সহিংসতা কোনো সমাধানের পথ হতে পারে না : মেইরিড ম্যাগুয়ার

ভিন দেশ
মো: আবদুস সালিম

বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যখন মানবতা ভূলুণ্ঠিত, তখন কিছু মানুষ মহাবিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে। তাদেরই একজন মেইরিড ম্যাগুয়ার। কারণ তিনি সমাজকর্মী। বিশ্বে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। ইসলামি বা ইসলামপন্থী রাষ্ট্রগুলোতে যে বর্ণনাতীত সহিংসতা চলছে তারও ঘোর বিরোধিতা করে যাচ্ছেন শান্তির দূত মেইরিড ম্যাগুয়ার।
সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে শান্তি ফিরিয়ে আনতে ব্যাপক সফলতা অর্জনকারী এই নারী ১৯৭৬ সালে শান্তিতে নোবেল পেয়েছিলেন। উত্তর আয়ারল্যান্ডের প্রতিবাদী এই নারী মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য নিরলস প্রচেষ্টা চালান ‘পিস পিপল’ নামের একটি সংস্থার মাধ্যমে। আরও কৃতিত্ব আছে তার। ১৯৭৬ সালে পান নরওয়েন পিপলস পিস প্রাইস। একই বছর পান ভন ওসিজকি মেডেল। আর ১৯৯০ সালে পান পাসেম ইন টেরিস পুরস্কার।
মেইরিড পড়ালেখা শুরু করেন ভিনসেন্ট প্রাইমারি স্কুলে। একপর্যায়ে তার পরিবার তার পড়ালেখার ব্যয়ভার বহন করতে পারছিল না। তার পরও তিনি পড়ালেখা চালিয়ে যান অতি কষ্টে। একটু বড় হলে একটি কমিউনিটি সেন্টারে চাকরি নেন। শিশুদের দেখভাল করার দায়িত্ব তার। এ কাজ নাকি তার ভালোই লাগছিল। কারণ শিশুদের নিয়ে কাজ করতেও তার ভালো লাগে। তা ছাড়া এ পেশায় থেকে প্রচুর অর্থ জমা হতে থাকে তার নামে। তখন থেকে সমাজের জন্য কিছু করার মানসিকতা আরও শক্তিশালী হতে থাকে। ১৬ বছর বয়সে তিনি হিসাব নিরীক্ষণ কাজে যোগ দেন। চিন্তা করেন কিভাবে বিশ্বের মানুষ বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জীবন আরও উন্নত করা যায়। এ দিকে মেইরিড সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করতে থাকেন প্রায় ২১ বছর বয়সে।
তিনি বলেন, সহিংসতা কোনো সমাধানের পথ হতে পারে না; বরং সহিংসতা এ-সংক্রান্ত সমস্যাকে আরও জটিল করে। এ কথা ভেবে তরুণ সাংবাদিক সিয়ারান ম্যাককেউনসহ আরও কয়েকজন সমাজসেবীকে নিয়ে সমাজসেবার বিভিন্ন কাজে যোগ দিতে থাকেন।
তা থেকেই শুরু ‘পিস পিপল’ কার্যক্রম। এর সাথে যোগ হয় নোবেল পাওয়ার চমৎকার বিষয়টি। কাজ করার সাহসও বাড়তে থাকে ক্রমে। কারণ অনেকেই কাজের ক্ষেত্রে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। ফলে হাতে নিতে থাকেন একের পর এক প্রকল্প। তিনি বলেন, ‘সবার আগে প্রয়োজন মানুষের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা। তবেই জীবনে সুখ আসার কথা আমরা ভাবতে পারি। অস্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে প্রকৃত শান্তি ফিরিয়ে আনা যায় না। মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন ইত্যাদির প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুল দেখাচ্ছে বিশ্বের অনেক দেশ। সামরিক শক্তিও বাড়িয়ে তুলছে। অথচ আমরা ভেবে দেখি না পৃথিবীর সব মানুষ একটা বিশাল পরিবারের মতো। এসব না ভেবে সহিংসতার পথ ধরে আমরা বিশ্বকে রীতিমতো ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। মানুষ কিভাবে হত্যা করা যায় তা শেখানো হচ্ছে। কমবেশি সব দেশেই তা হচ্ছে। আমরা এটিও ভুলে যাই যে, পৃথিবীতে শক্তিশালী বা কম শক্তিশালী বলে কিছু নেই। বিশ্বের সব মানুষের সমান অধিকার। বিশ্বে এখন চলছে অধিকার হরণের প্রতিযোগিতা। যারা এটি করছে, তারাও ভালো থাকছে না। এটিও তাদের বোঝা উচিত।
তিনি আরও বলেন, আমাদের কাজ করতে হবে যুদ্ধ আর সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে। দরিদ্রদের পাশে দাঁড়াতে হবে। তবে এসব বিষয় সম্পর্কে আমাকে বলতেন আমার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক সিস্টার লুইস। তিনি আমার পড়া দেখে বলতেন, তুমি জীবনে অনেক বড় হবে অর্থাৎ তিনি আত্মবিশ্বাস তৈরি করেন আমার মনে।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি (২০১৮) মেইরিড ম্যাগুয়ার বাংলাদেশে এসেছেন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির ঘুরে দেখার জন্য। ২৬ ফেব্রুয়ারি উখিয়া উপজেলার কয়েকটি শিবিরে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষের সাথে কথা বলেন। তারা মিয়ানমারে থাকাকালে নির্যাতনের সব বর্ণনা দেন নোবেল বিজয়ী মেইরিডের কাছে। নির্যাতিতরা জানান, কিভাবে তাদের ও তাদের আত্মীয়দের ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতন করেছে মিয়ানমার সরকারের মদদপুষ্টরা। আরও শোনানো হয়েছে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়াসহ সম্পদ সম্পত্তি লুটপাটের ঘটনা। এসব লোমহর্ষক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা বলতে গিয়ে রোহিঙ্গারা কেঁদে ফেলেন। এসব শুনে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি মেইরিডও। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে মিয়ানমারে যে ধরনের নৃশংসতা হয়েছে বিশ্ব বিবেক তা কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। এ জন্য অং সান সু চিকে কঠিন বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। কিন্তু তা কোন দেশ করবে সেই দ্বিধাও রয়েছে তার মধ্যে। কারণ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা এসব দেখছেন, বিভিন্ন মন্তব্য করছেন, কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ কোনো দেশই নিচ্ছে না। এ জন্য মেইরিড কিছু মুসলিম দেশের কার্যক্রমের ঘোর সমালোচনা করেন। বলেছেন, এমন অবস্থা যদি তাদের হতো তবে তারা কী করত। যত দ্রুত সম্ভব আন্তর্জাতিকভাবে এর সুষ্ঠু বিচার হওয়া দরকার। নইলে হয়তো পৃথিবীতে আরও ঘটবে এ ধরনের গণহত্যার ঘটনা।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.