আল্লাহর ওপর পূর্ণ বিশ্বাস

মুরাদ হফম্যান

ইসলামের প্রাথমিক ও মৌলিক বিশ্বাসের ঘোষণাটি দুই অংশে বিভক্ত। যার প্রথমাংশে একজন মুসলমান আল্লাহর একত্ববাদে তার বিশ্বাস ঘোষণা করে। এক দিকে সে সরলভাবে ঘোষণা দ্বারা সাক্ষ্য প্রদান করেÑ আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লালাহ। অন্য দিকে সে সব ধরনের দ্বিত্ববাদ, ত্রিত্ববাদ এবং বহু খোদাবাদের বিরুদ্ধে তার বিশ্বাস ঘোষণা করে আল্লাহর নির্দেশে বলে :
(হে মুহাম্মদ), তুমি বলো, তিনিই আল্লাহ তায়ালা, তিনি একক, (সৃষ্টি পরিচালনার ব্যাপারে) তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন, তার থেকে কেউ জন্ম নেয়নি, তিনিও কারো থেকে জন্মগ্রহণ করেননি। (আর সত্যকথা হচ্ছে) তার সমতুল্য দ্বিতীয় কেউ নেই।
‘আমি ঘোষণা করছি (সাক্ষ্য দিচ্ছি) যে, এক আল্লাহ ছাড়া উপাস্য নেই’ (আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লালাহ)- এই বিধিবদ্ধ বাক্য দ্বারা একজন মুসলমান আল্লাহর একত্ব এবং অতুলনীয়তা সম্পর্কে তার দৃঢ় বিশ্বাস ঘোষণা করেন। মুসলিম দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী একত্বের এই সামঞ্জস্য (তাওহিদ), দৃশ্য ও অদৃশ্য, আত্মা ও দেহ, বিজ্ঞান ও ধর্ম, মানুষ এবং প্রকৃতি এমনকি সামাজিক জীব হিসেবে মুসলমানদের সামষ্টিক জীবনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য-তারা সর্বদা (নৃতাত্ত্বিক জাতীয়তার ঊর্ধ্বে) একটি মাত্র বিশ্বসম্প্রদায় (উম্মাহ) হিসেবে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করতে তৎপর।
খোদার অস্তিত্ব সম্পর্কে জ্ঞানতাত্ত্বিক বিচারে মুসলমানদের আপসহীন বিশ্বাসটি তার মৌলিকত্ব ও তার কার্যাবলিসাপেক্ষে অনেকটা অজ্ঞেয়বাদ-এর পর্যায়ভুক্ত। তার সংজ্ঞা যদি নিরূপণ করতেই হয় তবে তা কেবল নেতিবাচক পদ্ধতিতেই করা সম্ভব বলে মুসলমানেরা বিশ্বাস করে, ‘তিনি কী,’ তা বর্ণনা করা সম্ভব নয়। তবে ‘তিনি কী নন,’ তা বর্ণনা করা যেতে পারে মাত্র। যেমন দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে, যেহেতু তার শুরু বা শেষ কোনটিই নেই, সুতরাং তার অনস্তিত্বের প্রশ্নটিই অবান্তর। মুসলমানেরা পাশাপাশি এটাও বিশ্বাস করে যে, কেবলমাত্র বিশ্ব-প্রকৃতি নিরীক্ষণের দ্বারা মানবজাতির জন্য একটি আদর্শ জীবন-যাপন পদ্ধতি আবিষ্কার করা সম্ভব নয়। [তথাকথিত ‘প্রকৃতির আইন’ সম্পর্কিত যাবতীয় তত্ত্বের ইতিহাস পর্যালোচনা প্রমাণ করে, যে তাদের বিশ্বাসই সঠিক]। এ কারণেই তারা ঐশী প্রত্যাদেশের অপরিহার্যতায় বিশ্বাস করে।
ইসলামের প্রাথমিক ও মৌলিক বিশ্বাসের দ্বিতীয়াংশে একজন মুসলমান ঘোষণা করে (সাক্ষ্য দেয়) যে, ‘এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে মুহাম্মদ সা: হচ্ছেন তার রাসূল’ (ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ) যেহেতু মুসলমানেরা মানবজাতির আদর্শ জীবন পদ্ধতির জন্য ঐশী প্রত্যাদেশকে অপরিহার্য মনে করে, সেহেতু তারা এও বিশ্বাস করে যে, যুগে যুগে মানুষের কাছে আল্লাহ্র বাণী পৌঁছে দেয়ার জন্য একেশ্বরবাদী নবীরা যথাÑ হযরত ইব্রাহীম (আ:), হজরত মূসা (আ:) এবং হজরত ঈসা (আ:) প্রেরিত হয়েছেন এবং ঐশী প্রত্যাদেশের এই ধারা পবিত্র কুরআন মজিদে এসে চূড়ান্ত রূপ প্রাপ্ত হয়েছে, যা হজরত মুহাম্মদ সা:-এর ওপর প্রেরিত হয়েছিল (মুহাম্মদ সা: হচ্ছেন নবীদের মধ্যে সর্বশেষ জন’ [৩৩ : ৪০]।
এ কারণেই মুসলমানেরা হজরত মুহাম্মদ সা:- কে শুধু একজন নবীই নয়; বরং সর্বশেষ নবী হিসেবে বিশ্বাস করেন।
কুরআনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী মুসলিম সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহ তায়ালার কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের মাধ্যমে নিরাপদ আশ্রয় প্রার্থনা করে। এর ভিত্তিতেই রোমান ক্যাথলিক ধর্মযাজক ফাদার Johannes Sokolowsky SJ ইসলামের একটি দৃষ্টান্তমূলক সংজ্ঞা হাজির করেছেন। তার মতে জীবন হয়ে ওঠে সামঞ্জস্যময়, স্বাস্থ্যবান ও আধ্যাত্মিকভাবে প্রকৃতিশুদ্ধ।
এভাবে (উদাহরণস্বরূপ বলা যায়) একজন মুসলমান যেমনিভাবে তওরাতের ১০টি ঐশী নির্দেশ মেনে চলে, তেমনিভাবে ইঞ্জিলের নিজ প্রতিবেশীকে ভালোবাসার নির্দেশও পালন করে। একজন মুসলমানের জন্য তো অবশ্যই, এমনকি যে সব জাতিগত খ্রিষ্টান বা ইহুদি তাদের ধর্মবিশ্বাসকে অুণœ রেখেছেন তাদের জন্যও বিশ্বাসের ছয়টি উপাদান রয়েছে। পবিত্র কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী যেগুলো মহাজাগতিক বাস্তবতাগুলোর ধর্মীয় উপলব্ধির জন্য অপরিহার্য (২ : ২৮৫; ৪ : ১৩৬; ৯ : ৫১)। আল্লাহর অস্তিত্ব; অন্য অদৃশ্য সত্তার অস্তিত্ব (তার ফেরেশতারা); নবী-রাসূলদের অনুপ্রেরণা (তার বার্তাবাহকেরা); চূড়ান্ত রায় (বিচার)/পরকালের জীবন; পূর্ব-নির্দিষ্টতা (‘অদৃষ্টবাদ’-শীর্ষক অধ্যায় দেখুন)।
অন্য দিকে ইসলাম উপাসনা ও আচরণ বিধিগত কিছু নীতিমালা নির্দেশ করে, যা একান্তই তার নিজস্ব, বিশ্বাসের ঘোষণা [(সাক্ষ্য) শাহাদাতসহ এগুলো মিলে রচিত হয় সদা কথিত ‘পাঁচ স্তম্ভ’-এর ধারণাÑ নির্দিষ্ট সময়ে অত্যাবশ্যকীয় প্রার্থনা দৈনিক পাঁচবার (সালাত); (যদি প্রযোজ্য হয়) বৎসরান্তে প্রদেয় মুখ্য কর (জাকাত); (স্বাস্থ্যবান ব্যক্তির) পুরো রমজান মাসের দিবাভাগে পানাহার বর্জন (সিয়াম); (শর্তপূরণে সক্ষম ব্যক্তির জন্য) জীবনে একবার মক্কায় তীর্থযাত্রা (হজ); এই স্তম্ভগুলো প্রমাণ করে যে, ইসলাম যুগপৎ বিশ্বাস ও ক্রিয়ার ওপর প্রতিষ্ঠিত প্রার্থনা এবং কর্ম; এমনকি নামাজের মতো আধ্যাত্মিক উপাসনার ক্ষেত্রেও দৈহিক ক্রিয়াকলাপের আবশ্যকতা রয়েছে। মক্কায় অবতীর্ণ সূরা ‘আল আসর’-এ এই বিষয়ে পরিষ্কার দিকনির্দেশনা রয়েছে : ‘সময়ের কসম (করে বলছি); (একমাত্র) সেই লোকগুলো বাদে, যারা (আল্লাহ তায়ালার ওপর); ঈমান এনেছে, (এবং ঈমানের নির্দেশ মোতাবেক) নেক কাজ; করেছে, (সামাজিক জীবনে) একে অপরকে এই মহাসত্যের অনুসরণের কথা বলেছে, সর্বোপরি ঈমানের পরীক্ষায়); এরা একে অপরকে ধৈর্য ধারণ করবার উপদেশ দিয়েছে। Ñ সূরা আল-আসর ১-৩
একজন ভালো মুসলমানের ুদ্রাকৃতির প্রতিচ্ছবি হচ্ছে; সে আল্লাহতে বিশ্বাস রাখে এবং নিয়মিত প্রার্থনা করে, কোনোরূপ জবরদস্তি বা ঔদ্ধত্য প্রকাশ না করে তার প্রতিবেশী ও সামগ্রিকভাবে ইসলামের জন্য ভালো কাজ করে।
অনুবাদ : মঈন বিন নাসির

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.