তাকে দেখলে নাকি মানুষের অমঙ্গল হয়

এস আর শানু খান

কখনও রাস্তার পাশে, কখনও বা দোকানের সামনে পেতে রাখা মাচালিতে, আবারো কখনও বা কোনো খোলা স্থানে রাত কাটান সেই বেচারিকে পাগল ছাড়া আর কী-ই বা বলা চলে। এলাকায় মিত্ররা নামকরা পরিবার। এই মিত্র বাড়িরই এক বিধবার নাম হারোতি। হারোতি গৌর মিত্র বাবুর ছোট বোন ও গৌতমের পিসি। একসময়ের এলাকার নামকরা সুন্দরী চরিত্রগুলোর মধ্যে হারোতির নাম ছিল শীর্ষে। হারোতির সৌন্দর্য এতই দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয় ছিল যে সেই সময় মানুষের মুখে হারোতি মানেই একটি সৌন্দর্যের উদাহরণ। আর্থিক সচ্ছলতা নামক সুখের চাবিকাঠিটা আয়ত্তে থাকায় খুবই বিলাসিতায় কাটত মিত্র বাড়ির সবার। সেই সময়ের এমন কোনো যুবক খুঁজে পাওয়া মুশকিল ছিল যে কিনা হারোতির রূপ-লাবণ্যের কাছে দুর্বলতা বোধ করত না। মিত্রর বাড়ির সামনে সকাল-বিকেল মানুষের মেলা বসত। এলাকার সব যুবক বিভিন্ন অজুহাতে বাড়ির সামনে গিয়ে ধরনা দিয়ে থাকত। কেউ বা আবার সামান্য একটু দেখার জন্য বিনা কারণে কিছু কেনার উচিলায় গৌতমকে ডাকতে বাড়িতে যেত। কেউ কেউ তো মিত্রর বাড়ির সামনে কাজের বল, লুডু আর তাস খেলার মজমা বসাত। এসব কিছু উদ্দেশ্য ছিল একটাইÑ হারোতিকে একটু দেখা। দেখলেই যেন দেহ-প্রাণ জুড়িয়ে যায়। দিনে কম করে দু-তিন জায়গা থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসত। হিন্দু, মুসলমান ভেদাভেদ ভুলে অনেকেই হারোতি প্রেমে নিজেই নিজেকে ডুবিয়ে বিয়ের প্রস্তাব দিত। কিন্তু হারোতি কাউকেই পাত্তা দিতেন না। কেননা হারোতিও কোনো একজনের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন তখন। সেই ভাগ্যবান আর কেউ নন, এই গ্রামেরই কোনো এক বিবাহিত মুসলমান। স্ত্রী, সন্তান, সুন্দর সংসার থাকা সত্ত্বেও হারোতির প্রেমে মজেছিলেন ভদ্রলোক। বেশি দিন বিষয়টি ধামাচাপা ছিল না। যেন একই বৃত্তে দু’টি জ্যা এ রকম তো সম্পর্ক ছিল দু’জন দু’জনার। চুটিয়ে চলত প্রেমলীলা। অবশেষে জোর জবরদস্তি করে পাশের গ্রামের এক লোকের সাথে বাড়ি থেকে বিয়ে দিয়ে দিলো হারোতিকে। কিন্তু সেখানে হারোতি নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি কোনোভাবেই। বিভিন্ন রকম ভিত্তিহীন অজুহাত খাড়া করে অবশেষে সেখান থেকে বিয়েবিচ্ছেদ ঘটিয়ে আবার বাড়ি এসে একাকী স্বাধীন জীবনযাপন শুরু করলেন। প্রেমের জন্য মানুষ কত কি না করেছে যুগে যুগে। সেই তুলনায় এটি যেন একটা নগণ্য ব্যাপার ছিল। হারোতি সকালে একটা শাড়ি পরতেন, দুপুরে আর একটি, বিকেলে পরতেন অন্য আরও একটি। শাড়ির সাথে ম্যাচিং করেই সব কিছু পরতেন। অবশেষে সেই ভদ্রলোকটা হারোতিকে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখিয়ে প্রেমের সাগরে ঢেউয়ের পরে ঢেউ তুলেই যেতে লাগল। কিছু কথা রয়েছে যেগুলো কখনও থাকে না চাপা। ভদ্রলোকটির স্ত্রী তার স্বামীর এই পরকীয়াজনিত কারণটি জেনে পরিবারে এক নতুন অশান্তির মেলা বসালেন। আর যাই হন না কেন কোনো নারীর তার স্বামীর ভাগ দিতে চাইবেন না কখনও কাউকে। তার পর আর তিনি ছিলেন ধর্মভীরু একজন আদর্শ নারী। স্বামীকে যখন এই পথ থেকে সরিয়ে আনতে ব্যর্থ হলেন শত চেষ্টা করেও; তখন নিজের কষ্টকে নিজের ভেতরে পুষে রেখে গলায় দড়ি দিয়ে চারটি ছেলে সন্তানের মা ইহলোক ত্যাগ করে অচেনা-অজানা ঠিকানায় পাড়ি জমালেন। কিন্তু তাতেও কোনো পরিবর্তন এলো না প্রেমে। সবাই ভাবতেন হয়তো ভদ্রলোক এবার হারোতিকে বিয়ে করবেন। কিন্তু না, তাও করলেন না। ধীরে ধীরে হারোতিরও বয়স ঝুঁকে এলো। শরীরে দেখা দিলো বার্ধক্য। বুড়ো বয়সে ভদ্রলোকটা আবার একটি মহিলাকে বিয়ে করে এনে প্রমাণ করে দিলেন যে হারোতির সাথে তার প্রেমলীলার অবসান ঘটেছে। হারোতি এখন নামকরা একটি পাগলের চরিত্রের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিন নেই রাত নেই সারাক্ষণ একটা লাঠিতে ভর করে ঘুর ঘুর করে বেড়ান আর অনবরত বকবক করতে থাকেন। কখন কী বলেন তা বোঝাও দুরূহ। শীতের মধ্যেও মোড়েই রাত কাটিয়ে দিচ্ছেন বছরের পর বছর। গৌতম বাড়ি থাকতে বললেও বাড়ি থাকেন না। মন চাইলে দুই মুঠো খান, নয়তো নয়। মাথার পাকা চুলগুলোর কেটে বব কাটিং করে বিবর্ণ চেহারা নিয়ে জীবন পার করছেন।
একসময় যে হারোতি ছিলেন সৌন্দর্যের বড় একটা উদাহরণ; যাকে দেখার জন্য সবাই ছিলেন পাগল; সেই হারোতিকে এখন মানুষ অলক্ষ্মীর পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচনা করে। হারোতিকে দেখলে নাকি কারো কোনো কাজ শুভ হয় না। যাত্রাপথে হারোতিকে দেখলে নাকি মানুষের যাত্রা অশুভ হয়। কোনো কাজে যাওয়ার সময় সামনে হারোতি পড়লে নাকি কারো সে কাজ সফল হয় না। বাস্তবতা কতটুকু জানি না। তবে এ থেকে অনেক কিছু বোঝার রয়েছে। সময় ও বয়স কখনও থেমে থাকে না। আজো কেউই পারেননি তার বয়স তার দুরন্ত যৌবনকালকে ধরে রাখতে। সময়ের সাথে নিজেকে নিজের অজান্তেই বয়োজ্যেষ্ঠ থেকে বয়োজ্যেষ্ঠের কাতারে নিয়ে দাঁড় করেছে। ভাঙাগড়া, ভালো-মন্দ সময় নিয়েই মানুষের জীবন। সুখ-দুঃখের মাঝেই মানুষের আসল জীবন নিহিত। তাই তো বয়সের কারণে বা আবেগের বশে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে বসা ঠিক নয়, যা কিনা সারা জীবনের জন্য মারাত্মক সমস্যা হয়ে যেতে পারে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.