ফাগুনের ঐ মোহনায়

এস আর শানু খান

ইতিকে আমি ছোট থেকে চিনি। একই পাড়ায় বাড়ি ছিল আমাদের। ছোটবেলায় বসন্তকাল এলেই রোজ সকালে প্রতিযোগিতা হতো কে আগে যেতে পারে শিমুল ফুল কুড়াতে। শিমুল ফুলের বোটা দিয়ে আমরা তখন ফটকল ফোটাতাম। ওটাকে তখন আমরা ফটকলের গুলি বলতাম। গ্রামের কোথায় কয়টা শিমুল গাছ সবই আমাদের মুখস্থ থাকতো। সকালে শিমুল ফুলের বোটা কুড়িয়ে সারা দিন সেগুলো দিয়ে আমরা ফটকল ফোটাতাম। ফটকল হলো বাঁশের আগার থেকে নলের মতো আধা হাত খানেক কেটে তার মোটা মুখে শিমুল ফুলের বোটা দিয়ে চিকন কাঠি দিয়ে জোরে চাপ দিতেই অগ্রভাগ দিয়ে শব্দ করে দূরে গিয়ে পড়ার একটি কল। আমরা নিজেদের মধ্যে পাল্লা দিতাম কারটা কত দূর যায়। দলে তা প্রায় সাত-আটজনের মতো ছিলাম। ইতির দাদা ছিল বড়লোক। গ্রামের বেশির ভাগ বাগানই ছিল ইতির দাদার। তাই তো বেশির ভাগ শিমুল গাছও ছিল ইতিদেরই বাগানে। ইতিও রোজ সকালে ফটকলের গুলি কুড়াতে আসতো। ইতিদের বাড়ির কাছে হওয়ায় বেশির ভাগ দিনই ইতিই আগে আসত শিমুল তলায়। কিন্তু ইতি এসে স্বার্থপরের মতো আগে আগে কোনো দিনই কুড়াত না। অপেক্ষা করত আমরা কখন যাবো। কেননা ইতি চাইলেই সব গাছের সব ফুলই একা কুড়িয়ে নিতে পারত। আমরা সবাই যখন পৌঁছতাম তখন ইতিও পাল্লা দিয়ে আমাদের সাথে কুড়াত। একদিন সকালে আমি ঘুম থেকে উঠতে দেরি করার জন্য একটু পেছনে পড়ে গেলাম। চোখ মুছতে মুছতে দৌড়ালাম শিমুল তলায় গিয়ে দেখি তলা একদম ফাঁকা, একটি ফুলের চিহ্ন পর্যন্ত নেই। আমি অনেকটা বোকা সেজে গেলাম। কাজুবাজু হয়ে ভাবতে লাগলাম আজ আর বুঝি ফটকল ফোটানো হবে না। সবাই ফোটাবে আর আমার হা করে দেখতে হবে। খানিকটা দাঁড়িয়ে থেকে ঘাসের ওপর পড়া শিশির পা দিয়ে ভাঙতে ভাঙতে বাড়ির দিকে এগোচ্ছিলাম। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ একজন ডাক দিলো অভি। অভি পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখে ইতি ডাকছে। হাতে তার একটা পলিথিনের ব্যাগ। অভি ডান হাতের আঙুলের নক দাঁত দিয়ে কাটতে কাটতে বলল কী হয়েছে? ডাক দিলি কেন?
ইতির দুই হাত পেছনের দিকে বাঁধা। কিরে আজ ফটকল ফুটাবি না। চল ফুটাই। সীমাকে ডাক দিবো। চল আজ বিরাট পাল্লা দিতে হবে। আজ সারা দিন ফটকল ফুটাব।
তাহলে চল সারা দিন ফটকল ফোটাবো আজ। দাঁড়া বাড়ি গিয়ে ফটকল নিয়ে আসি। আজ দারুণ মজা হবে। এ বলেই অভি বাড়ির দিকে দৌড় মারে। খানেকটা গিয়েই আচমকা থেকে পেছনে ফিরে বলে নারে আমার আজ ফটকল ফোটানো হবে না। ইতিÑ কেন হবে না। আজ একটা ফুলও ভাগে পাইনি। এসে দেখি তলা ফাঁকা।
ইতি বলে আরে যা ফটকল নিয়ে আয় আগে। একটা গাছে ফুল আছে। সেই গাছের কথা কেউ জানে না। তাড়াতাড়ি গিয়ে ফটকল নিয়ে আয়। তোকে সেখানে নিয়ে যাব। অভি বাড়ি গিয়ে ফটকল নিয়ে আসে। ততক্ষণে আর অনেকেই এসে হাজির হয়েছে। কেউ কেউ ফটকল ফোটাচ্ছে। অভির মুখটা আরো ভার হয়ে গেল। রিফাদ, অমিত এবং অপূর্বসহ সবাই বলল এটার পাল্লা হবে। অভি পকেট থেকে হাত বের করে আর পকেটে ঢোকাই। এ দেখে অমিত তো বলেই ফেলল ভাই আমার কিন্তু আজ গুলি অনেক কম। আমি কিন্তু কাউকে দিতে পারব না। ওর সাথে তাল মিলিয়ে অপূর্বও একই কথা বলল। আর অভি ইতির দিকে তাকায়। অভি ইতির দিকে তাকিয়ে দেখে ইতির মাঝে তেমন কোনো আগ্রহ নেই। সে যে বলল কোন গাছ তলায় নিয়ে যাবে। অবশেষে ইতি অভির দিকে তাকিয়ে একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে চোখের ইশারায় ডাক দেয়। অভির রাগও আরো বেড়ে যায়। অভি বড্ড জেদি। অভি ইতির ডাকে সাড়া দেয় না। এবার ইতি পেছন থেকে সেই পলিথিনের ব্যাগটা সামনে এনে উঁচু করে অভিকে দেখিয়ে ইশারায় ডাক দেয়। অভি এগিয়ে যায়। ইতি অভির সাথে পলিথিনটা ধরিয়ে দিয়ে হাতে একটা চিমটি কাটে। আর একটা চোখের পলক ফেলে। সে দিনের পর থেকে অভিও বুঝতে পেরেছিল কিছু একটা। সে দিন সারা দিন চলল ফটকল ফোটানোর প্রতিযোগিতা। এর দুই দিন পরে স্কুলে টিফিনে ইতি অভিকে ডেকে কিছু কৃষ্ণচূড়া ফুল দিয়ে বলে ‘চল না হারিয়ে যায় ফাগুনের ঐ মোহনায়’। অভি ও ইতি এখন অনেক বড় হয়েছে। দু’জনেই ভিন্ন ভিন্ন সংসারের সাথে মজেছে। দুনিয়ার বেড়াজালে নিজেদের অজান্তেই কখন যেন ভুলে গেছে সব। কিন্তু এ ফাগুন এলে শিমুল ফুল দেখলে আজো অভি ও ইতির মনে জেগে উঠে সেই আবেগী স্মৃতিগুলো। বারবার বেজে উঠে সেই একটি কথা ‘চল না হারিয়ে যায় ফাগুনের ঐ মোহনায়।
মনোখালী, শালিখা, মাগুরা।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.