নাক ছুঁই ছুঁই পাহাড়

আবু সাইদ কামাল

ফেসবুকে প্রিয় একজন বরেণ্য সাহিত্যিকের পোস্ট দেখে ফয়সাল মনে মনে বেশ ক্ষুব্ধ হয়। কারণ, শক্তিমান কথাসাহিত্যিক আবু আসলামের পরিচিত একজন সিরিয়াস পাঠক নাকি বইমেলা উপলক্ষে প্রশ্ন করেছেন, ‘পাহাড় ডিঙালেন, না পাহাড় কাছে চলে এলো? জবাবে তিনি লিখলেন, পাহাড়টা এখন এতটাই কাছে চলে এসেছে যে, আমার নাক ছুঁই ছুঁই করছে। তিনি আরো লিখলেন, ... দায় আমার মতো অগোত্রভুক্ত-বিচ্ছিন্ন এবং তেলবাজিতে নিরাসক্ত লেখকদের বহন করতে হয়।’
ফয়সাল বুঝতে পারে, মেলা উপলক্ষে কোনো এক প্রকাশক বেশ আগ্রহভরে তার কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস এবং গল্পের পাণ্ডুলিপি নিয়েও মেলাতে প্রকাশ করেনি। তাই বই দু’টি প্রকাশের ক্ষেত্রে পাহাড় সমান বাধাটা রয়েই গেল। সেই পোস্টে মন্তব্য করতে গিয়ে ফয়সাল লিখল, এ দেশের শক্তিমান একজন কথাসাহিত্যিকের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ও গল্পের বই প্রকাশ না হওয়া আমাদের দেশের জাতীয় সাহিত্য প্রবণতার েেত্র একটি দুঃসংবাদ। যারা তার বেশির ভাগ লেখা পড়েছেন, তাদের অনেকেই আমার সাথে একমত হবেন যে, এ লেখকের সব লেখাই মানোত্তীর্ণ। কিছু কিছু লেখা জাতীয়মান উপচে বিশ্বসাহিত্যের মান ধারণ করে। আমার মনে হয়, মুনাফার মোহে অনেক ক্ষেত্রেই মানহীন গ্রন্থ প্রকাশ হচ্ছে, অন্য দিকে, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এমন বরেণ্য ব্যক্তিদের মানসম্পন্ন গ্রন্থ হচ্ছে উপেক্ষিত। উর্বর ফসলি জমিতে আগাছা হলে তা সাফ করা যায়। কিন্তু ঢলের জলে আবর্জনার স্তূপ যদি ফসলি েেত জায়গা করে নেয়, তাহলে স্বাভাবিক ফসল তো নষ্ট হবেই। বই মেলায় টাকার মোহে মানহীন বই প্রকাশের ঢল নেমেছে, আর সেসব আবর্জনার চাপে মূল ফসলই বুঝি বিনষ্ট হওয়ার পথে এখন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ফেসবুকের আর একটি পোস্ট ফয়সালের শুধু মনোযোগই আকর্ষণ করেনি, বিক্ষুব্ধ মনে হতাশার পানি ঢেলে দিয়ে ক্ষোভের আগুন একেবারে নিভিয়ে দিয়েছে। ওই পোস্টে বলা হয়, আগামীকাল কবি আবু আহমেদের ষাটতম জন্মদিনের বিশাল আয়োজন। আর এ জন্য তার এ জন্মদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন জেলাপর্যায়ের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি, কোনো একটি বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসি, পৌরপিতাসহ শহরের উল্লেখযোগ্য কবি-ছড়াকাররা। কারণ, তিনি এখন একটি দলের অঙ্গ সাহিত্য সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তা থেকেই ফয়সালের মনে প্রশ্ন উঠে, তাহলে কি সেই ‘অগোত্রভুক্ত-বিচ্ছিন্ন এবং তেলবাজিতে নিরাসক্ত’ লেখকেরা অপাঙ্ক্তেয়ই থেকে যাবে, আর ধুরন্ধর, প্রতারক এবং মতাদর্শভুক্তরাই প্রাধান্য পাবে? এ কারণেই কি আবু আহমেদের মতো ব্যক্তিরা নন্দন চর্চার অঙ্গন দখল করে রেখেছে। এই আবু আহমেদের স্বরূপ উন্মোচনের জন্য ফয়সাল পেছন-ফিরে তাকায়;
মাত্র পাঁচ দিনের জ্বরে ন’মাসের শিশুকন্যাকে রেখে ফয়সালের স্ত্রী পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়। আকাশ ভেঙে তখন বিনামেঘে বজ্রপাত হয় ফয়সালের মাথার ওপর। সদ্য গোছানো সংসার তাসের ঘরের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। আকস্মিক এরূপ কোনো ভয়াল আঘাতের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না ফয়সাল। শরতের জোছনামুখর স্বপ্নিল রাত যে হঠাৎ কালো মেঘে ঢেকে দিয়ে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে এভাবে লণ্ডভণ্ড করে দেবে, এ কথা কখনো ভাবতে পারেনি সে। স্ত্রী বিয়োগের বেদনায় বিধুর ফয়সালের মুখের দিকে কি আর তাকানো যায়! তার সব সত্তা নিংড়ে চুইয়ে চুইয়ে ঝরে পড়ে যেন অব্যক্ত কান্না। এমন ভয়াল আঘাতের রসায়নে তার মনোজগতটা ক’দিনেই গভীর বেদনার এক নির্ঝরণীতে রূপ নেয়। কিন্তু তার হৃদয়মথিত শোকের মাতম না কোনো শাব্দিক কান্নায়, না কোনো বাহ্যিক আচরণে প্রকাশ করতে পারে। অনেক সময় সে তার পুঞ্জীভূত বেদনাকে অন্য দশটা মানুষের বেদনার সাথে একাত্ম করতে চেষ্টাও করেছে। কিন্তু কেনো যেন তা পারেনি। শেষে অনেক ভাবনা-চিন্তার পর কিংবা গুমোট মনে অনেক দিন ধ্যানমগ্ন থাকার পর সে বুঝতে পারেÑ মহৎ শিল্পমাত্রই গভীর বেদনার কাছে দায়বদ্ধ। তাই ফয়সাল স্থির সিদ্ধান্ত নেয়Ñ সে শিল্প চর্চায় ব্রতী হবে।
ছাত্রজীবন থেকেই যদিও অল্প-স্বল্প লেখার অভ্যেস ছিল তার। লিখতো আড়ালে- আবডালে। বন্ধু-বান্ধবদের দু-চারজন জানতো, ফয়সাল নিভৃতে লেখালেখি করে। সীমিত বন্ধুদের পরিসর ছাড়া আর কেউ এ বিষয়টা জানতোও না। তাই ওভাবে তার আত্মপ্রকাশও হয়নি। ফয়সাল তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে বুঝে নিয়েছে, প্রতিটি বিয়োগান্ত ঘটনাই মানুষকে শোকের অথৈ সাগরে ভাসায়। কিন্তু স্ত্রী বিয়োগের ঘটনায় হৃদয় জগতে যে অবিনাশী আঘাত হানে, তার ফলে সৃষ্ট ত থেকে নিরন্তর রণ হতেই থাকে।

দুই
স্ত্রী বিয়োগের ওই মর্মান্তিক ঘটনার পর ফয়সালের রূঢ় জীবনচর্চার পর্বে পর্বে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। এরই মধ্যে সে বেশ এলোমেলো হয়ে গেছে। তছনছ হয়ে গেছে সাংসারিক জীবন। শুধু আপে, আফসোস আর হুতাশন করে মনে মনে বলে, হায় হায়! এ কী হলো, এ কী হলো আমার!
যেন শত মাথা কুটেও শান্তি পায় না সে, পায় না কোনো স্বস্তি। আপাতদৃষ্টে বাহ্যিক দিক হতে তাকে বিষণœ ও শান্ত মনে হলেও মনোজগত বড়ই অস্থির। ভেতরের আবেগে কখনো এমন উত্তেজিত হয় যে, নিজেকে সামলাতেই সে ব্যস্ত হয়ে উঠে। ধীরে ধীরে সে অস্থির চিত্তকে স্বশাসনে আনে। আর জ্ঞান সাধনায় মনোযোগী হয়। অফিসের কাজ শেষ করে বিকেলে উপজেলা পরিষদের পাবলিক লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করে চলে সে। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে লিখে যায় ফয়সাল। লিখে যায় দুঃখবোধজাত হৃদয় নিংড়ানো আবেগের ফসল। একপর্যায়ে নান্দনিক শব্দ-সুষমায় লিখে যায় পঙ্ক্তিমালা। আস্তে আস্তে প্রকাশ্যে শুরু হয় তার সাহিত্য চর্চা। পশ্চাৎপদ একটি উপজেলা সদরের কর্মস্থলে অবস্থান করে একাকী কাব্যচর্চা করে চলে সে।
প্রায় ছয়-সাত মাসের মধ্যে সে তৈরি করে ফেলে কবিতার একটি পাণ্ডুলিপি। কেমন হয়েছে তার পাণ্ডুলিপির কবিতাগুলো, তা দেখানোর জন্য চলে যায় জেলা শহরে। সহপাঠী বন্ধু রাজু আহমেদ, বাড়ি শহরের প্রাণকেন্দ্রে। এ জেলা শহরে অবস্থান করে একই সাথে বাংলায় এম এ পড়তো ওরা। রাজুর সাথেই প্রথম কবিতার পাণ্ডলিপি নিয়ে কথা বলে ফয়সাল। এ ব্যাপারে রাজু বলে, আমার এক বড় ভাই, চাঁদের আলো সাহিত্য পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক। চলো তোমাকে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেই।
শফিকুল ইসলাম শফি চাঁদের আলো সাহিত্য পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক। রাজু আহমেদের সাথে গিয়ে শফিকুল ইসলামের সাথে পরিচিত হয় ফয়সাল। পরিচয় পর্ব শেষ হলে কবিতার পাণ্ডুলিপিটা শফিকে দেখায়। শফি পাণ্ডুলিপিটা হাতে নিয়ে উল্টে-পাল্টে দেখে। আর এদিকে শফির মন্তব্যের জন্য দুরুদুরু বুকে অপো করতে থাকে ফয়সাল। শফি ক’টা কবিতা পড়ে গম্ভীর স্বরে বলে, যেহেতু আপনি কবিতার পাণ্ডুলিপি তৈরি করে ফেলেছেন, লিখতে পারবেনÑ অন্তত এটুকু আশা করা যায়।
মি. শফি আবার বলে, তবেÑ
-তবে!
-আপনাকে নিরন্তর সাধনা করে যেতে হবে। কিছুদিনের মধ্যেই ফয়সাল আটচল্লিশ পৃষ্ঠার একটি কবিতার পাণ্ডুলিপি তৈরি করে দেয়। পাঁচ শ’ বই করে দেবে বলে দফারফা হয়। কথা হয় তিন কিস্তিতে নেবে টাকা। কথামতো ঢাকার একটি প্রকাশনার নামে বই প্রকাশ করে। বইমেলার স্টলেও উঠে ফয়সালের বই। পরিবেশনায় যে পাবলিশারের নাম দেয়া হয়, সে স্টলেই ডিসপ্লে করা হয় কাব্য গ্রন্থটি।
কিন্তু চুক্তিমতো পাঁচ শ’ বইয়ের মধ্যে সরবরাহ করে মাত্র তিন শ’ বই। বাকি দুই শ’ বই নিয়ে শুরু হয় টালবাহানা। ফয়সাল বইয়ের তাগিদ দিলে বলে, এখনো বাঁধাই হয়নি। কিন্তু ঢাকার বাঁধাইখানায় ফয়সাল খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, আবু আহমেদ বই-ই করেছে মাত্র তিন শ’। অথচ মূল্য নিয়েছে পাঁচ শ’ বইয়ের। আসল ঘটনা উদ্ধার হলে, তার প্রতারণা ধরা পড়ে। ফয়সাল যখন বাকি দুই শ’ বইয়ের টাকার জন্য চাপ দেয়, তখন তথাকথিত কবি ছদ্মবেশধারী প্রতারক আবু আহমেদ হৃদরোগীর ভান করে শয্যাশায়ী হয়। ধীরে ধীরে জানা যায়, অনেক নবীন লেখকই তার প্রতারণার শিকার হয়েছে। এভাবে প্রতারণার ফলেÑ এক সময়ে আবু আহমেদ নাজুক অবস্থায় পড়তে হয়। কারণ, সবার কাছেই সে প্রতারক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায়।

তিন
জেলা শহরের রেলস্টেশনের কাছেই খোশ মহল রেস্টুরেন্ট। ঐতিহ্যবাহী এ রেস্টুরেন্টে কবি সাহিত্যিকদের আড্ডা বসে প্রাক স্বাধীনতা আমল থেকেই। আড্ডাটা জমে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে। কারণ,ওই দিনই দৈনিক পত্রিকাগুলোতে সাহিত্য সাময়িকী প্রকাশিত হয়। জেলাপর্যায়ের লেখকদের অনেকের লেখা ছাপা হয় সাময়িকীগুলোতে। ওরা খোশমহল রেস্টুরেন্টের মোড়ে পত্রিকার দোকানে দৈনিকগুলোর সাময়িকীতে খোঁজ-খবর নেয়। যারা শহরের সেরা কবিÑলেখক বলে ইতোমধ্যে আত্মপ্রচার করেছেন এবং প্রচার করে যাচ্ছেন, তাদের এক ধরনের মোড়লিপনাও আড্ডাতে প্রকাশ পায়। নবীন লেখক হিসেবে ফয়সাল আহমেদ এক কোণে বসে থাকে। কিন্তু এরই মাঝে হঠাৎ করে একটা অঘটন ঘটে। দেশের শীর্ষ স্থানীয় একটি পত্রিকার সাহিত্য পাতায় পনেরো-বিশ বছরের সাধনায় এ জেলা শহরের যারা এখনো স্থান করে নিতে পারেনি, তেমন একটি পত্রিকার সাময়িকীতে হঠাৎ একদিন ফয়সাল আহমেদের কবিতা ছাপা হয়ে যায়। এতে টনক নড়ে জেলা শহরের কবি মহলে। ইতোমধ্যে যারা শহরে মস্তবড় কবি বলে মোড়লিপনা দেখিয়ে যাচ্ছিল, ওরা একটু নড়েচড়ে বসে। তাদের কারো কারো রাশভারী স্বরেও ফয়সাল আহমেদের নাম উচ্চারিত হতে থাকে। ফলে ধীরে ধীরে প্রবীণদের সাথেও আড্ডায় বসে ফয়সাল।
সেই আবু আহমেদ, যে কি না শত চেষ্টা সত্ত্বেও শেষ বয়সেও জাতীয় পত্রিকায় লেখা প্রকাশের যোগ্যতা অর্জন করে মূলধারার লেখক হতে পারেনি, এখনো স্থানীয় মানের লেখকই রয়ে গেছে। আর তেলবাজি করে প্রভাবশালীর ছত্রছায়ায় থেকে করে যাচ্ছে ধান্ধাবাজি। শুধু তাই নয়, সে এখন কোনো এক অঙ্গ সংগঠনের সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্যও। কাজেই তার জন্মদিন তো পালন করা হবে আড়ম্বরপূর্ণভাবেই। অথচ একজন সৎ ও বরেণ্য কথাসাহিত্যিক যার শিল্পোত্তীর্ণ লেখার সাহিত্যমান জাতীয়পর্যায় উপচে বিশ^সাহিত্যমানের পর্যায়ে...; তিনি আজ উপেক্ষিত। কারণ, তিনি অগোত্রভুক্ত-বিচ্ছিন্ন এবং তেলবাজিতে নিরাসক্ত। আর এ জন্যই তার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কালোত্তীর্ণ হওয়ার মতো গ্রন্থ প্রকাশের ক্ষেত্রেও পাহাড়সমান বাধা। ফেসবুকে এমন পোস্ট দেখে ফয়সালের ক্ষুব্ধ হওয়াটা কি অসঙ্গত?

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.