হারিয়ে যাচ্ছে লোকসংস্কৃতি

আসাদুজ্জামান আসাদ

আমাদের দেশ ষড় ঋতুর দেশ। দুই মাস পরপর ঋতুর বদল হয়। ঋতু বদলের পালাক্রমে প্রকৃতির মাঝে অপরূপ পরিবর্তন আসে। প্রকৃতির পরিবর্তনে, পরিবেশের পরিবর্তন ঘটে। প্রকৃতির সাথে সাথে পরিবর্তন আসে সংস্কৃতি ও সভ্যতায়। সেই পরিবর্তনের ধারাবাহিক স্রোতে পরিবর্তন এসেছে সমাজ জীবনে। সমাজ জীবনের ঐতিহ্য ও ইতিহাস বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয় যে, পঞ্চগড় একটি প্রাচীন জনপদ। এখানে আদিকাল থেকে লোকবসতি ছিল। ছিল কৃষ্টি, কালচার, সংস্কৃতি ও সভ্যতা। প্রাচীনকাল থেকে এখানের সংরক্ষণ, সনাতন সংস্কৃতি, লোকসংস্কৃতি বা গ্রাম্য সংস্কৃতি মানুষের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে সম্পৃক্ত।

পঞ্চগড়ে স্বাধীনতার আগে ও পরে লোকসংস্কৃতি ব্যাপকভাবে পরিচর্চা করা হতো। শহর, নগর, গ্রামে, পাড়া, মহল্লায়, বাসাবাড়িতে লোকসংস্কৃতি, বাউল গীতি, আঞ্চলিক গান, মানিক পীরের গান, বাসান গান, নাট্যচর্চা ইত্যাদির আসর বসত। সামাজিক জীবনে, নানা উৎসব ও আয়োজনে জারিসারি, ভাটিয়ালি, ভাব গান, পুঁথিপাঠ, গাজী গীত যথাযথভাবে পালিত হতো। সমাজে এসব সংস্কৃতি ইতিবাচক প্রভাব পড়ত। লোকসংস্কৃতির ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুভূতিসহ এক শ্রেণীর সমাজপতির বিদ্রুপাক্ত দৃষ্টিভঙ্গি নানারূপ বাধা সৃষ্টি করত। সব বাধা মোকাবেলা করে লোক বা গ্রাম্য সংস্কৃতি যথাযথভাবে পালন করা হতো। তবে কালের আবর্তন বিবর্তনে, সময়ের পরিবর্তনে সমাজের সাংস্কৃতিক দৃষ্টি ভঙ্গির পরিবর্তন ঘটেছে। পরিবর্র্তন ঘটেছে সমাজের বর্তমান প্রেক্ষাপট। বর্তমান আধুনিকতার পালা বদলে হারাতে বসেছে লোকসংস্কৃতি।
এখানে লোকসংস্কৃতির অফুরন্ত ভাণ্ডার রয়েছে। পরিচর্চার অভাবে, বিজ্ঞানের জয়যাত্রা, উন্নয়ন ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় এ সংস্কৃতি দৃষ্টির আড়ালে চলে যাচ্ছে। হারানোর বেদনা শুধু শহর ও গ্রামে নয়। যা প্রতিটি গ্রামের ঘরে ঘরে বিদ্যমান। লোকসংস্কৃতি আজ কোনো অনুষ্ঠানে চর্চা না হলেও অজপাড়া গাঁয়ে অশিক্ষিত, অল্প শিক্ষিত কিশোরী মেয়েরা তাদের নিজস্ব প্রচেষ্টায় বিয়েশাদির অনুষ্ঠানে শত শত শ্লোক রচনা করে যাচ্ছে।
পঞ্চগড়ের মাটি সমতল। সমতল ভূমিতে যেমন সব ধরনের ফসল আবাদ যোগ্য, তেমনি এখানকার মানুষ সব ধরনের সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত। এ সমাজের প্রেক্ষাপটে মানব জীবনে জারি গানের ইতিবাচক প্রভাব ছিল। জারি গান মুলত ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই সৃষ্টি করা হতো। শরিয়ত মারফত, কারবালা ইত্যাদি বিষয়ের ওপর চালু ছিল। এমনিভাবে গাঁও- গ্রামে শাস্ত্র গান চালু ছিল। ক্ষেতের জমিতে ফসল লাগানের সময় শাস্ত্র গান ব্যবহার করা হতো। অনেক সময় বর্ষা কালে বড় বাড়ির বাইরের ঘরে বসে শাস্ত্র গানের আসর বসত। শাস্ত্র গান আসলে বর্ণনামূলক গান।
এখানে লোকবসতি ছিল খুবই কম। গ্রামের বাইরে খেতের পর খেতের, মাঠের পর মাঠসহ বিরাট চারণভূমি পড়ে ছিল। মাঠে-ময়দানে, চাষি, মজুর, রাখাল ছেলেরা গলা খুলে প্রাণ ভরে ভাটিয়ালি গান মুখে মুখে উচ্চারিত হতো। তাদের মুখে গানের সুর দ্যুতি ছড়িয়ে দিত চার দিকে। গাঁয়ের গাড়িয়াল, নদীতে মাঝি, খোলা মাঠে রাখাল, কৃষক চাষি সবাই ভাটিয়ালি গানের গায়ক ছিল। ভাটিয়ালি গান সবাই মন প্রাণ ভরে শুনত। ভরে উঠত সবার হৃদয় প্রাণ। সময়ের ব্যবধানে, কালের প্রেক্ষাপটে বর্তমান তা হারিয়ে গেছে। ভাটিয়ালির পাশাপাশি, লোকসংস্কৃতিতে পালা বা যাত্রা গান ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। পালা বা যাত্রা গান শীত মওসুমে গ্রাম্য অঞ্চলে বিরাট বিরাট আসর বসত। শুধু গ্রামে নয়, অনেক সময় শহরের কেন্দ্রস্থলে পালা বা যাত্রা গানের আসর হতো। পালা বা যাত্রা গান শুনতে নারী-পুরুষ, ছেলেমেয়ে সবাই আসত। পালা বা যাত্রা গানে দলের জন্য সরকারিভাবে কোনো নিবন্ধনের প্রয়োজন হতো না। আমাদের সমাজে কিছু কিছু ক্লাব প্রতি বছরই নিয়মিতভাবে পালা বা যাত্রা গানের আয়োজন করত। কিন্তু বর্তমান আধুনিক যুগে বেশির ভাগ মানুষের ঘরে বিনোদনের বস্তু হিসেবে টেলিভিশনের সুব্যবস্থা রয়েছে। টেলিভিশনের মাধ্যমে সবাই বিনোদন করে থাকে। তাই তো সেই প্রেক্ষাপটের আলো সমাজ থেকে পালা বা যাত্রা গান ক্রমান্বয়ে হারাতে বসেছে। লোক সংস্কৃতির অংশ হিসাবে পুতুল নাচ একটি আনন্দ দায়ক খেলা। এটি শিশুদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। গ্রামে যখন সার্কাস আসত, তখন পুতুল নাচ খেলার আয়োজন করা হতো। শুধু যে শিশুরাই পুতুল নাচ খেলা দেখত তা কিন্তু নয়। এই মজার খেলাটি উপভোগ করার জন্য শিশুদের পাশাপাশি নারী-পুরুষ উভয় দলেই মজা করে খেলা দেখত। তবে এখন আর পুতুল খেলা নেই। এখন জ্যান্ত পুতুলেরা নেচে মানুষকে বিপুল খোরাক জোগাচ্ছে।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় লোকসংস্কৃতি হারাতে বসেছে। আধুনিকতার যুগে একটু সচেতন হলেই আমরা লোকসংস্কৃতিকে যথাযথভাবে রক্ষা করতে পারি। গ্রাম বাংলার হাজারো মানুষের প্রাণ প্রিয় লোক সংস্কৃতিকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.