প্রশ্নফাঁস : মূল হোতারা বাইরেই থেকে গেল

মোহাম্মদ অংকন

প্রশ্নফাঁসের বেলায় বলা যায়Ñ ‘ঘরের পোষা বিড়াল’রা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। আবার এদের কারণে প্রশ্নফাঁসের বিষয়ে সরকারি অনুসন্ধানের প্রতিবেদনও প্রকাশ করা হচ্ছে না। মানুষকে প্রশ্নফাঁসের উৎস ও হোতাদের সম্পর্কে জানানো হচ্ছে না কেন? এমনকি আলোচিত হলেও প্রশ্নফাঁসের পরও অতীতে সরকারের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন না করার নজিরও আছে। জানা গেছে, প্রশ্নফাঁসের মূল উৎস সম্পর্কে সরকারি সংস্থা ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্তে কিছু ভিন্নতা রয়েছে।
প্রশ্নফাঁসের মতো জালিয়াতি রোধ করতে ১৯৮০ সালে আইন প্রণীত হয়েছে। পরে ১৯৯২ সালে আইনটি সংশোধনও করা হয়। আইনে বলা আছে, ‘প্রশ্নফাঁসের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির কমপক্ষে তিন থেকে দশ বছরের কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ডের শাস্তি হবে’। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, আইন প্রণয়নের ৩৭ বছর অতিক্রম হওয়ার পরও প্রশ্নফাঁসের অপরাধে এখনো কারো কোনো শাস্তি হয়নি। ফলে আইনকে লঙ্ঘন করে যেমন প্রশ্নফাঁস করছে, তেমনি আইনের প্রতি কোনো ভয়ভীতি দেখা যায় না। তথ্য মতে, ১৯৭৯ সাল থেকে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেটসহ (এসএসসি) পাবলিক ও অন্যান্য পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে আসছে যদিও সীমিতভাবে। তবে ২০১২ সালের পর থেকে অন্তত ৮২টি বিষয়ের প্রশ্নফাঁস হওয়ার অভিযোগ আছে। ২০১৫ সালে প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিগত চার বছরে বিভিন্ন পরীক্ষায় ৬৩টি বিষয়ের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। এটা দেশের জন্য যেমন লজ্জাজনক, তেমনি শিক্ষার মান কোনপর্যায়ে নেমে গেছেÑ সে বিষয়ে বলার অবকাশ রাখে না।
ফাঁকিবাজ ছাত্ররা প্রশ্নফাঁসের সুবিধাভোগী। বিনাপরিশ্রমে আপাতত ভালো ফলাফল করা যাচ্ছে, ভালো বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যাচ্ছে, ভালো সরকারি চাকরিও মিলতে পারে বৈ কি। দ্বিতীয়ত, অভিভাবকেরা সন্তানের ‘ভালো’র জন্য প্রশ্নফাঁসে উৎসাহী হচ্ছেন। কথা হলো, তারা কেমন বাবা-মা যারা জেনেশুনে অনৈতিক পথে সন্তানের সফলতা কামনা করেন! যেখানে পরিবার সন্তানকে সুশিক্ষা দেয়ার কথা, সেখানে বিপথগামী করছেন। তৃতীয়ত, নৈতিকতাবর্জিত শিক্ষকেরা বাড়তি টাকা কামানোর জন্য এর সাথে জড়িয়ে পড়ছেন। এসব শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কী শিক্ষা দেবেন? এ ছাড়া কিছু সাধারণ শিক্ষার্থী অন্যায়ভাবে উপার্জনের মতলবে ও কর্মসংস্থানের অভাবে বেকার যুবকেরা প্রশ্নফাঁসের সাথে জড়িয়ে পড়েছে; কিন্তু কথা হলোÑ পরীক্ষার কমপক্ষে দুই মাস আগে প্রশ্ন ছাপানো হয় এবং প্রশ্নের প্যাকেট সিলগালা করা থাকে। পরীক্ষা শুরু হওয়ার ঘণ্টা দুয়েক আগে কেন্দ্রে পৌঁছে প্রশ্নপত্র। তবুও প্রশ্নফাঁস হয়ে যায় কী করে? যদিও কিছু শিক্ষককে প্রশ্নফাঁসের জন্য চিহ্নিত করা গেছে, তবে মূল উৎস শিক্ষকেরা নন। কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের অসৎ কর্মচারী ও কিছু কর্মকর্তাও জড়িত। বলা চলে, সব মিলিয়ে একটি চক্র প্রশ্নফাঁসের বাণিজ্যে উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। তাই দেশ ও জাতির স্বার্থে প্রশ্নফাঁসচক্রের মূল হোতাদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। নতুবা যে হারে প্রশ্নফাঁস হওয়া শুরু হয়েছে, তাতে দেশে শিক্ষা ও মূল্যবোধ বলে কিছু থাকবে না বলে আশঙ্কা জাগে।
লেখক : শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.