রান্নায় বেড়েছে বিদ্যুতের ব্যবহার

চট্টগ্রামে গ্যাস সঙ্কটে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানা বন্ধ

নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম ব্যুরো

গ্যাস রেশনিং করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম অবস্থা বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। গ্যাস সঙ্কটের কারণে বেশির ভাগ সময় বন্ধ রাখতে হচ্ছে চট্টগ্রামের গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র ও রাষ্ট্রায়ত্ত সারকারখানা সিইউএফএল। তবুও ভোর থেকে রাত পর্যন্ত বাসাবাড়িতে রান্নার গ্যাস মিলছে না। বাসাবাড়ির ভোগান্তি এত চরম পর্যায়ে পৌঁছে যে, রান্নার কাজে বৈদ্যুতিক সামগ্রীর ব্যবহার বেড়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। পাশাপাশি শিল্প কারখানার উৎপাদনেও গলদঘর্ম অবস্থা। আগামী এপ্রিলের শেষ দিকে এলএনজি আমদানি শুরু হলে পরিস্থিতি উন্নতির কথা বলা হলেও বছরের পর বছর স্বাভাবিক মাত্রায় গ্যাস না পেয়েও স্বাভাবিক বিল পরিশোধ করে আসা লোকজন এখন উৎকণ্ঠায় পড়েছেন। আমদানি করা এলএনজি পাইপ লাইনে যুক্ত হওয়ার সাথে সাথে গ্যাসের বিল বাড়ার খবরে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে জনমনে।
বছরের পর বছর এ ধরনের নাজুক পরিস্থিতি কাটিয়েও চট্টগ্রামের গ্রাহকেরা গ্যাসের স্বাভাবিক বিল পরিশোধ করে আসছিলেন। পরিস্থিতি উন্নতির ল্েয এলএনজি আমদানি করে পাইপ লাইনে সরবরাহের প্রসঙ্গে এত দিন বলা হচ্ছিল গ্যাসের দাম স্বাভাবিক থাকবে। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে এলএনজি পাইপ লাইনে যুক্ত হলে গ্যাসের দাম বাড়বে। এমনিতেই দুর্মূল্যের বাজারে মানুষের গলদঘর্ম অবস্থা, এর ওপর নতুন করে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি পেলে মানুষের আর্থিক টানাপড়েন আরো বাড়বে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।
পেট্রোবাংলার সর্বশেষ তথ্যানুযায়ীও গ্যাসনির্ভর তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চারটি ইউনিট এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সারকারখানা সিইউএফএল গত মঙ্গলবার পর্যন্ত বন্ধ ছিল গ্যাস সঙ্কটের কারণে।
গ্যাসের চাপ সঙ্কটে বিস্তীর্ণ এলাকার বাসাবাড়ির রান্না-বান্না প্রায়ই বন্ধ থাকছে প্রতিদিন। ফলে উচ্চ ভোল্টেজের বৈদ্যুতিক সামগ্রী যেমন রাইস কুকার, ইলেকট্রিক কেটলি, ইন্ডাকশন কুকার, ওয়াটার হিটার, মাইক্রোওভেন প্রভৃতির ব্যবহার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায়ও এসবের ব্যবহার মারাত্মক চাপ বাড়িয়েছে। কিন্তু গ্যাস সঙ্কটে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় বিদ্যুৎ বিভাগ চাহিদানুযায়ী বিদ্যুতের জোগান দিতে পারছে না। গ্যাস ও বিদ্যুৎ উভয়েরই ঘাটতি চট্টগ্রামের মানুষকে চরমভাবে ভোগাচ্ছে।
পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামের গ্যাসনির্ভর রাষ্ট্রায়ত্ত সারখানা চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল), রাউজান তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১৮০ মেগাওয়াট উৎপাদন মতার পৃথক দু’টি ইউনিট, শিকলবাহা ৪০ মেগাওয়াট ও ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাস সরবরাহ দিতে না পারায় শাটডাউনে (বন্ধ) ছিল।
গত মঙ্গলবার চট্টগ্রামে ১৯৬.৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেয়া হয়। এর মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দেড় শ’ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে গ্যাস সরবরাহ দেয়া হয় মাত্র ৩.৫ মিলিয়ন ঘনফুট। এ ছাড়া বহুজাতিক সারকারখানা কাফকোকে ৪৫.৬ মিলিয়ন ঘনফুট, আবাসিক ও অন্যান্য বাণিজ্যিক গ্রাহক মিলে ১৪১.৯ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেয়া হয়।
কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি (কেজিসিএল) কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, এক দিকে সারা দেশের চাহিদার চেয়ে গ্যাসের সরবরাহ কম, অন্য দিকে চট্টগ্রামের লাইন অপোকৃত শেষ প্রান্তে (ডাউনস্ট্রিমে) হওয়ায় এখানে চাপ সঙ্কট প্রবল। লাইনে যা গ্যাস আসছে তা শুরুতেই তিতাস ও বাখরাবাদ নেয়ার পর এ দিকে আসতে আসতে চাপ কমে যাচ্ছে। এমনিতেই কম সরবরাহ এর ওপর চাপ সঙ্কটের মাঝে আমরা আছি। এলএনজি গ্যাস এলেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তারা জানান।
পেট্রোবাংলার ২০১৪ সালে প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছেÑ ২০১৬ সালে চট্টগ্রামে তথা কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানির গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৪৪৯ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০১৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়াবে দৈনিক ৫১২ মিলিয়ন ঘনফুটে।
চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, দেশের অর্থনীতির অগ্রযাত্রায় শিল্প ও বন্দর নগরী চট্টগ্রামের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাই চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা অতীব জরুরি। তিনি দীর্ঘ দিনের গ্যাস সঙ্কট প্রসঙ্গ উল্লেখ করে চাহিদা ও সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখার অনুরোধ জানান। চেম্বার সভাপতি আমদানিকৃত এলএনজির যৌক্তিক দাম নির্ধারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন, যাতে ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতামূলক সমতা না হারান। তিনি চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি নাজুক বিবেচনা করে এলএনজি সরবরাহ না আসা পর্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে জাতীয় গ্রিড থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর আহ্বান জানান।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.