বুড়িচংয়ের বেশির ভাগ খাল-নালা এভাবে ভরাট হয়ে গেছে :নয়া দিগন্ত
বুড়িচংয়ের বেশির ভাগ খাল-নালা এভাবে ভরাট হয়ে গেছে :নয়া দিগন্ত

বেশির ভাগ নালা ও খাল ভরাট বুড়িচংয়ে বোরো ফসল নিয়ে শঙ্কায়

৪৭ হাজার কৃষক পরিবার
কাজী খোরশেদ আলম বুড়িচং (কুমিল্লা)

কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের ৪৭ হাজারের বেশি কৃষক কৃষিকাজের মাধ্যমে তাদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। অত্র অঞ্চলের প্রধান কৃষিপণ্য হলো ধান। ধান উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে অনেক কৃষক তাদের পরিবারের যাবতীয় চাহিদা পূরণ করে। বিশেষ করে বোরো ফসলকে কেন্দ্র করে সারা বছরের খাদ্যচাহিদা মেটানোর চেষ্টা করে থাকে। বন্যা ও বৃষ্টির কারণে বছরের অন্যান্য ফসলের তুলনায় এ অঞ্চলের মানুষ বোরো ধান রোপণ করে বেশি। কিন্তু বর্তমানে উপজেলার খালগুলো দীর্ঘদিন খনন না করায় পলিমাটি জমে বেশির ভাগ নালা ও খাল ভরাট হয়ে গেছে। তা ছাড়া কিছু ভূমিদস্যু ড্রেজারের মাধ্যমে মাটি কেটে খালগুলো ভরাট করে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট নির্মাণ করছে। ফলে দিনে দিনে পানি নিষ্কাশনের খাল ও নালাগুলো অস্তিত্ব¡হীন হয়ে পড়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় এবং উজান থেকে ভারতের পানি নেমে এসে বোরো ফসলের মাঠগুলো পানিতে ভাসিয়ে দেয়। এতে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
এ ছাড়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত ছোট ছোট খাল ও নালাগুলোর অস্তিত্ব নেই। সড়কের কালভার্ট ও ব্রিজগুলো দেখতে পাওয়া যায়। ব্রিজ ও কালভার্টগুলো খাল ও নালার ওপর অবস্থান করা শেষ চিহ্ন হিসেবে টিকে আছে। যা দেখলে বোঝা যায় এখান দিয়ে এক সময় খাল ও নালা ছিল। যা দিয়ে পানি প্রবাহিত হতো।
সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও দায়িত্বশীলদের তদারকির অভাবে ক্রমান্বয়ে উপজেলার খাল ও নালাগুলো ভরাট হয়ে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে। এই খাল ও নালাগুলো প্রথম খননের পরে আবার কবে খনন করা হয়েছে তা কেউ বলতে পারে না। মাঝে মধ্যে খাল খননের কোনো কর্মসূচি বা কোনো প্রকল্প অনুমোদন করা হলেও তা থাকে কাগজেকলমে। বাস্তবে তা কখনো আলোর মুখ দেখতে পায় না।
বুড়িচং উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় ফসলের মাঠের নাম হলো পয়াতের জলা। যার মধ্যে বুড়িচং ও আদর্শ সদর উপজেলার কয়েক হাজার কৃষক ধান চাষ করে নিজেদের পরিবারের চাহিদা মেটায়। কিন্তু বিগত কয়েক দশক ধরে এই মাঠের পানি নিঃষ্কাশনের জন্য চার দিকে যে খালগুলো রয়েছে তা ভরাট হয়ে যাওয়ায় এবং কোথাও কোথাও ভূমিদস্যুরা ঘরবাড়ি ও দোকানপাট নির্মাণ করার কারণে সামান্য বৃষ্টি হলে বোরো ফসল নষ্ট হয়ে যায়। ফলে অত্র অঞ্চলের কৃষকের জীবনে দুর্দশা নেমে আসে। প্রতি বছর বর্ষার পানিতে ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় অনেকেই ধান চাষ করা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, বুড়িচং উপজেলায় প্রায় দুই লাখ ৯৯ হাজার লোকের বসবাস। এর মধ্যে ৪৭ হাজার ১৮১টি পরিবারের লোকজন সরাসরি কৃষিকাজের সাথে জড়িত রয়েছে। এ বছর ৯ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করা হয়েছে এবং ৩৬ হাজার ৫৮৭ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য যে নালা ও খাল রয়েছে সেগুলো খনন না করা হলে এই লক্ষ্যমাত্র অর্জন করা সম্ভব হবে না।
উপজেলার সদর ইউনিয়নের জরইন গ্রামের আইপিএস কৃষক ক্লাবের সভাপতি আবদুল জলিল ভূঞা জানান, তিনি বিগত ১০ বছর ধরে খালগুলো অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে উদ্ধারের জন্য আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। এ জন্য তিনি বিভিন্ন দফতরে আবেদন করেছেন। কিন্তু অদৃশ্য কারণে তার কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না। তিনি জানান, জরইন গ্রামের বিএস ৭২০ ও ৭১৮ দাগের খাস ভূমি ও খালের জায়গা একই গ্রামের জামাল হোসেন, হাজী মতিউর রহমান, সিরাজুল ইসলাম পেশকার, আবদুস সামাদ, মোসলেম উদ্দিন ও রফিকুল ইসলাম ভরাট করে দীর্ঘদিন যাবৎ দখল করে রেখেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার সদর ইউনিয়নের যদুপুর গ্রামের হাফিজিয়া মাদরাসা ও প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন খালটি ভরাট করে দোকানপাট নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে খালের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। বুড়িচং বাজারের পশ্চিম পাশের খালটিও ভরাট হয়ে প্রায় নালায় পরিণত হয়েছে। তা ছাড়া রাজাপুর ইউনিয়নের রাজাপুর পশ্চিম পাড়া এলাকায় খাল ভরাট করে জুজু মিয়া মেম্বার নামে একটি সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, উপজেলার পয়াতের জলায় ধান চাষ করে তাদের খাবারের অধিকাংশ চাহিদা পূরণ হয়ে থাকে। কিন্তু উক্ত জলার পানি নিষ্কাশনের জন্য যে খাল ও নালা রয়েছে তা ভরাট হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিপাত হলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে তাদের রোপণকৃত ফসল নষ্ট হয়ে যায়। এতে সারা বছর তাদের কষ্টে কাটে।
বুড়িচং উপজেলা সহকারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা শাহ আলম বলেন, অবৈধ ড্রেজারে মাধ্যমে মাটি কাটার ফলে মানুষ সহজে নালা-খালগুলো ভরাট করে ঘরবাড়ি নির্মাণ করছে। তা ছাড়া ফসলী জমিও ভরাট করে বাড়িঘর তৈরি করছে। উপজেলার বেশির ভাগ নালা ও খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টিপাত হলে পানি নিষ্কাশন হতে পারে না। এতে কৃষি জমিগুলো তলিয়ে যায়। এ বছরও এপ্রিল মাসের শেষের দিকে বৃষ্টিপাত হলে পাকা ধান তলিয়ে যাবে। এতে বোরো ফসলের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হবে।
বুড়িচং উপজেলার ইউনিয়ন ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার আটটি ইউনিয়নে ছোট-বড় প্রায় ২০৩টি খাল রয়েছে। তার মধ্যে রাজাপুর ইউনিয়নের ১১০টি, বাকশীমুল ইউনিয়নের তিনটি, বুড়িচং সদর ইউনিয়নের ২৬টি, পীরযাত্রাপুর ইউনিয়নের তিনটি, ষোলনল ইউনিয়নের পাঁচটি, ময়নামতি ইউনিয়নের নয়টি, ভারেল্লা ইউনিয়নের ১৬টি এবং মোকাম ইউনিয়নে মৌজাভিত্তিক ছোট-বড় প্রায় ৩০টি।
বুড়িচং সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ আলম বলেন, নালা ও খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় আমাদের শরীরের রক্তনালীগুলো যেন বন্ধ হয়ে গেছে। বৃষ্টিপাত হলে যে শুধু ধানের জমিগুলো তলিয়ে যাবে তা নয়, বুড়িচং উপজেলার বিভিন্ন অংশ পানির নিচে চলে যাবে। এতে কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়। ওই খালগুলো খননে কোনো বরাদ্দ পাওয়া গেলে উদ্যোগ নেয়া হবে। যাতে কৃষকদের দুঃখ কষ্ট লাঘব হয়।
বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইমরুল হাসান বলেন, উপজেলা পরিষদের মাসিক সমন্বয় কমিটির সভায় বুড়িচং সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ আলম ও ষোলনল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ার বিষয়টি উপস্থাপন করার পর উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি, কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা প্রকৌশলী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে তিনি সরেজমিন পরিদর্শন করেন। তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট অধিদফতরের কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে পরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এ দিকে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে বিএডিসি ক্ষুদ্র সেচ ইউনিট নামে একটি কার্যালয় থাকলেও তা সব সময় তালাবদ্ধ থাকে। এই কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী আছে না নাই, তা কেউ বলতে পারে না। শুধু সাইনবোর্ডটাই দেখতে পাওয়া যায়। ওই কার্যালয়ে দায়িত্বশীল কেউ না থাকায় খাল ও নালাগুলো খননের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.