছরের ১৭ জানুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় একটি জলমহাল দখলকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের রক্তয়ী সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনজন নিহত হন। এর আগে ১০ জানুয়ারি আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার বড়কান্দি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে হোসেন খাঁ নিহত হন।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের অন্যতম মুখপাত্র ড. হাছান মাহমুদ এমপি নয়া দিগন্তকে বলেন, আওয়ামী লীগ একটি বড় দল। টানা দুইবার ক্ষমতায় আছে। এত বড় দলের তৃণমূল পর্যায়ে ছোটখাটো কিছু মতবিরোধ থাকতেই পারে। তবে আমাদের দলে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল অনুপ্রবেশ করেছে। কিছু ভুঁইফোড় সংগঠন দাঁড় করিয়েও কিছু অনুপ্রবেশকারী এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। আর এসব ঘটনা কিছু কিছু পত্রিকা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রকাশ করে। এক প্রশ্নের জবাবে হাছান মাহমুদ বলেন, আইন ও সালিশ কেন্দ্র যে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে রিপোর্ট তৈরি করে তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এগুলো তারা বিভিন্ন দেশেও পাঠায়। ফলে তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে আমার সংশয় রয়েছে। যেমন পাড়ায় মহল্লায় ছেলেমেয়েদের মধ্যে ছোটখাটো যে দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাত হয়, ব্যবসায়ীদের মধ্যে যে সংঘর্ষ হয়, এর মধ্যে একজন আওয়ামী লীগ সমর্থক হলেই তা রাজনৈতিক সংঘর্ষ হিসেবে চালিয়ে দেয়া হয়। ফলে তাদের তথ্য উপাত্ত নিয়ে আমার যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.