নাজি যুদ্ধাপরাধীদের যেভাবে নিয়োগ দিয়েছিল সিআইএ
নাজি যুদ্ধাপরাধীদের যেভাবে নিয়োগ দিয়েছিল সিআইএ

নাজি যুদ্ধাপরাধীদের যেভাবে নিয়োগ দিয়েছিল সিআইএ

আসা উইন্সট্যান্টলি

কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ বিশ্বে নিজেদের পরিচিত করায় এভাবে- তারা মার্কিন নাগরিক ও তাদের স্বাধীনতার রক্ষক। তাদের দাবি, নিজেদের জনগণ ও সরকারের স্বার্থ রক্ষায় যা কিছু দরকার তার সবই করে তারা; কিন্তু বাস্তবতা বেশ ভিন্ন। সারা বিশ্বে এমনকি নিজ দেশ যুক্তরাষ্ট্রেও অগণতান্ত্রিক সহিংস কার্যক্রমের এক দীর্ঘ ইতিহাস আছে সিআইএর। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মার্কিন স্বার্থবিরোধী সরকারের, তা গণতান্ত্রিক হলেও পতন ঘটাতে তারা পেছন থেকে ভূমিকা পালন করে। এরা নির্যাতনমূলক কার্যক্রমের সাথেও জড়িত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যে সন্দেহভাজনদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিজেদের সমর্থনপুষ্ট সরকারের কাছে হস্তান্তরও করে। 

সিআইএর অসততার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো- নিকারাগুয়ায় কন্ট্রা নামে আজ্ঞাবহ এক সেনাবাহিনী গঠনে অর্থায়ন ও ষড়যন্ত্র। ১৯৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মাদক চক্র তৈরিতে এদের ব্যবহারের মাধ্যমে কন্ট্রা তৈরির কারিগরদের ব্যাপক অর্থনৈতিক সুবিধা দিয়ে এ ষড়যন্ত্রের ইতি ঘটে। ওই সময় ল্যাটিন অ্যামেরিকায় বামপন্থী সরকার ও আন্দোলন এবং এই অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি বিবেচনা করে নিকারাগুয়ার বিপ্ল­বী সরকার বা স্যান্ডানিস্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ায় সিআইএ। এ কারণেই স্যান্ডানিস্তাদের দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও এতিম সেনা কর্মকর্তাদের ইন্ধন দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ওয়াশিংটন, যারা একনায়কতন্ত্রের জন্য কাজ করেছিল। সিআইএর মাধ্যমে এই গ্রুপই পরে কন্ট্রায় রূপ নেয়। ডানপন্থী এই প্রক্সি আন্দোলনের নামই পরে হয় প্রতিবিপ্লব বা কন্ট্রা-রেভ্যুলিউশন। লস অ্যাঞ্জেলেসের কন্ট্রা সমর্থকদের কোকেন এনে পুরো অ্যামেরিকাজুড়ে মাদক কালোবাজারির সুযোগ দেয় সিআইএ। ‘ক্র্যাক’ নামে পরিচিত এ কোকেন খুবই কম দামে এখানে বিক্রি হয় এবং বেশ জনপ্রিয়তা পায়। এর প্রভাবে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মার্কিনিদের মধ্যে ক্ষয়রোগ ছড়িয়ে পড়ে। বিগত শতকের পুরো ৮০-র দশকজুড়ে ‘ক্র্যাক এপিডেমিক’ ছড়িয়ে পড়ার জন্য এটাই কারণ।

নব্বইয়ের দশকে ‘সান জোস মার্কারি নিউজে’ প্রকাশিত গ্যারি ওয়েব তার ‘ডার্ক অ্যালায়েন্স’ সিরিজে এবং পরবর্তী সময়ে একই নামের বইয়ে এসবের বিস্তারিত প্রমাণ তুলে ধরেছেন।
মূলধারার গণমাধ্যম ব্যবহার করে ওয়েবে এর গ্রহণযোগ্যতাকে মিথ্যা প্রমাণ করার সিআইএর সব চেষ্টা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে তা স্বীকার করে নেয়া হয়। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ওয়েবের সিরিজ শুধু সঠিকই নয়, বরং কন্ট্রা মাদক চক্রের সাথে সম্পর্কের দায় সিআইএ, মার্কিন মাদক আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা এড়াতে পারে না এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওয়েব এসব বিষয়ে গভীর অনুসন্ধানও চালাতে পারেননি।

সিআইএর গোপন ইতিহাসের আরো একটি দিক হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাজি যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থন ও তাদের নিয়োগ দেয়া, যা নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয় না। যেমন : সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে হিটলারের যুদ্ধের সময় ইস্টার্ন ফ্রন্টের প্রধান নাজি গোয়েন্দা কর্মকর্তা রেইনহার্ড গেলেনের বিষয়টি।
গেলেনের কাছে সোভিয়েত ইউনিয়নের অনেক নথি ছিল। নাজি শাসনের পতনের পর এসব নথি পরবর্তী সময়ে মার্কিন স্বার্থে ব্যবহারের জন্য সে লুকিয়ে রাখে। সে সময় সোভিয়েত ইউনিয়নে তথ্য সংগ্রহের জন্য এমন একজন সোর্স পাওয়া খুব কঠিন ছিল। আর তাই যুদ্ধের পরপরই গেলেনকে নিয়োগ দেয় সিআইএ। সিআইএর পক্ষে গেলেনের গ্রুপ তৎপরতা শুরু করে, মূলত এটি ছিল নাজিদের গোপন প্রতিনিধি।

এর পর কী? গেলেন এরপর এই গ্রুপে একঝাঁক নাজি যুদ্ধাপরাধীকে নিয়োগ দেয়। ওয়াশিংটন পোস্টে তার শোক সংবাদে উল্লে­খ করা তথ্য থেকে জানা যায়, সে কয়েক হাজার লোক নিয়োগ দেয়, যাদের বেশির ভাগই ছিল সাবেক নাজি সদস্য। এ জন্য তাকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের অর্থ সহায়তা দেয়া হয়েছিল। ১৯৫০ সালে মিসরের রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে যারা সরকার গঠন করেছিল, তাদেরও গেলেন ও তার নাজি সহকর্মীদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেয় সিআইএ। যদিও সিআইএর মাধ্যমে মিসরের সামরিক সরকারের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের এ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক খুব অল্প সময়ই বজায় থাকে এবং জামাল আবদেল নাসের পরে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সোভিয়েত ইউনিয়নের মিত্রে পরিণত হন।

১৯৯১ সালে অ্যান্ড্রু ও লেসলি ককবার্নের লেখা ইসরাইলি-মার্কিন সেনাবাহিনী-গোয়েন্দা সম্পর্ক বিষয়ক বইয়ের ডেঞ্জারাস লিয়াজোঁ অধ্যায়ে উল্লে­খ করেন। ১৯৫২ সালে মিসরে সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতায় আনতে কেরমিত রুজভেল্ট কাজ করলেও মূলত তার পেছনে ছিল সিআইএ। রুজভেল্ট ওয়াশিংটনকে তারবার্তা পাঠান যে, মিসরীয় সেনাবাহিনীর জাতীয়তাবাদী ‘ফি অফিসার’দের সাথে সে এক চুক্তি সম্পন্ন করেছে। পরবর্তীতে সে ইরানি গণতন্ত্রের পতনের পেছনেও ভূমিকা রাখে। পরবর্তী সময়ে সেনাশাসিত সরকারের আদলে মিসরকে এক অনুগামী রাষ্ট্র বানায় সিআইএ। নাসেরের পরবর্তী কার্যক্রমই প্রমাণ করে যে সমস্ত প্রচেষ্টাই ছিল ব্যর্থ, কিন্তু শুধু একবারের জন্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মনে হয়েছিল যে, এটি সফল হবে।

মিসরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কার্যক্রম পুনর্গঠনের জন্য প্রশিক্ষক পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় সিআইএ একমত হয়েছিল যে, এ কার্যক্রমে সরাসরি যুক্ত হওয়া কতটা ঝুঁঁকিপূর্ণ। তখন তারা গেলেনের গ্রুপকে সিআইএর প্রক্সি হিসেবে কাজে লাগায়।
ককবার্নের বই অনুযায়ী, গেলেন সাবেক নিরাপত্তা কমান্ডো ছিলেন এবং মিসরীয় সেনাবাহিনীর প্রস্তাব অনুযায়ী পরে ‘সিআইএ সামান্য ভাতা বাড়িয়ে দেবে এই শর্তে তিনি কমিশন লাভ করেন। এই বইয়ে আরো উল্লে­খ করা হয়, সিআইএ গেলেনকে ১৯৫৫ সালে কমপক্ষে ১১ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করে এবং তার এই গ্রুপ পুরোপুরি সিআইএর ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল ছিল।
সারা বিশ্বে নাজিদের মাধ্যমে নোংরা কার্যক্রম পরিচালনার পর বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার সিআইএর এ দাবি প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়।

লেখক : অনুসন্ধানী সাংবাদিক। ‘দ্য ইলেকট্রনিক ইনতিফাদা’র সহযোগী সম্পাদক এবং মিডল ইস্ট মনিটরের কলামিস্ট। লেখালেখি করেন ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে। মিডল ইস্ট মনিটর থেকে
ভাষান্তর করেছেন মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.