হঠাৎ ঋণের সুদহার বৃদ্ধি সাধারণ গ্রাহকের নাভিশ্বাস
হঠাৎ ঋণের সুদহার বৃদ্ধি সাধারণ গ্রাহকের নাভিশ্বাস

হঠাৎ ঋণের সুদহার বৃদ্ধি সাধারণ গ্রাহকের নাভিশ্বাস

আশরাফুল ইসলাম

বছর খানেক আগে সালাম আজাদ একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ২০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন ফাট কেনার জন্য। ১৫ বছর মেয়াদি এ ঋণের মাসিক কিস্তি নির্ধারণ করা হয়েছিল সাড়ে ২৩ হাজার টাকা। তিনি নির্ধারিত অর্থ এতদিন পরিশোধ করে আসছিলেন। কিন্তু বছর না ঘুরতেই কিস্তি বেড়ে হয়েছে ২৬ হাজার টাকা। হিসভব কষে দেখেন ১৫ বছরে তাকে আড়াই লাখ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করতে হবে (যদি ঋণের সুদহার আর না বাড়ে)। শাখা ব্যবস্থাপককে কিস্তি বেড়ে যাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলে, তিনি জানান সুদ হার বেড়ে গেছে। এ কারণে কিস্তির হারও বেড়ে গেছে। তিনি জানান, এ বিষয়ে শিগগিরই চিঠি পেয়ে যাবেন।

সালাম আজাদের মতো অনেক গ্রাহকই তাদের এ দুর্দশার কথা জানিয়েছেন। মাসুম শেখ নামক অন্য এক গ্রাহক জানান, তিনি ২৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন একটি ইসলামী ব্যাংক থেকে। মাসে ২৯ হাজার ৪০০ টাকা কিস্তি দিতেন। হঠাৎ করে কিস্তি বেড়ে ৩১ হাজার টাকা হয়েছে। তিনিও শাখা ব্যবস্থাপকের কাছে কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, দেড় শতাংশ হারে মুনাফা (ইসলামী ব্যাংকিং ভাষায় রেন্ট) বেড়ে হয়েছে ১৩ শতাংশ, যা ঋণ মঞ্জুরের সময় ছিল সাড়ে ১১ শতাংশ। এ কারণে কিস্তির পরিমাণও বেড়ে গেছে।

ওই গ্রাহক ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ছোট ছোট গ্রাহকেরা ব্যাংক থেকে অল্প টাকা ঋণ নিয়ে তা যথাযথভাবে পরিশোধ করেন। অথচ তাদের ঘাড়েই অতিরিক্ত বোঝা চাপানো হয়। কিন্তু যারা শত শত কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত দেন না তাদের হয় সুদ মওকুফ করে দেয়া হয়, না হয় ঋণ পুনর্গঠনের নামে বিশেষ ছাড় দেয়া হয়। খেলাপি ঋণ আদায় করা হলে ব্যাংকের ঋণের সুদ অনেক কম হতো।

হঠাৎ করে ঋণের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ফয়সাল আহমেদ নামক এমনি অন্য এক গ্রাহক জানিয়েছেন, বাজারে সব ধরনের জিনিষের দাম বেড়ে গেছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী তাদের বেতন ভাতা বাড়েনি। মূল্যস্ফীতি হিসেবে আনলে তাদের প্রকৃত আয় নেগেটিভ হয়ে গেছে। অর্থাৎ তারা এখন ঋণে আছেন। ফলে তাদের ব্যয় কমিয়ে নির্ধারিত আয় দিয়ে সমন্বয়ের চেষ্টা করছেন। এ পরিস্থিতি ঋণের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় সব ধরনের পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। এতে আবার বাড়বে পণ্যের দাম। এতে তাদের ভোগান্তি আরো বেড়ে যাবে।

দেশের প্রথম প্রজম্মের একটি ব্যাংকের এমডি জানিয়েছেন, আগে ঋণের সুদ হার কম থাকার অন্যতম কারণ ছিল আমানতের সুদহার কম ছিল। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরে ব্যাংকিং খাতে তীব্র তারল্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এক দিকে নগদ টাকার সঙ্কট, অন্য দিকে আমানত কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি যেসব ঋণ বিতরণ করা হয়েছে বিশেষ করে বড় ঋণগ্রহীতারা টাকা ফেরত দিচ্ছেন না।

ফলে ব্যাংকের এক দিকে তহবিল ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, পাশাপাশি বেড়ে যাচ্ছে পরিচালন ব্যয়; কিন্তু ঋণের কিস্তি আদায় না হওয়ায় ব্যাংকের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। এ দিকে নগদ টাকার প্রবাহ কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো তীব্র তারল্য সঙ্কটে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে বেশির ভাগ ব্যাংক আমানত প্রবাহ বাড়াতে মনোযোগ দিয়েছে। আমানত বাড়াতে সুদের হার বাড়ানো হচ্ছে। সেই সাথে ঋণের সুদহারও বাড়ানো হচ্ছে। এ ছাড়া ব্যাংকের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই বলে ওই এমডি জানিয়েছেন।

তবে অন্য একটি ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতকে তলানিতে নামিয়ে দিচ্ছে। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে অবনোপনসহ খেলাপি ঋণ রয়েছে সোয়া লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেশির ভাগ ঋণই কুঋণ বা আদায় অযোগ্য ঋণ। এসব ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলো সুদ আয় স্থগিত রাখছে। ফলে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। বলা চলে ব্যাংকগুলো টিকেই আছে ুদ্র ও মাঝারি গ্রাহকের জন্য। কেবল এ মানের গ্রাহকেরাই ঋণ পরিশোধ করছেন। বড় গ্রাহকেরা রাজনৈতিক আশীর্বাদ নিয়ে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করছেন না বছরের পর বছর। এটিই এখন ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় কাল হয়ে দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বছর খানেক আগেও ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য ছিল প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা। তখন বলা হতো, অতিরিক্ত টাকায় ব্যাংকগুলো সয়লাব হবে। কিন্তু এক বছরের মাথায় ব্যাংকগুলোতে ভিন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। এর কারণ হিসেবে ওই সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘ দিন ধরে সঞ্চয়পত্রের কারণে ব্যাংকের আমানত প্রবাহের প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের নিচে রয়েছে। কিন্তু বিপরীতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশের ওপরে রয়েছে। যেখানে আমানতের চেয়ে ঋণের প্রবৃদ্ধি কম হওয়ার কথা, সেখানে হচ্ছে বিপরীত। এখানেই বিপত্তি ছিল। বিষয়টি আগে থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরে আসা উচিত ছিল। কেননা আমানতের প্রবৃদ্ধির চেয়ে ঋণের প্রবৃদ্ধি বেশি হওয়ার অর্থ হলো, হয় ঋণের টাকা পাচার হচ্ছে, না হয় ব্যাংকিং খাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। আগে থেকেই ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা যে পণ্য আমদানির জন্য এলসি খুলছে ওই পণ্য আদেশ আসছে কি না, বা যে কারণে ঋণ নেয়া হচ্ছে ঠিক ওই খাতে ব্যয় হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখা উচিত ছিল। তাহলে হয়তো ব্যাংকিং খাতকে আজকের পরিণতি ভোগ করতে হতো না।

সামনে এ সঙ্কট যাতে না বাড়ে সেজন্য ব্যাংকগুলোর ঋণের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য তদারকি বাড়াতে হবে। অর্থাৎ উৎপাদনশীল খাতে ঋণ দিতে হবে এবং সেই ঋণ উৎপাদনশীল খাতেই ব্যয় হচ্ছে কি না তা তদারকি করতে হবে। এখাতে বাংলাদেশ ব্যাংকেরও তদারকি বাড়াতে হবে। অন্যথায় সামনে টাকার সঙ্কট আরো বেড়ে যাবে, বেড়ে যাবে ঋণের সুদ হার। এতে বাড়বে সাধারণের দুর্ভোগ।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.