অ্যামনেস্টির পরিবেশিত স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পাওয়া রোহিঙ্গা গ্রামের ছবি। বামের ছবিটি গত বছরের ২৫ অক্টোবরের আর ডানেরটি এ বছরের  ২৭ ফেব্রুয়ারির। রোহিঙ্গাদের ফেলে আসা গ্রামগুলোতে বুলডোজার চালিয়ে সেখানে এখন নির্মিত হচ্ছে মিয়ানমারের সেনাঘাঁটি :এএফপি
অ্যামনেস্টির পরিবেশিত স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পাওয়া রোহিঙ্গা গ্রামের ছবি। বামের ছবিটি গত বছরের ২৫ অক্টোবরের আর ডানেরটি এ বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারির। রোহিঙ্গাদের ফেলে আসা গ্রামগুলোতে বুলডোজার চালিয়ে সেখানে এখন নির্মিত হচ্ছে মিয়ানমারের সেনাঘাঁটি :এএফপি

রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে হচ্ছে সামরিক ঘাঁটি

অবশিষ্ট ঘরবাড়ি জ্বলছে
এএফপি ও বিবিসি

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর গণহত্যা, নির্যাতন ও জাতিগত নিধনের হাত থেকে বাঁচতে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পর তাদের পুড়িয়ে দেয়া বাড়িঘর ও ফেলে আসা জমিজমায় সামরিক ঘাঁটি বানাচ্ছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এখনো ধ্বংস না হওয়া ঘরবাড়ি নতুন করে জ্বালিয়ে দেয়ারও আলামত দেখতে পাওয়া গেছে। স্যাটেলাইট থেকে ধারণ করা ছবি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণ করে এ কথা জানিয়েছে ব্রিটেনভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।
গত বছরের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নির্মম দমন অভিযান শুরু করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। তাদের দমনাভিযানের মুখে ঘরবাড়ি ছেড়ে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। রোহিঙ্গাদের সাড়ে তিন শতাধিক গ্রামে আগুন লাগিয়ে সেগুলো ধ্বংস করে দেয় মিয়ানমারের বাহিনী। এরপরও যে গ্রামগুলো রক্ষা পেয়েছিল, যে ভবনগুলো আগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, সেগুলো সব বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এরপর দ্রুত সেসব এলাকায় ভবন ও রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে, সেখানে অন্তত তিনটি নতুন সামরিক ঘাঁটি নির্মাণাধীন রয়েছে। যে রোহিঙ্গা গ্রামবাসীরা মিয়ানমারে রয়ে গিয়েছিলেন তাদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে সেখান দিয়ে একটি ঘাঁটিতে যাওয়ার রাস্তা তৈরি করা হয়েছে।
এক বিবৃতিতে সংস্থাটির সঙ্কট মোকাবেলাবিষয়ক পরিচালক তিরানা হাসান অন্তত তিনটি সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ চলমান থাকার কথা জানিয়েছেন। একই সাথে চলছে স্থাপনা ও রাস্তাঘাট নির্মাণের কাজ। ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাত দিয়ে সামরিক সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট সোফরেপও একই অভিযোগ করেছিল। সে সময় তারা জানায়, পশ্চিম রাখাইন রাজ্যের বুচিডং শহরে রোহিঙ্গাদের ফেলে আসা ভূমি দখলে নিয়েছে সে দেশের সরকার। সেখানে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে দেশটির পুলিশ বাহিনী।
পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জমি অধিগ্রহণ করেছে মিয়ানমারের সরকার। দখলকৃত জমির মধ্যে রোহিঙ্গাদের গ্রামের পাশাপাশি তাদের বেশ কিছু পতিত জমিও রয়েছে। দখল করার পর পুলিশ সেখানে পতাকা টানিয়ে দিয়েছে। এসব স্থানে গবাদিপশু নিয়ে যেতেও গ্রামবাসীকে সতর্ক করে দিয়েছে পুলিশ। এই জানুয়ারি মাসে রোহিঙ্গাদের গ্রামের বহু বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যেসব গ্রাম থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতনে রোহিঙ্গারা পালিয়ে গেছেন সেসব গ্রামেই ওই রোহিঙ্গাদের ফেলে আসা জমি ও ভিটেবাড়ির ওপর ঘাঁটি তৈরি করছে সেনাবাহিনী।
জানুয়ারিতে অ্যামনেস্টির সবশেষ গবেষণায় রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বহু গ্রাম বুলডোজারে জ্বালিয়ে দেয়ার আলামত উঠে এসেছিল। ফেব্রুয়ারিতে সেনাবাহিনী অর্ধশতাধিক গ্রাম বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে বলে জানায় মার্কিন মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস। বলা হচ্ছিল, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক বাহিনীর নিধনযজ্ঞ আড়াল করতেই গ্রামগুলোতে বুলডোজার চালানো হচ্ছে। এইচআরডব্লিউর পক্ষ থেকে অপরাধের আলামতের সুরক্ষায় অবিলম্বে বুলডোজার ব্যবহার বন্ধের তাগিদ দেয়া হয়েছিল মিয়ানমারকে। একই মাসে ‘দ্য আরাকান প্রজেক্ট’ নামে সে দেশের স্থানীয় একটি মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থা একই ধরনের অভিযোগ তুলেছিল। তবে নতুন করে অ্যামনেস্টির দেয়া বিবৃতি থেকে জানা গেল, বুলডোজারে গ্রাম গুঁড়িয়ে দেয়ার সাথে সেনাঘাঁটিসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণেরও সম্পর্ক রয়েছে।
স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অন্তত তিনটি নিরাপত্তা ঘাঁটি নির্মাণের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছে। এগুলোর একটি উত্তর-রাখাইনে। অন্য দু’টি মংডু ও বুচিডংয়ে। সংস্থাটি ধারণা করছে, জানুয়ারি মাসে ঘাঁটিগুলোর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। তিরানা হাসান বলেন, ‘সমগ্র গ্রামে বুলডোজার চালানোর ঘটনা খুবই উদ্বেগের। যারা এসব অপরাধকর্মে জড়িত ভবিষ্যতে তাদের বিচারকে কঠিন করে তুলতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ মানবতাবিরোধী অপরাধের আলামত নষ্ট করছে।’ স্যাটেলাইট ইমেজে ডিসেম্বরে সহিংসতা থেমে যাওয়ার পরও নতুন করে চারটি মসজিদ ধ্বংস করে দেয়ার আলামত পেয়েছে অ্যামনেস্টি। একটি রোহিঙ্গা গ্রামে সদ্য ধ্বংস করা মসজিদের অবস্থানে পুলিশের একটি নিরাপত্তা চৌকি স্থাপন হতে দেখেছে সংস্থাটি।
তিরানা হাসান এই পরিস্থিতিকে সেনাবাহিনী দ্বারা ভূমি গ্রাস বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনীকে বিপুল জমি গ্রাস করতে দেখা গেছে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনকারী সে একই নিরাপত্তা বাহিনীর আবাস তৈরির জন্য নতুন ঘাঁটি স্থাপন করেছে। আর তা রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনকে আরো বেশি দুরাশায় পরিণত করে দিচ্ছে। কেবল তাদের বাড়িঘরই নষ্ট হয়নি, বরং নতুন এ নির্মাণ কাজের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারে আগে থেকে অমানবিক বৈষম্যের শিকার হয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য পুরনো বাস্তবতাকে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।’
মিয়ানমারের সরকার অ্যামনেস্টির অভিযোগ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেনি। অ্যামনেস্টির অভিযোগের বিষয়ে রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা সু চির তরফে কোনো মুখপাত্র অথবা সেনা কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মিয়ানমার বলে আসছে, নতুন করে রোহিঙ্গাদের জন্য ঘরবাড়ি বানাতেই গ্রামগুলোতে বুলডোজার ব্যবহার করা হয়েছে।
মিয়ানমারের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, যেসব রোহিঙ্গা ফিরে আসছেন তাদের জন্য নতুন বাসা নির্মাণের উদ্দেশ্যে গ্রামগুলো বুলডোজার দিয়ে ‘পরিষ্কার করা হচ্ছে’। রাখাইনে জাতিগত নির্মূল অভিযান চালানো হয়েছে এমন অভিযোগের পক্ষে ‘পরিষ্কার প্রমাণ’ হাজির করার জন্য জাতিসঙ্ঘ ও অন্যান্যের কাছে দাবি জানিয়েছে মিয়ানমার।
অ্যামনেস্টি বলেছে, রোহিঙ্গারা যে এলাকায় বসবাস করত তার ‘আকৃতিগত পরিবর্তন’ করে ফেলছে মিয়ানমার, সম্ভবত নিরাপত্তা বাহিনী ও রোহিঙ্গা নন এমন গ্রামবাসীকে জায়গা দিতে এমনটি করা হচ্ছে যেন রোহিঙ্গারা ফিরে আসতে না চায়। যেসব রোহিঙ্গা নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর হাতে নিহত হওয়া এড়াতে পেরেছে তারা ফিরে এসে সেই একই নিরাপত্তা বাহিনীর এত কাছে বসবাস করতে স্বস্তিবোধ করবে না, বিশেষ করে মানবাধিকার লঙ্ঘন করলেও যখন জবাবদিহি করতে হয় না এমন পরিস্থিতিতে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.