নারীর অধিকার ও ইসলাম

মো: আক্তারুজ্জামান

ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, ইসলাম-পূর্ব আরব ভূখণ্ডে কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো। এই হত্যাকাণ্ড শুধু বর্বর যুগে ঘটত তা নয়, বর্তমান সভ্য সমাজেও এর বিস্তার ভয়াবহ। ২০১৭ সালের ১৭ এপ্রিল বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ভারতে প্রতি বছর প্রায় ছয় লাখ কন্যাশিশু গর্ভপাতের মাধ্যমে হত্যা করা হয়।’ এমন তথ্য বেশির ভাগ েেত্র খবরের অন্তরালে থেকে যায়। অর্থাৎ কন্যাশিশুর ভ্রƒণ হত্যার হার বাস্তবে আরো অনেক গুণ বেশি। এই যদি হয় আধুনিক সভ্য সমাজের ইতিহাস, আইয়ামে জাহেলিয়া তথা অন্ধকার যুগের অবস্থা কেমন ছিল সহজে অনুমেয়। যা হোক, ইসলামের নবী মুহাম্মদ সা:-এর হাত ধরে প্রথম নারী অধিকারের প্রত্যয়টি সামনে চলে আসে। কন্যাসন্তান হত্যাকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর স্মরণ করো সেই দিনের কথা! যখন জীবন্ত কবরস্থ কন্যাকে জিজ্ঞেস করা হবে। কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছে?’ (সূরা তাকবির : ৮-৯)। ইসলাম শুধু কন্যাসন্তানকে হত্যা করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেনি, বরং কন্যাসন্তানকে পুত্রসন্তানের চেয়ে বেশি মর্যাদার তাগিদও দিয়েছে। মহানবী সা: বলেন, ‘যে ব্যক্তির একটি মেয়ে আছে আর সে তাকে তুচ্ছ মনে করেনি, অপমানিত করেনি এবং ছেলেদেরকে প্রাধান্য দেয়নি। আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।’ (আবু দাউদ)। ধর্মীয় অনুশাসনের বাইরে নারী অধিকারের কথা প্রথম শোনা যায় যুক্তরাষ্ট্রের মার্গারেট ব্রেন্ট নামক এক নারীর কাছ থেকে। ১৬৪৭ সালে তিনি মারিল্যান্ডের অ্যাসেম্বলিতে প্রবেশের দাবি করেন, যা তখনকার দিনে ছিল অকল্পনীয়। লেখনীর মাধ্যমে নারী অধিকার বিষয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেন ডাচ্ নারী দার্শনিক, সাহিত্যিক ও বিজ্ঞানী মার্গারেট লুকাস ক্যাভেনডিচ। প্রথম নারী হিসেবে ক্যাভেনডিচ দ্য রয়েল সোসাইটি অব ইংল্যান্ডের অধিবেশনে যোগ দেন। ১৭৯৩ সালে নারী অধিকার ও জেন্ডার বৈষম্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে গিলোটিনে প্রাণ দিতে হয় ফ্রান্সের ওলিম্পে দ্য গসেসকে। ধীরে ধীরে নিজেদের অধিকার বিষয়ে নারীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়তে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটতে থাকে অধিকার সচেতনতা নিয়ে নানান ঘটনা। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় নারী আন্দোলন ও নারী অধিকার নামক শব্দগুলোর সাথে ৮ মার্চ তারিখটি জড়িয়ে যায় অবিচ্ছেদ্যভাবে। ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ মজুরিবৈষম্য, ১২ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ৮ ঘণ্টায় কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে সেলাই কারখানার নারীশ্রমিকেরা যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের রাস্তায় নেমেছিলেন। বরাবরের মতো সুবিধাভোগী গোষ্ঠী প্রতিবাদ মিছিলের ওপর আক্রমণ করে। সরকারি বাহিনীর আক্রমণ, নির্যাতন ও গ্রেফতারের শিকার হন অনেক নারীশ্রমিক। সে আন্দোলন শাসকদের কাছ থেকে হয়তো দাবি আদায় করতে পারেনি, অনেক নিরীহ নারী হয়তো অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন; তবুও ইতিহাসে স্থান করে নেয় ৮ মার্চ তারিখটি। তিন বছর পর, অর্থাৎ ১৮৬০ সালে ৮ মার্চকে সামনে নিয়ে নারীশ্রমিকগণ সঙ্ঘবদ্ধ হন। এবারের উদ্দেশ্য ছিল দাবি আদায়ের ল্েয নিজস্ব ইউনিয়ন গঠন করা। প্রতিপরে প্রচণ্ড চাপ সত্ত্বেও সব বাধা অতিক্রম করে তারা সফল হন। গড়ে তোলেন নিজস্ব ট্রেড ইউনিয়ন। ১৮৮৯ সালে জার্মান সমাজতন্ত্রী নেত্রী ও গবেষক কারা জেটকিন সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন নারী আন্দোলনে। ওই সালে ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত হয় এক নারীসমাবেশ। কারা এ সমাবেশ থেকে পুরুষের পাশাপাশি নারীর সম-অধিকার দাবি করেন। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক সর্বপ্রকার অধিকারের বিষয় এখানে আলোচিত হয়। ১৯০৭ সালে গঠিত হয় আন্তর্জাতিক নারী সংস্থা। কারা এই সংস্থার সম্পাদক নির্বাচিত হন। এ বছরই জার্মানির স্টুটগার্টে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলন। একজন সমাজতন্ত্রী ও নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার অগ্রদূত হিসেবে কারা এই সম্মেলনের মাধ্যমে নারীর সম-অধিকারের বিষয়টি বিশ্ববাসীর সামনে নিয়ে আসেন। পরের বছর নিউ ইয়র্কে সোস্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের প থেকে আয়োজিত নারীসমাবেশে তার নেতৃত্বে সংঘটিত হয় সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। এরপর ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দেন। এ সম্মেলনে কারা নারীর অধিকার আদায়ের প্রতি গুরুত্ব দিতে প্রতি বছর একটি বিশেষ দিনে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপনের প্রস্তাব পেশ করেন। প্রস্তাব অনুসারে বিশেষ দিন হিসেবে নির্ধারণ করা হয় ১৯ মার্চকে। ১৮৪৮ সালে প্যারি কমিউন বিপ্লবে নারীদের বিশেষ অবদান ও এ বিপ্লবকে সম্মান জানাতে বিপ্লবের সে তারিখটিকে বেছে নেয়া হয় নারী দিবস হিসেবে। ১৯১১ ও ১৯১২ সালের ১৯ মার্চ নারী দিবস হিসেবে পালিত হয় বিভিন্ন দেশে। ১৯১১ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপনের এক সপ্তাহ না পেরোতেই ২৫ মার্চ নিউ ইয়র্কের একটি পোশাক তৈরীর কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে, যাতে নিহত হন দেড় শতাধিক নারীশ্রমিক। ওই ঘটনার তদন্তে বেরিয়ে আসেÑ যথাযথ নিরাপত্তার অভাব ও নারীর প্রতি অবজ্ঞার কারণেই দুর্ঘটনা ঘটে। ১৮৫৭ সালের আন্দোলন ও নিপীড়নের ঘটনার সাথে ১৯১১ সালের এই ঘটনার একটি মিথষ্ক্রিয়া ঘটানোর চেষ্টা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, ১৯১৩ সাল থেকে ৮ মার্চকে নারী দিবস হিসেবে উদযাপন করা হবে। সেই থেকে সম্মিলিতভাবে ৮ মার্চ দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ১৯৭৫ সাল থেকে জাতিসঙ্ঘের উদ্যোগে দিবসটি পালন করা শুরু করলে নারী দিবস হিসেবে ৮ মার্চ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
একটি বিষয় লণীয়, সমাজের যে শ্রেণীর হাতে মহান স্রষ্টা যেকোনো বিষয়ের রণের দায়িত্ব প্রদান করেছেন, সে শ্রেণীই নির্দয়ভাবে ভকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। যে ধর্মীয় বিধি নারী অধিকারের তাগিদ দিয়েছে, সেই ধর্মকেই আমরা সুনিপুণভাবে ব্যবহার করছি তাদেরকে শোষণের জন্য। সমাজের যেকোনো স্তরে কোনো নারীর প্রতি অত্যাচার হলে, সম্ভ্রমহানির ঘটনা ঘটলে তৃণমূলপর্যায় থেকে শুরু করে দায়িত্বশীল ব্যক্তিটিও প্রথমেই তিগ্রস্ত নারীর পোশাক নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। অথচ পর্দা সম্পর্কে পবিত্র কুরআন নির্দেশ দিচ্ছেÑ ‘মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয়ই তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন। আর ঈমানদার নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বদেশে ফেলে রাখে...’ (সূরা নূর : ৩০-৩১)। মহান আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে পর্দার প্রথম নির্দেশ তো পুরুষদের জন্যই। অগ্রগামী হিসেবে প্রথম নির্দেশনাটুকু পুরুষ নিশ্চিত করার পর দ্বিতীয় অংশ তথা নারীর পোশাকের বিষয়ে নজর দেয়াই বোধকরি যুক্তিযুক্ত। অন্য দিকে ধর্মীয় বিধানের দোহাই দিয়ে নারীদের প্রতিভার পূর্ণ বিকাশে বাধা দেয়া হয়; অথচ ইসলাম ধর্ম নারীদের প্রায় প্রতিটি কাজের জন্য অনুমোদন দেয়। হজরত মুহাম্মদ সা: বলেন, ‘এই পৃথিবী এবং এর মধ্যস্থিত সব কিছুই মূল্যবান। কিন্তু সবচেয়ে মূল্যবান হচ্ছে একজন সৎকর্মশীল নারী।’ (মুসলিম)।
সময় পেরিয়ে যাচ্ছে সচেতন হওয়ার। নারী-পুরুষভেদে নয়, মানুষ হিসেবে সৃষ্টিকর্তার দেয়া অধিকারটিকে পূর্ণভাবে পরিপালনের মাধ্যমে পুরুষসমাজ তাদের এই লজ্জা থেকে মুক্তি পেতে পারে। মনে রাখতে হবে, ‘নারীকে যে পুরুষ যথাচিত সম্মানটুকু করতে না পারে, সে হতে পারে দিগি¦জয়ী, কিন্তু আসলে সে কাপুরুষ।’
লেখক : এমফিল গবেষক, জাবি

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.