পক্ষাঘাত রোগের চিকিৎসা

ডা. মো: নাজমুল হক শিকদার

পক্ষাঘাত রোগ সম্পর্কে আমাদের সবার কমবেশি জানা আছে। যতটা জানা আছে তা একেবারেই নগণ্য। রোগটি আসলে একটি স্নায়ুরোগ। তার সম্পর্কে কিছু জ্ঞান থাকা আমাদের সবার প্রয়োজন।
লিখেছেন ডা. মো: নাজমুল হক শিকদার

নিঃসন্দেহে রোগটি একটি মারাত্মক রোগ। কেবল স্নায়ুবিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাই এই রোগের ব্যাপারে সঠিক জ্ঞান ও চিকিৎসা রোগীকে দিতে পারে। সব বয়সের মানুষ পক্ষাঘাত রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তবে সময়মতো উপযুক্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে সঠিক চিকিৎসা করালে অনেক ক্ষেত্রেই রোগী আংশিক অথবা পুরোপুরি ভালো হয়ে যেতে পারে। তবে কিছু ক্ষেত্রে পক্ষাঘাত রোগে আক্রান্ত রোগী একেবারেই আরোগ্য লাভ করে না। আমাদের দেশের গ্রাম-বাংলায় ফকির, ওঝা, ঝাড় ফুঁ দিয়ে চিকিৎসা করে, পানি খাইয়ে মন্ত্রটন্ত্র পড়ে যারা চিকিৎসা করে অথবা গ্রাম্য চিকিৎসকেরা এসব রোগীর যথেষ্ট ক্ষতিসাধন করে ভুল চিকিৎসা দিয়ে। এসব লোক থেকে অবশ্যই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। আমরা যেন কোনো অবস্থায় রোগীকে তাদের কাছে না নিয়ে যাই। কিছু পক্ষাঘাত রোগ প্রথম দিকে রোগ নির্ণয় হলে খুব দ্রুত সময়ে রোগী আরোগ্য লাভ করে। যদি সে স্নায়ুবিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে সঠিক সময়ে উপস্থিত হন। তাই কালক্ষেপণ না করে দ্রুত স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে রোগীকে অবশ্যই যেতে হবে। কেননা অনেক রোগী সারা জীবন ভুল চিকিৎসায় পঙ্গু হয়ে থাকতে পারে। শরীরের কোনো অংশ বা অঙ্গের অনুভূতি, গতিশক্তি রহিত হওয়া বা অবশ হওয়াকে পক্ষঘাত বলা হয়।
সর্বাঙ্গীণ পক্ষাঘাত : সারাদেহে পক্ষাঘাত হয়। দেহে সাড় বা চেতনা বা অনুভূতি খুব কম থাকে অতি শীর্ণ বৃদ্ধদের এটি হয়।
অর্ধাঙ্গের পক্ষাঘাত : দেহের নি¤œ অংশে যা অর্ধ অংশে পক্ষাঘাত হয়। কখনো কখনো কোমর থেকে শুরু করে দুই বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়। অর্ধাশ পক্ষাঘাত দেহকে লম্বালম্বি দুই ভাগ করলে তার যেকোনো এক ভাগ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়। এ ক্ষেত্রে এক হাত, এক পা, মুখ, কপাল, নাক, চোখ পক্ষাঘাত হতে পারে।
একটি অঙ্গের পক্ষাঘাত : একটি হাত বা একটি পায়ে পক্ষাঘাত হতে পারে।
মুখমণ্ডলের পক্ষাঘাত : সাধারণত এতে মুখ, কপাল, নাক, চোখ প্রভৃতি অংশে পক্ষাঘাত হয়। চোখ-মুখে অনুভূতি থাকে না।
মেরু মজ্জায় ক্ষয়জনিত পক্ষাঘাত মেরুদণ্ডের ক্ষয়রোগজনিত কারণে।
শিশু পক্ষাঘাত : এটি শিশুদের বেশি হয়। এসব পক্ষাঘাতের সাথে কোষ্ঠকাঠিন্য, খাদ্য গ্রহণে অক্ষমতা, দুর্বলতা, নড়তে-চড়তে কষ্ট, আক্রান্ত স্থান থরথর করে কাঁপা প্রভৃতি আরো নানা লক্ষণ দেখা যায়।
পক্ষাঘাতের বিভিন্ন কারণ : বিভিন্ন কারণে মানবদেহে পক্ষাঘাত হয়ে থাকে, যেমন :
জন্মগত কারণে, মেরুদণ্ড ঘাতা পাওয়া পর, স্পাইনাল কর্ড কম্প্রেশন হয়ে, ডিস্কপ্রল্যাপ্স হয়ে, অনেক সময় বহুমূত্র রোগে বেশি দিন ভোগার পর, মাল্টিপল স্কোলোরেসিস রোগে আক্রান্ত হয়, ভিটামিন-১২-এর অভাবে, মানবদেহের কোনো অঙ্গের হাড় ভাঙলে এবং সেই সাথে নার্ভ-এর ইনজুরি হলে, লিড ডিজিজে, গুলিয়াম বারি সিনড্রম রোগে, মেরুদণ্ডের হাড়ের ক্যান্সার ও হাড়ের যক্ষ্মা রোগ হয়ে, ফ্যামিলিয়েল পেরিয়ডিক প্যালাইসিসে ডিজিজি অব মাসল-এর বিভিন্ন রোগে, মটর নিউরোন রোগে, স্নায়ুবিক রোগজনিত কারণে, শরীরের কোনো স্থানে নার্ভ পুড়ে যাওয়ার জন্য বা ছিঁড়ে যাওয়ার জন্য, ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সিফিলিসে আক্রান্ত হয়ে, অনেক সময় উচ্চ রক্তচাপ থেকে মস্তিষ্কে ক্ষরণ হয়ে, হৃৎপিণ্ডের বিভিন্ন অসুখের জটিলতা থেকে বৃদ্ধ বয়সে যখন শরীরের শিরা-উপশিরা ধমনীগুলো শক্ত হয় তখন উচ্চ রক্তচাপ থাকলে, মস্তিষ্কের মটর এলাকায় টিউমার হয়ে, অনেক সময় পোলিও রোগে এবং কোনো কোনো ওষুধ বেশি দিন ব্যবহার করলে তার বিষক্রিয়ায় পক্ষাঘাত হতে পারে। যেমনÑ কার্বিনোওক্সিলন, থায়াজাইড ডাইরোটিকস, জিডোবিউডিন, স্টাটিন, স্টেরয়েড, অ্যালকোহল (মেদ)।
অনেক সময়েই পক্ষাঘাত রোগ প্রথম থেকে ভালোভাবে চিকিৎসা না করলেও যথেষ্ট সাবধানতা না নিলে তা কঠিন অবস্থায় পৌঁছতে পারে। অনেক সময় তা দুরারোগ্য হয়। তাই সবসময় প্রাথমিক অবস্থা থেকেই উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা কর্তব্য।
চিকিৎসা : ০১. রোগ নির্ণয় করার পর রোগীকে চিকিৎসা করানো হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই রোগী কথা বলতে পারে, আবার অনেক ক্ষেত্রে রোগী অজ্ঞান থাকে। রোগী বেশিক্ষণ অজ্ঞান থাকলে অজ্ঞান রোগীকে নাক দিয়ে পাইপ ঢুকিয়ে নিয়ম অনুযায়ী তরল খাবার পরিবেশন করা হয়। আবার অনেক অজ্ঞান রোগীর ক্ষেত্রে প্রস্রাব ঠিকমতো হলো কি না তা নির্ধারণ করা হয়। প্রস্রাবের রাস্তায় ক্যাথেটার প্রবেশ করিয়ে। অনেক ক্ষেত্রে অচেতন রোগীকে আইভ ফুইড প্রয়োজন অনুযায়ী দেয়া হয়।
০২. অনেক পক্ষাঘাত রোগ ধীরে ধীরে উন্নতি লাভ করে, আবার অনেক পক্ষাঘাত রোগ একেবারেই ঠিক হয় না। অনেক সময় রোগীকে ৪-৫ বছর পর্যন্ত বিছানায় থাকতে হয়। এবং তখন সঠিক চিকিৎসা না করিলে শরীরের বিভিন্ন প্রোসার পয়েন্টে ঘা হয়ে থাকে। এই জন্য রোগীকে ২-৪ ঘণ্টার পরপর এক কাত থেকে অন্য কাতে সরিয়ে দিতে হয়। অনেক সময় রোগীকে ভিটামিন বি-১২ ইনজেকশন খুব উপকারে আসে। উচ্চ রক্তচাপ রোগে পক্ষঘাত হলে সে ক্ষেত্রে রোগীকে উচ্চ রক্তচাপের বিভিন্ন ওষুধ খাওয়ানো যেতে পারে। ডায়াবেটিস রোগে পক্ষাঘাত হলে সে ক্ষেত্রে দৈনিক রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা করে নিয়মিত রোগীকে ইনসুলিন ইনজেকশন দেয়া হয়ে থাকে। আর যদি রোগীর পায়ে কোনো পচন ধরে সে ক্ষেত্রে সার্জনের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা করানো হয়ে থাকে। অনেক সময় টিউমারে পক্ষাঘাত হলে রোগীকে সার্জারি করে টিউমার সারানো হয়ে থাকে।
অনেক পক্ষাঘাত রোগ আছে যার আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে কোনো চিকিৎসা বের হয়নি। সেই সব রোগী সারা জীবন পঙ্গু হয়ে থাকে। তবে এ সব রোগীর সংখ্যা খুবই কম। অনেক সময় ওষুধে কাজ না হলে ইলেকট্রিক চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। তাতে ভালো ফল দেয়। অনেকে ম্যাসাজ বা ইলেকট্রিক ম্যাসাজের পক্ষপাতী।
আনুষঙ্গিক ব্যবস্থা : ০১. নিয়মিত হালকা শারীরিক ব্যায়াম করার চেষ্টা করা ভালো। তাতে আক্রান্ত স্থান ক্রমেই সুস্থ ও সবল হয়।
০২. আক্রান্ত স্থানে ম্যাসাজ করলে বা ইলেকট্রিক ম্যাসাজে আড়ষ্টতা ভাব কমে আসে। ০৩. অন্যান্য স্থানে রাবারের ব্যাগে গরম পানি ভরে সেঁক দিলে ভালো হয়।
০৪. পরিমিত বলকারক খাদ্যদ্রব্য মাছ, মাংস, ডিম এবং ছানা, দই, দুধ প্রভৃতি খাওয়া উপকারী (অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খেতে হবে)।
০৫. ভিটামিনযুক্ত ফল, ছোলা ভেজা, শাক-সবজি প্রভৃতি নিয়মিত খেতে হবে।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক (জনস্বাস্থ্য বিভাগ), জেএইচ শিকদার মেডিক্যাল কলেজ এবং হাসপাতাল।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.