সড়ক ও জনপথের দুর্নীতি দমনে দুদকের ২১ সুপারিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধে ২১ দফা সুপারিশ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এ সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক টিম।

দুদক সচিব ড. মো. শামসুল আরেফিন সই করা চিঠি মন্ত্রিপরিষদ সচিব বরাবর রোববার পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে সুপারিশের আলোকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক টিমের সদস্যরা দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে দুর্নীতি প্রতিরোধে করা সুপারিশগুলো হলো, সড়ক নির্মাণে অধিদপ্তরের অধিকাংশ টেন্ডারে স্পেসিফিকেশনে বর্ণিত যথাযথভাবে পেতে গেলে পাথর বা ঝামা ইট অথবা গ্রেড-১ এর ইট ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ঠিকাদারদের চাপে অথবা প্রকৌশলীদের দায়িত্ব অবহেলা কিংবা পরস্পর যোগসাজশে অর্থ আত্মসাতের লক্ষ্যে সড়ক নির্মাণে পাথর, ঝামা অথবা গ্রেড-১ ইটের খোয়ার পরিবর্তে নিম্নমানের ইট দিয়ে নিম্নমানের খোয়া তৈরি করে সড়ক নির্মাণে ব্যবহার করা হচ্ছে যা বন্ধ করতে হবে। ব্যবহৃত ইট বা খোয়ার মান সঠিকভাবে নির্ণয় করতে হবে এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীকে তা প্রত্যয়ন করতে হবে।

এসব কাজ মনিটরিংয়ের জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল বিভাগের অধ্যাপক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, নির্মাণকাজে বিশেষজ্ঞ, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে সততার সুখ্যাতি রয়েছে এমন প্রকৌশলীদের নিয়ে একাধিক মনিটরিং কমিটি গঠন করা যেতে পারে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করে সড়ক নির্মাণের ফলে দ্রুত তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, এ থেকে উত্তরণের জন্য কংক্রিটের সড়ক নির্মাণের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন।

সড়ক নির্মাণে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে বিটুমিন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গুণগত মান ঠিক থাকলেও স্পেসিফিকেশন অনুসারে যে পরিমাণ বিটুমিন ব্যবহার করার কথা তার চেয়ে কম বিটুমিন ব্যবহার করে সড়ক নির্মাণ বা মেরামতে ক্রমাগতভাবে দুর্নীতির আশ্রয় নেয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মাঠ প্রকৌশলীগণ ঠিকাদার কর্তৃক ব্যবহারের জন্য নির্মাণ সাইটে মজুদকৃত বিটুমিন পরীক্ষা করে এ মান নিশ্চিত করবেন। এক্ষেত্রে গ্রেড মানের তারতম্য হলে ঠিকাদার, প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুদক আইনে মামলা দায়ের করা যেতে পারে।

সড়ক নির্মাণ কাজ শুরুর পূর্বেই রাস্তায় কিছু মাটির কাজ করতে হয় এবং কাজ চলাকালীন সড়কের পাশে মাটি ফেলতে হয়। এই মাটির কাজে অনিয়ম দুর্নীতির আরেকটি উৎস। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মাটির কাজের প্রাক্কলন করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান মাটিকে কম দেখিয়ে পরবর্তীকালে মাটি ভর্তি দেখিয়ে ভুয়া বিল করা হয়। এক্ষেত্রে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে সোশ্যাল ওভারসাইট কমিটি গঠন করে মাটির কাজ তদারক করা যেতে পারে।

সরকারের বিশেষ নির্দেশ ছাড়া সব ক্ষেত্রেই ইজিপির মাধ্যমে সরকারি ক্রয় কার্য সমাধা করতে হবে। ইজিপি প্রক্রিয়ার কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি সিপিটিইউকে যথাযথভাবে মনিটরিং করতে হবে ও প্রতিনিয়ত সময়োপযোগী করতে হবে।

প্রকল্প গ্রহণকালীন গৃহীত প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে অধিক ব্যয়ে প্রকল্প শেষ করা হয় যা বন্ধ করা প্রয়োজন। প্রকল্পের প্রাক্কলন প্রণয়ন এবং দরপত্রের মূল্যায়নে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন নির্ভরযোগ্য বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। প্রকল্পের প্রাক্কলন প্রণয়ন ও প্রাক্কলিত কাজের বাস্তবায়ন পৃথক দুটি ইউনিটের ওপর ন্যস্ত করা যেতে পারে। যিনি বা যে টিম প্রাক্কলন তৈরি করবেন তিনি বা সে টিম বাস্তবায়নের কাজে কোনোভাবেই সংশ্লিষ্ট হতে পারবেন না।

প্রকল্প বাস্তবায়ন/নির্মাণ/সংস্কার/মেরামত কার্যাদি সম্পন্নের পরবর্তী একটি যৌক্তিক সময় পর্যন্ত ওই কাজের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিজ খরচে বাস্তবায়নকারী/ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ওপর আইনানুগভাবে অর্পণ করা যেতে পারে। নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর সব ধরনের মেরামত কাজ ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে।

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে ই-জিপি টেন্ডার প্রক্রিয়ার সার্বিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পরামর্শক সংস্থার প্রাকযোগ্যতা নির্ধারণ ও পূর্বযোগ্যতা মূল্যায়ন করে ঠিকাদারদের নিবন্ধন ও সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রণয়ন এবং তা ওয়েবসাইটসহ সর্বমহলে প্রচারের ব্যবস্থা করা বাঞ্ছনীয়।

প্রকল্পের ক্রয়, নির্মাণ, মেরামত ও সংস্কার কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের নিমিত্তে স্টেক হোল্ডারদের সমন্বয়ে গণশুনানি ও ‘সামাজিক নিরীক্ষার’ আয়োজন করা যেতে পারে।

ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত বিল প্রদানের পূর্বে কাজের পরিমাণগত ও গুণগতমান সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট এলাকার নাগরিকদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মতামত (সামজিক নিরীক্ষা) গ্রহণ করা যেতে পারে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.