রাজধানীর পল্লবীতে অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়া একটি বস্তি :নয়া দিগন্ত
রাজধানীর পল্লবীতে অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়া একটি বস্তি :নয়া দিগন্ত

মিরপুরে বস্তির ৪ হাজার ঘর পুড়ে ছাই

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর মিরপুরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই হয়েছে বস্তির চার হাজার ঘর। এ ঘটনায় দগ্ধ এক বৃদ্ধাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। এ ছাড়া বস্তির কয়েক হাজার বাসিন্দা অগ্নিকাণ্ডের ফলে নিঃস্ব হয়েছেন।
গত রোববার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টায় মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনে ইলিয়াস মোল্লা বস্তিতে এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ঘুমন্ত বস্তিবাসী টের পাওয়ার আগেই আগুনের লেলিহান শিখা লণ্ডভণ্ড করে দিতে থাকে সব কিছু। পরে ফায়ার সার্ভিসের ২১টি ইউনিট প্রায় ৪ ঘণ্টার চেষ্টায় গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ৭টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।
আগুন লাগার কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। এ ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা করা হয়েছে। তবে তিন দিক থেকে আগুন লাগায় বস্তিবাসীর অভিযোগÑ এটি পরিকল্পিত আগুন। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টায় বস্তির ঝিলপাড় বা ওয়াপদা অংশ থেকে আগুনের সূত্রপাত। আগুন লাগার পর মুহূর্তের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে গোটা বস্তিতে। বস্তির বেশির ভাগ লোকজন পোশাক কারখানায় কাজ করেন। তাই প্রায় সবার ঘরেই ঝুট এবং প্রচুর পরিমাণে দাহ্য বস্তু ছিল। ফলে আগুন খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে ফায়ার সার্ভিসের আটটি ইউনিট কাজ শুরু করলেও আগুনের তীব্রতা বেশি হওয়ায় পরে তাদের সাথে আরো পাঁচটি ইউনিট যোগ দেয়। পরে ভোর সাড়ে ৫টায় আরো তিনটি ইউনিট যোগ দেয় তাদের সাথে। সর্বশেষ গতকাল সোমবার ভোর ৬টায় আরো পাঁচটি ইউনিটসহ মোট ২১টি ইউনিট চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
বস্তির বাসিন্দা পোশাকশ্রমিক আঁখি আক্তার জানান, রাত সাড়ে ৩টায় আগুন আগুন চিৎকার শুনে তার ঘুম ভাঙে। চার দিকে ধোঁয়া উড়ছিল। কিছু না ভেবেই এক বছরের শিশুসন্তানকে কোলে নিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে যান। দূর থেকে তাকিয়ে শুধু পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখেন। কিছুই করার ছিল না তার। আগুন নিভে যাওয়ার পর নিজের ঘরের সামনে এসে দেখেন তার সব কিছু পুড়ে গেছে। পুড়ে যাওয়া ঘরের কয়লার স্তূপের মধ্য থেকে ধোঁয়া উড়ছিল। তার মতো প্রায় সবাই জীবন বাঁচাতে ছুটে গেছেন নিরাপদ স্থানে। চোখের সামনে সব ছাই হতে দেখেও ছিলেন নিরুপায়।
এ দিকে, এ ঘটনায় জামিলা খাতুন (৬৫) নামে এ বৃদ্ধাকে গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় ঢামেকে ভর্তি করা হয়েছে। দগ্ধ জামিলা নাতি মজনুকে (১১) নিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি করেন এবং ওই বস্তির একটি ঘরে ভাড়া থাকেন। রোববার রাতে মানুষের চিৎকারে ঘুম ভাঙলে দেখেন তার ঘরে আগুন জ্বলছে। পরে বের হতে গিয়ে দ্বগ্ধ হন তিনি। ঢামেক বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন সামন্ত লাল সেন জানান, আগুনে জামিলার ৬৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক।
অন্য দিকে তিন দিক থেকে যেভাবে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে আগুন লাগানো হয়েছে বলে সন্দেহ বস্তির বাসিন্দাদের। স্থানীয় দোকানি রুমা জানান, মানুষের চিৎকারে ঘুম ভাঙে। ঘর থেকে বের হয়েই দেখি তিন দিকে ধোঁয়া। কেউ আগুন না লাগালে আগুন এভাবে ছড়িয়ে পড়ার কথা নয়। কারণ আগুন লাগার কিছুক্ষণের মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। রুমার মতো একই অভিযোগ অন্যদের। তাদের দাবি নাশকতা করতেই এই ঘটনা।
স্থানীয় সূত্র জানায়, মিরপুর ১২ নম্বরে প্রায় ৭০ বিঘা জমির ওপর চারটি বস্তি ছিল। এগুলো হলোÑ হারুনাবাদ, কবির মোল্লা, সাত্তার মোল্লা ও নাগর আলী মাতব্বর বস্তি। মূলত এমপি ইলিয়াস মোল্লার বাবা-চাচাদের জমিতে ৭৬ সাল থেকে এই বস্তি গড়ে ওঠে। ৩৫ বছরের পুরনো এ চার বস্তিতে পাঁচ হাজার ঘর ছিল। এখানে ২৫ হাজারের বেশি মানুষ বাস করে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলী মোল্লা ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, যারা আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। আপাতত আমার একটি নির্মাণাধীন মার্কেটের সাতটি ফ্লোরে যাদের ঘর পুড়েছে তাদের থাকার ব্যবস্থা করেছি। যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, ততক্ষণ তারা এখানে থাকবে। আমি তাদের খাবারের ব্যবস্থাও করব। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নাশকতা নয়, দুর্ঘটনা হতে পারে।
ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) শাহিদুজ্জামান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা তৈরিতে আমাদের কর্মীরা কাজ করছেন। তালিকার পর প্রত্যেক পরিবারকে ৩০ কেজি করে চাল দেয়া হবে।
ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক দেবাশীষ বর্ধন বলেন, ২১টি ইউনিট প্রায় ৪ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুন লাগার সাথে সাথে ফায়ার সার্ভিসকে জানানো হলে এত ঘর হয়তো পুড়ত না। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও অগ্নিকাণ্ডের কারণ জানতে তার নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.