সে থাকে আটতলায়

জোবায়ের রাজু

আমাদের বিল্ডিংটা আটতলা। আজ পনেরো বছর ধরে আমরা এ বিল্ডিংয়ে ভাড়া থাকি। আটতলায় থাকে মিলিরা। ওরা নতুন ভাড়া এসেছে। মাস তিনেক হবে। মিলি দেখতে বেশ। প্রথম দেখাতেই আমার ভালো লেগে যায়। আমাদের বাসায় সকাল-সন্ধ্যা দুই বেলা করে আসে। আমার আম্মার সাথে মিলির দারুণ খাতির। আম্মাকে নাকি তার বড় খালার মতো লাগে। তার বড় খালা সুইডেনে থাকে।
দিনে দিনে মিলির সাথে আমারও ভাব গড়ে ওঠে। ভাব গড়ার পেছনে আমার বইপ্রীতি মূল কারণ। আমি প্রচুর বই পড়ি জেনে মিলিই প্রথমে আমার সাথে খাতির করতে আসে। আমরা ড্রয়িংরুমে যখন ওর সাথে গল্পের আসর তুলে সময় কাটাই, তখন আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকে মিলিকে ‘আই লাভ ইউ’ কথাটি বলার। দ্বিধা আর সঙ্কোচে আজো মিলিকে বলতে পারিনি মনের কথা।
একদিন মিলির ফোন নম্বর চাইলাম। ভাবলাম দেবে না। পরে দেখি চাইতেই সে ঝটপট নম্বর দিয়ে দিলো। সেই থেকে মাঝে মধ্যে মিলিকে কল করি। রাতের বেলা। ভালোবাসার কথাটি বলতে চেয়েও বলা হয় না আমার।
Ñহ্যালো ভাইয়া, এত রাতে কল?
Ñএমনিতে। কী করছ?
Ñকিছু না।
Ñএকটা কথা বলি?
Ñবলুন।
Ñইয়ে মানে...।
Ñহ্যাঁ বলুন।
Ñআমি আসলে...।
Ñকী?
Ñইয়ে মানে..., ইয়ে...। আজ তোমাদের কী রান্না করেছে?
Ñএ কথাটি বলতে এত আমতা আমতা করছেন? আজ রান্না হয়েছে কচুশাক দিয়ে রুই মাছ। খুব ঝাল হয়েছে।
Ñও।
এভাবে মিলির সাথে বেশ কয়েকবার ফোনে কথা বলেছি ভালোবাসার কথা বলব বলে। কিন্তু বলতে পারছি না। আরেক দিন বেশ সাহস নিয়ে ভাবলাম আজ তাকে কল করে মনের কথাটি বলবই।
Ñহ্যালো মিলি।
Ñভাইয়া, হঠাৎ এই সন্ধ্যায় কল?
Ñহুঁ। কেমন আছো?
Ñভালো। কিছু বলবেন?
Ñবলব।
Ñকী?
Ñইয়ে মানে...।
Ñহ্যাঁ বলুন ভাইয়া।
Ñআ আমি তোমাকে...।
Ñবলুন।
Ñআমি তোমাকে সেদিন ফেসবুকে দেখেছি।
Ñও আচ্ছা। হ্যাঁ, ক’দিন আগে আইডি খুলেছি।
Ñতোমার প্রোফাইলটা বেশ নাইস।
Ñথ্যাংক্স। রিকোয়েস্ট পাঠাননি কেন?
Ñআচ্ছা পাঠাব। কল করাতে রাগ করেছ?
Ñনা না ভাইয়া। কী যে বলেন!
ধুর! মিলিকে বলাই হয় না মনের কথা। প্রেমে পড়লে সাহস লাগে। আমার সে সাহস নেই। সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে আমাকে সে সাহস দেয়া হয়নি।

২.
আম্মা ঘর মুছছেন। ভেজা ফোরে আমি ধপাস করে পড়ে গিয়ে ডান পা আর কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা পেলাম। ব্যথা পেয়ে ভাবলাম মিলিকে কল করে সংবাদটি জানাই আর সুযোগ বুঝে ভালোবাসার কথাটিও জানিয়ে দিই।
কিন্তু বেশ কয়েকবার কল দেয়ার পরও মিলির থেকে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যাপার কী, রিসিভ করছে না কেন?
মিনিট দুয়েক পর মিলি ব্যাক করল।
Ñভাইয়া কল করেছেন?
Ñকরেছি তো!
Ñআসলে আমি ফোনের কাছে ছিলাম না। এসে দেখি পাঁচটা মিসকল। ভাইয়া, লাইন কেটে যাবে কিন্তু। ব্যালেন্স কম।
Ñও আচ্ছা। তোমার বাসার সবাই ভালো আছে? কে কী করছেন?
Ñবাসায় তো কেউ নেই। আমার মামাতো বোনের বিয়েতে...।
মিলির কথা শেষ না হতেই ব্যালেন্স ফুরিয়ে লাইন কেটে গেল। ব্যাক করব? ব্যাক করার আগে মনে হলো মিলিদের তো বাসায় কেউ নেই। সে একা। বাকিরা মামাতো বোনের বিয়েতে গেছে। কোনো কারণে হয়তো মিলি যায়নি। হ্যাঁ, এটাই সুযোগ। মিলি যেহেতু বাসায় একা, এ সুযোগে তার বাসায় যাওয়া যায়। গিয়ে তাদের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মিলিকে কল করব দরজা খুলতে। তার পর মনের কথা মিলিকে খুলে বলব। তার পর ভালোবেসে এক হওয়া। আহা প্রেম!
কিন্তু কোমর আর ডান পায়ের ব্যথা নিয়ে আটতলায় উঠতে বেশ ঝামেলা হবে। এ দিকে বিল্ডিংয়ের লিফটও গত সপ্তাহে নষ্ট হয়েছে। বাড়িওয়ালা এখনো ঠিক করেনি।
না। এত চিন্তা করলে হবে না। কষ্ট করে আমাকে মিলিদের আটতলার বাসায় যেতে হবে। যা করার আজই করতে হবে। প্রেমের জন্য পা ব্যথা আর কোমর ব্যথা কোনো ব্যাপারই না।
বহু কষ্টে ডান পা আর কোমরের তীব্র ব্যথা নিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে চারতলা পর্যন্ত উঠে আমার অবস্থা খারাপ। কিন্তু আমাকে যে উঠতে হবে আটতলায়। বলতে হবে ভালোবাসার না বলা কথা।
ছয়তলা পর্যন্ত উঠে মনে হলো এবার আমি মরেই যাবো। কোমরের ব্যথা দ্বিগুণ বেড়ে গেল। আব্বাকে ফোন করে বলতে হবে আসার সময় নিকটস্থ কোনো ফার্মেসি থেকে যেন একটা ব্যথানাশক সাপোজিটরি নিয়ে আসে। ওহ্, কী ব্যথা। কিন্তু হাল ছেড়ে দিলে হবে না। আমাকে যেতে হবে আটতলায়। বাড়িওয়ালা লিফটটি ঠিক করলে তো কষ্ট করতে হতো না।

৩.
পাহাড়সম ব্যথা নিয়ে আটতলায় এসে দেখি মিলিদের ফ্যাটের দরজায় বিশাল এক তালা ঝুলছে। মানেটা কী? কল দিলাম মিলিকে।
Ñহ্যাঁ ভাইয়া, আবার কী মনে করে কল?
Ñকেমন আছো মিলি?
Ñভালো। অনেক মজা হচ্ছে বিয়েতে।
Ñতুমিও গেছ বিয়েতে?
Ñহ্যাঁ। আমার মামাতো বোনের বিয়েতে আমরা সবাই এসেছি। এ কথাটা তখন আপনাকে পুরোপুরি বলার আগেই আমার ব্যালেন্স শেষ হয়ে গেল। তো কিছু বলবেন ভাইয়া?
Ñইয়ে না মানে...।
Ñআচ্ছা ভাইয়া পরে কথা বলব। আমি মিমকে সাজাচ্ছি। আজ ওর গায়েহলুদ।
Ñআচ্ছা।
হায় কপাল! কল ব্যাক তখন করলে আমাকে কি আর এই দুর্গম গিরি কান্তার মরু পার হতে হতো? ধুর, এখন আবার নিচে নামা! আমার কান্না আসছে। এই তীব্র ব্যথা নিয়ে আটতলা থেকে আমাকে নিচতলায় নামতে হবে! তার আগে আব্বাকে কল দিয়ে বলতে হবে অফিস থেকে আসার সময় যেন ব্যথানাশক সাপোজিটরি আনতে ভুল না করে। একটি নয়, দু’টি। দু’টিতে এই ব্যথা কমে কি না কে জানে!

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.