মেলা শেষে জনৈক লেখকের উপলব্ধি

তারেকুর রহমান

বদরুল ফেসবুক সেলেব্রিটি। যেনতেন সেলেব্রেটি না। একটা স্ট্যাটাস দিলেই শত শত লাইক কমেন্টস পড়ে। যদিও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে অটো লাইক সিস্টেমে সে লাইক কমেন্টস পেয়ে থাকে। তবে সে যত বড় সেলেব্রেটিই হোক না কেন অন্য সবার পোস্টে লাইক কমেন্টস করতে সেও ভুল করে না। এ নিয়ে অবশ্য বেশ বাহবা পায় বদরুল। এত বড় একজন সেলেব্রেটি হয়েও অন্যদের পোস্টে লাইক কমেন্টস করে এটি অনেক বড় মনের পরিচয় দেয়া।
বদরুল নিয়মিত ফেসবুকে গল্প লেখে। খুব হৃদয়বিদারক করে প্রেমের গল্প লেখে। তার লেখা পড়ে কান্নাকাটি করা পাবলিকের সংখ্যা একেবারই কম না। বদরুল তার নিজের পারফরম্যান্সে বেশ তৃপ্ত। রাতের গভীরে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে বদরুল একটা একটা করে লাইক কমেন্টস গুনতে থাকে। বাহ বেশ উন্নতি দেখা যাচ্ছে। দিন দিন তার জনপ্রিয়তা বাড়তেই লাগল। বিশেষ করে প্রেমিক ছেলেমেয়েদের কাছে এক আইডল বদরুল। এত সুন্দর করে প্রেমকাহিনী কিভাবে লেখে বদরুল? এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেও কিছু মানুষ কূল পায়নি। তবে কিছু মানুষ কূল পেয়েছে। তার সংখ্যা অবশ্য বেশি না। বিখ্যাত মানুষদের লেখাগুলোকে এদিক-সেদিক করে সুন্দর করে গুছিয়ে ফেসবুকে লিখে দিন দিন সেলেব্রেটি খ্যাতি নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে বদরুল। যারা বদরুলের ভণ্ডামি ধরতে পেরেছে তারা ভয়েও কিছু বলছে না।
বদরুল এত বেশি জনপ্রিয় যে তার ভক্তকুল আকুল আবেদন জানিয়েছে বদরুল যেন বইমেলায় বই বের করে। বদরুল তথাকথিত দয়ার সাগর, সে কি ভক্তদের আবেদন ফেলে দিতে পারে? অবশ্য বই বের করার আগে নিজের জনপ্রিয়তা একবার যাচাই করা দরকার। বদরুল সাহস করে ফেসবুকে একটা পোস্ট দিলোÑ ‘বইমেলায় বই বের করতে চাই। আপনারা কী বলেন?’
এই পোস্ট দেয়ার পর তার লাইক-কমেন্টস আরো বেড়ে গেল। সবাই তাকে খুব দ্রুত বই বের করার জন্য বলে। কয়েকজন ছিল অগ্রিম অর্ডারও দিয়ে দিয়েছে। বদরুলের বই যে সাড়াজাগানো বই হবে তাও অনেকেই বলতে লাগল। বদরুল তার ভক্তদের উৎসাহে সাহস পেল। বই তাকে করতেই হবে।
বাড়ির নারকেল-সুপারি বিক্রি করে কিছু টাকা জোগাড় করে বদরুল। বাকি টাকা ধান, চাল বিক্রি করে জোগাড় করে। টাকা-পয়সা নিয়ে এক প্রকাশকে কাছে ধরা দিলো বদরুল। সে অনেক বড় ফেসবুক সেলেব্রিটি এটা কিছুতেই বোঝাতে পারছে না প্রকাশককে। প্রকাশক বদরুলের বই কোনোক্রমেই করবে না। বদরুল নাছোড়বান্দা। সে বই বের করবেই।
নিজের টাকা দিয়েই বই প্রিন্ট দিলো বদরুল। রাত জেগে বইয়ে পিন মারা ও গাম লাগাতে থাকল। কয়েক রাত কষ্ট করার পর বদরুলের বই তৈরি হয়ে গেল। বেশ সুন্দর একটা নাম দিয়েছে বইয়েরÑ বদরুল রচনাবলি। বইয়ের প্রচ্ছদে বদরুলের বড় করে একটা ছবি আর পাশে একটা কলম আর একটা খাতা। বদরুল রচনাবলি বইটিতে ফেসবুকে দেয়া তার স্ট্যাটাসগুলো খুব সুন্দর করে সাজানো আছে।
বইমেলায় বই কিভাবে বিক্রি করবে তা নিয়ে মহা টেনশনে বদরুল। কোনো প্রকাশনী তার বই রাখতে রাজি হলো না। বদরুল হেরে যাওয়ার মানুষ না। সে নিজেই বই বিক্রি করতে লাগল। বইমেলার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ঘুরে বেড়াচ্ছে বদরুল। কিন্তু একটা বইও বিক্রি হচ্ছে না। ফেসবুকে নিয়মিত পোস্ট দিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন গ্রুপেও পোস্ট দিচ্ছে কিন্তু কোনোভাবেই বই বিক্রি হচ্ছে না। না, এভাবে হয় না। সবার ইনবক্সে বইকেনার আহ্বান জানাল বদরুল। কিছু মানুষ কোনো জবাব দিলো না। কিছু মানুষ বই কিনবে বলে আশ্বস্ত করল। দিনের পর দিন যেতে থাকল। বদরুলের বই বিক্রি হয় না। যারা বই বের করার আগে অগ্রিম অর্ডার দিয়েছে তারা বদরুলকে ব্লক করে দিয়েছে। বদরুল হতাশায় ভেঙে পড়ে। এত মানুষ তাকে উৎসাহ দিলো তারা আজ কই? কেন তারা তার সাথে এই প্রতারণা করল?
গতকাল বইমেলা শেষ হয়েছে। বদরুল প্রতিদিনের মতো আজো বইমেলায় বই নিয়ে এসেছে। আজ মেলায় মানুষ নেই। সবাই স্টলগুলো থেকে বই সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বদরুল ঊর্ধ্বাকাশে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে দাঁড়িয়ে আছে। আর ভাবছে ফেসবুকে সেলেব্রিটি হলেই লেখক হওয়া যায় না। বিভিন্ন জনের লেখা কেটেকুটে নিজের নামে চালিয়ে দিলেই লেখক হওয়া যায় না। টাকা থাকলেই বই বের করা যায়। কিন্তু লেখক হওয়া যায় না। লেখক হতে হলে সাধনা লাগে। অনেক বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে লেখক হতে হয়। বদরুল প্রতিজ্ঞা করল ফেসবুকে সময় নষ্ট না করে নিজেই মৌলিক কিছু লেখার চেষ্টা করবে।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.