বিজেপির জেনারেল

আসিফ হাসান

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইতিহাসে কী পরিচয়ে বিখ্যাত হয়ে থাকবেন? অনেক কারণই রয়েছে। অনেক ইতিহাসই তিনি গড়েছেন। তবে তার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব সম্ভবত বিপিন রাওয়াতকে সেনাপ্রধান করা। এখন পর্যন্ত দারুণ কাজে দিয়েছে এই নিয়োগ। দু’জন সিনিয়রকে ডিঙিয়ে তাকে নিয়োগ দেয়া হয় ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে। ভারতে সিনিয়রকে ডিঙিয়ে সেনাপ্রধান করার এটি দ্বিতীয় ঘটনা।
এর মাধ্যমে আর যা-ই হোক না কেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারছেন বেশ ভালোভাবেই। মোদিকে নির্বাচনী সাফল্য, বিরোধী দলকে ঘায়েল করা, কোনো বিষয় থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়া, আঞ্চলিক উত্তেজনা সৃষ্টি করে স্বার্থ সিদ্ধি করার মতো নানা কাজে বেশ ভালোভাবে সহায়তা করছেন তিনি। এসব কারণে রাওয়াতকে বলা হয় ‘বিজেপির জেনারেল’। পাকিস্তান বা বাংলাদেশের বিপরীতে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে বিবেচনা করা হয় অরাজনৈতিক হিসেবে। সেই পরিচিতি থেকে তিনি বের হয়ে এসেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাসীন বিজেপির আরেক ফ্রন্ট হিসেবেই তিনি সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করছেন।
আসামের মুসলিমদের নিয়ে তিনি যে মন্তব্য করেছেন, এর প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে তেমনটাই মনে হতে পারে। এক দিকে আসামে নাগরিকত্ব তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে, অন্য দিকে উত্তর-পূর্বাংশে চলছে রাজ্য বিধান সভার নির্বাচন। এখানে জাতীয়তাবাদী জিগির যদি সেনাপ্রধানের মুখ থেকে বের করা যায়, তবে বিজেপির জয় আটকায় কে? তা ছাড়া ভারতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনা এখন চাপা পড়ে গেছে তার মন্তব্যে।
তিনি বলেছেন, আসাম রাজ্যে অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (এআইইউডিএফ) বিজেপির চেয়েও দ্রুতহারে বাড়ছে। এ বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে মুসলিমদের সমর্থন। ভারতকে অস্থিতিশীল করার জন্য পাকিস্তান ও চীন উত্তর-পূর্বের অংশে বাংলাদেশী অভিবাসীদের ঠেলে দেয়ার কারণে এমনটা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন।
জেনারেল রাওয়াত নয়াদিল্লিতে নিরাপত্তা এস্টাবলিশমেন্টের সিনিয়র ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে ‘নর্থ ইস্ট রিজিয়ন অব ইন্ডিয়াÑ ব্রিজিং গ্যাপ অ্যান্ড সিকিউরিং বর্ডার্স’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তৃতাকালে ওই মন্তব্য করেছিলেন।
আসামে মুসলিম জনসংখ্যার বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমার মনে হয় না এখন ওই এলাকার জনসংখ্যার চিত্র বদলানো যাবে। সরকারে যারাই থাকুক না কেন, পাঁচ থেকে আট বা ৯টি জেলায় আগ্রাসন চালানো হয়েছে।
ভারতীয় সেনাপ্রধান বলেছেন, চীনের সমর্থনে পাকিস্তানের ছায়াযুদ্ধের অংশ হিসেবে ভারতের উত্তর-পূর্বাংশে বাংলাদেশ থেকে লোকজন যাচ্ছে।
তার ওই বক্তব্য নিশ্চিতভাবেই ভারতের সাথে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও চীনের কূটনৈতিক বিরোধের সৃষ্টি করবে।
এআইইউডিএফ প্রধান বদরুদ্দিন আজমল টুইটে বলেছেন, এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে সেনাপ্রধান রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন, যা সংবিধানে তাকে দেয়া দায়িত্বের পরিপন্থী। পরে তিনি গৌহাটিতে সাংবাদিকদের বলেন, আমরা জেনারেল রাওয়াতকে অনেক শ্রদ্ধা করি। তবে আমি মনে করি, তাকে ভুল তথ্য দেয়া হয়েছে, বিভ্রান্ত করা হয়েছে। সেনাপ্রধান যদি আসামে চলমান জনসংখ্যা পরিবর্তনের কথা বলে থাকেন, তবে তা নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব সরকারের।
অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) প্রধান আসাদুদ্দিন ওয়াইসি জেনারেল রাওয়াতের সমালোচনা করেছেন। তিনি টুইটারে বলেন, রাজনৈতিক বিষয়াদিতে হস্তক্ষেপ করা কিংবা কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যাপারে কথা বলা সেনাপ্রধানের দায়িত্ব নয়। মাওলানা আরশাদ মাদানি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, তার এ বক্তব্যে আসামকে ভারতের রাখাইন বানানোর ইঙ্গিত হতে পারে।
গত জুনে করা তার আরেকটি বক্তব্য তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। তিনি হুঙ্কার দিয়ে বলেছিলেন, ভারত আড়াই ফ্রন্টে লড়াই করবে। এর মাধ্যমে তিনি একই সাথে চীন, পাকিস্তান ও ভারত থেকে স্বাধীনতা লাভের জন্য কিংবা ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইরত সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন।
তিনি সংবাদ সংস্থা এএনআইকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ভারতীয় বাহিনী আড়াই ফ্রন্টে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত’। তিনি অবশ্য কোনো দেশের নাম প্রকাশ করেননি। তবে সবাই বুঝে নিয়েছে, এর মধ্যে থাকা দুই ফ্রন্ট হলো পাকিস্তান ও চীন।
তিনি পাকিস্তান ও চীনের বিরুদ্ধে প্রায়ই নানা উসকানিমূলক কথা বলেন। কূটনৈতিক প্রথাকে থোড়াই কেয়ার করেন।
এরপর তিনি চীনকে আক্রমণ করে আরেকটি মন্তব্য করেছিলেন। জেনারেল রাওয়াত বলেছিলেন, ভারতের প্রয়োজন পাকিস্তান সীমান্ত থেকে নজর সরিয়ে চীনা সীমান্তে নজর বাড়ানো। তিনি প্রকৃত সীমান্তরেখায় (লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোলÑ এলএসি) বেইজিংয়ের প্রদর্শিত চাপের কথাও বলেন। রীতিনীতির খেলাফ করে করা মন্তব্যের জন্য ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াতের সমালোচনা করে চীন বলেছে, এসব বক্তব্য ‘অগঠনমূলক’ এবং সীমান্তে শান্তি ফিরিয়ে আনা ও বজায় রাখার ব্যাপারে দুই দেশের শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের মধ্যে যে সমঝোতা হয়েছে, তার পরিপন্থী।
জেনারেল বিপিন রাওয়াতের ১২ জানুয়ারির মন্তব্যও তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। তিনি বলেছেন, কাশ্মির এলাকার মাদরাসাগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত সরকার। কারণ এসব জায়গায় ছাত্রছাত্রীদের ভুল শেখানো হচ্ছে।
জম্মু ও কাশ্মিরের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করে রাওয়াত এমনকি সরকার-নিয়ন্ত্রিত স্কুলগুলোর ব্যাপারেও ব্যাপক নিন্দা করেন। তার দাবি, এসব জায়গায় শিক্ষকরা ছাত্রদের বিভ্রান্ত করছে।
কাশ্মিরে ইসলামপন্থীদের উত্থান সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে বার্ষিক সংবাদ সম্মেলনে সেনাপ্রধান বলেন, ‘কাশ্মিরের তরুণ সমাজের কাছে মাদরাসা ও মসজিদের মাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিতে হবে। আমরা সেটাই চেষ্টা করছিÑ এগুলো নিয়ন্ত্রণে আনা যায় কি না।’
রাওয়াত বলেন, ‘‘রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন দরকার। এ জন্য আরো বেশি ‘সিবিএসই স্কুল’ চালুর কথা বলেন তিনি। আপনি জেনে বিস্মিত হবেন, কাশ্মিরের স্কুলে শিক্ষকরা এমন কিছু শেখাচ্ছেন, যেগুলো ছাত্রদের শেখানো উচিত নয়। দু’টি মানচিত্র পাবেন আপনিÑ একটি ভারতের, অন্যটি কাশ্মিরের। কেন এটা করা হচ্ছে? একটা শিশুর কাছে এটা কি অর্থ তুলে ধরছে?”
একে তৃণমূলপর্যায়ের মৌলিক সমস্যা আখ্যা দিয়ে রাওয়াত বলেন, সরকারি স্কুলের শিক্ষাব্যবস্থায়ও সমস্যা রয়েছে। কারণ সেখানকার শিক্ষকরাও ওই একই পরিবেশে বড় হয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘যারা অস্ত্র হাতে তুলে নিচ্ছে, তাদের মধ্যে পিএইচডিধারীও রয়েছে। কিন্তু বার্ন হলো (শ্রীনগরের মিশনারি স্কুল) থেকে কোনো সন্ত্রাসী বের হয়েছে বলে আপনি খুঁজে পাবেন না। এদের বেশির ভাগই আসছে সেই সব স্কুল থেকে, যেখানে ভুল তথ্য শেখানো হচ্ছে’।
কাশ্মিরে সাম্প্রতিক সময়ের অভিযান প্রসঙ্গে সেনাবাহিনী প্রধান বলেন, বিগত কয়েক মাসে মনোযোগ ছিল দক্ষিণ কাশ্মিরে। তবে অনুপ্রবেশ রোধে শিগগিরই সেনা মোতায়েন করা হবে। তিনি বলেন, এখন মনোযোগ দেয়া হবে উত্তর কাশ্মিরে, যাতে ওই পথে কেউ অনুপ্রবেশ করতে না পারে এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যাতে উগ্রবাদীদের আশ্রয় দিতে না পারে।
এই জেনারেলের পরিকল্পনাতেই পাকিস্তান ও মিয়ানমারে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ হয়েছিল। কাশ্মিরে এক মুসলিম তরুণকে সামরিক যানের সামনে বসিয়ে পুরো নগরী টহল দেয়ার জন্য সেনাসদস্যদের শাস্তি না দিয়ে পুরস্কৃত করেছেন। তিনিই ডোকলাম সঙ্কট তিনিই সৃষ্টি করেছেন। তিনি যত দিন দায়িত্বে থাকবেন, ততদিন প্রতিবেশীদের শান্তিতে থাকতে দেবেন না বলেই মনে হচ্ছে। 

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.