ছবি তোলার দিন জীবনের বাঁকে বাঁকে

জোবায়ের রাজু

শৈশবে ছবি তোলার একটি ব্যাপার ছিল আমাদের ছোট্ট পরিবারে। প্রবাস থেকে কয়েক মাস পরপর আব্বার যেসব চিঠি আসত, তাতে লেখা থাকতÑ‘আমার ছেলেদের ছবি চাই।’ আব্বার এই চিঠিময় আহ্বান দারুণ আমলে নিতেন আম্মা। যখন কোন শুক্রবার আসতো, স্কুল থাকত বন্ধ, আম্মা সেই সুযোগে নানাজানকে নিয়ে আমাকে আর রাহিকে সাথে করে চলে যেতেন আমিশাপাড়া বাজারের সুপরিচিত ঝুমকা স্টুডিওতে। ক্যামেরা জিনিসটায় তখন ছিল আমার রাজ্যের ভীতি। আর স্টুডিওকে মনে হতো ভূতের আস্তানা, যেখানে কেবল ভয় আর ভয়। ঝুমকা স্টুডিওকে এখনকার মতো তখনো বেশ পরিপাটি দেখাত। দেয়ালজুড়ে নিদারুণ প্রকৃতির বিশাল ছবি, মেঝেতে কারপেট, কৃত্রিম ফুলের সমারোহ, টেলিফোন সেট আর বড় বড় আয়না। ঝুমকা স্টুডিওর কর্ণধার রতন নাথ আমাদের দুই ভাইকে ছবি তোলার জন্য পাশাপাশি দাঁড় করালে আমি ভয়ে ঠকঠক কাঁপতাম আর গুমরে আসা কান্না বড় কষ্ট করে চেপে রাখতাম। রতন নাথ আমাদেরকে ছবি তুলবার প্রস্তুতিতে দাঁড় করিয়ে হাতে বিশাল ক্যামেরা নিয়ে দাঁড়াতেন আর দু’পাশ থেকে লাইট জ্বালিয়ে দিতেন। ওমা, এতেও আমার ভয়। আমরা দু’ভাই পাশাপাশি মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতাম। রাহী অকুতোভয় বীরের মতো দাঁড়িয়ে থাকলেও আমি নড়াচড়া করতাম। এতে রতন নাথ ঘোর আপত্তি তুলে বলতেনÑনো নো। নড়ছো কেন? একদম নড়া যাবে না। সোজা হয়ে দাঁড়াও। মুখে হাসি আনো।’ ভয়ে এমনিতেই আমার জানে পানি নেই, সেই কঠিন মুহূর্তে হাসবো কিভাবে, এটা ভেবে আমি কূল পাই না। আড় চোখে তাকিয়ে দেখতাম রাহী মায়া ঝরা হাসি ছড়িয়ে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ লাইটের অপেক্ষায় প্রস্তুত। অথচ আমি তার বিপরীত। চেষ্টা করেও হাসতে তো পারি না, বরং আমার কাঁপাকাঁপি দ্বিগুণ বাড়ে। আমি ভয়ে ক্যামেরার দিকে তাকাতে না পেরে কেঁদে দিতাম। সে মুহূর্তে আমার ছবিটা তোলা যে রতন নাথের কাছে কতখানি কষ্টসাধ্য ছিল, তা কেবল তিনিই জানতেন।
কয়েক দিনের মধ্যে সে ছবি খামে করে চলে যেত প্রবাসী আব্বার হাতে। ছবিতে তার ছেলের কী কী সমস্যা আছে, তা তুলে ধরতেন পরের চিঠিতে। ছোট ছেলেটার ছবি তোলার ভঙ্গিমা ঠিক থাকলেও বড় ছেলেটা বিপরীত। তার মুখে মলিন হাসি কেন? হাসির ফাঁকে দাঁত দেখা যায় কেন? শরীর এত পুষ্টিহীন লিকলিকে যে শার্ট খুললে মনে হয় বুকের হাঁড়গুলি গোনা যাবেÑআব্বার এসব অভিযোগ ভরে থাকত চিঠির ভাষায়, যা পড়ে আম্মার মুখের হাসি উধাও হয়ে যেত।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে টের পেলাম আমি দিন দিন ছবি আসক্ত হয়ে পড়ছি। যে ক্যামেরাকে চিরকাল ভয় করেছি, সে ক্যামেরার লোভ দিন দিন আমাকে পেয়ে বসেছে। দূরের কোনো দর্শনীয় জায়গায় গেলে সেখানে ছবি তোলার জন্য একটি ক্যামেরার অভাব বোধ করি আমি। এরই মধ্যে বড় খালু আমেরিকা থেকে আমার জন্য আস্ত একখানা ক্যামেরা এনেছেন দেখে আমার তো আনন্দ সাত আসমানে উঠে গেল। কারণে অকারণে সে ক্যামেরার সামনে পোজ দিতে আমার বিলম্ব নেই। ছবিতে নিজের রূপ দেখে নিজেই মুগ্ধ হতাম। মনে হতো আমার এ ছবি নয়, পুরনো দিনের ছায়াছবির কোনো হিরো। এটা ভাবতে গিয়ে বারবার লজ্জা পেতাম। একা একা।
সময়ের আবর্তে এখনো আমি ছবি তোলার বিলাসিতা থেকে রেহাই পাইনি। এখন আর ডিজিটাল ক্যামেরা নয়, মোবাইল ক্যামেরা হয়েছে আমার রোজদিনের সাথী। যুগের চাহিদা সেলফিতেও আমি জর্জরিত। আমার মোবাইল ফোল্ডারে দিন দিন ভারী হয় সেলফির সংখ্যা। সেগুলো জমা হয়ে যায় ফেসবুক নামে আরেক বিনোদনের কাছে। ফেসবুকটা আমার কাছে বিনোদনই। এখানে আমি রোজ আপলোড করি আমার বিভিন্ন পোজের ছবি। ঘনঘন প্রোফাইল পিকচার বদলাতেও আমার একটু বাতিক আছে। এ যে আমার আত্মতৃপ্তি।
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.