বাড়িতেই টর্চার সেল

দুই ভিকটিম উদ্ধার : মূল হোতাসহ গ্রেফতার ১০
নিজস্ব প্রতিবেদক

কৌশলে রাস্তা থেকে ধরা হয় মক্কেল। কখনো অচেনা পথ চিনিয়ে দেয়ার কথা বলে, কখনো বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে সাদা মাইক্রো বাসে তুলে নিয়ে যায় ওরা। তার পর অস্ত্রের সাহায্যে জিম্মি করে নিয়ে যাওয়া হয় নিজ বাড়ির টর্চার সেলে। সেখানে নিয়ে ভিকটিমের হাত, পা ও চোখ বেঁধে পা উঁচু করে ঝুলিয়ে নির্যাতন করা হয়। পরে ভিকটিমের বাঁচাও বাঁচাও আকুতি আর চিৎকার মোবাইল ফোনে শুনিয়ে স্বজনদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। এ চক্রের মূল হোতা মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের সেলিম মোল্লা। তিনি গ্রামের একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি। সমাজে ভদ্রবেশী আচরণের অন্তরালে সঙ্ঘবদ্ধ অপহরণকারী একটি চক্রের লিডার। এলাকার উঠতি বয়সের বখাটে ছেলেদের বিশাল অঙ্কের টাকার লোভ দেখিয়ে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থান থেকে বিত্তবান ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে অপহরণ করে নিয়ে যান তার বাড়িতে। তার তিনতলা বাড়ির একটি কক্ষে রয়েছে টর্চার সেল। সেখানে নিয়ে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করে এ চক্রটি বলে জানিয়েছে র্যাব। অপহরণকারী চক্রের মূল হোতা সেলিম মোল্লাসহ ১০ জনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। গ্রেফতারকৃত অন্যরা হলেনÑ রাজিবুল হাসান রাজীব (২৭), মোশারফ হোসেন (৪৭), নিরব আহম্মেদ ওরফে টিটু (২৯), আবদুর রাজ্জাক (৩৫), তারেক হোসেন (৩১), আবুল বাশার বিশ্বাস (৩৩), রুহুল আমিন (৩৫), তারেক হোসেন পুলক (২৬) ও তুহিন বিশ্বাস (৩০)। এ সময় দুই ভিকটিমকে হাত, পা ও চোখ বাঁধা অবস্থায় সেলিম মোল্লার বাড়ি মানিকগঞ্জের হরিরামপুর কালোয় গ্রাম থেকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ছয়টি বিদেশী পিস্তল, ৯টি ম্যাগাজিন, ৩৬ রাউন্ড গুলি, ৭টি চাইনিজ কুড়াল ও ৪টি চাপাতি এবং মুক্তিপণের দুই লাখ ৮৫ হাজার টাকা জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে র্যাব। গতকাল র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।
র্যাব জানায়, গত ৯ মার্চ শুক্রবার ব্যবসায়ী জাফর ইকবাল (৪০) ও মিরাজ গাজী (৩৫) ব্যবসায়িক কাজে নিজ বাসা থেকে বের হন। বেলা ১১টার পর থেকে তাদের মোবাইল বন্ধ পান স্বজনেরা। পরে তাদের মোবাইল ফোন থেকে ৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। এ ব্যাপারে র্যাব-২ এ একটি অভিযোগ করেন ভিকটিম জাফরের ভাগ্নে হাফিজুর রহমান সবুজ।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বলেন, বিভিন্ন সময়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে আমরা দেখতে পাই যে, মানুষ অপহৃত হচ্ছে। অপহরণে প্রক্রিয়া হচ্ছে হঠাৎ মাইক্রো বাসে তুলে নিয়ে অস্ত্রের সাহায্যে জিম্মি করে ফেলে অপহরণকারীরা। এরপর ভিকটিমের সেল ফোন থেকে তার স্বজনদের ফোন দিয়ে মুক্তিপণ চাওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে ভিকটিমকে নির্যাতন করা হয়। কোনো কোনো সময় আবার ধরা পড়ার আশঙ্কায় ভিকটিমকে হত্যা করা হয়ে থাকে।
তিনি জানান, এই দুই ব্যবসায়ীর ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ আসার পর কাজ শুরু করে র্যাব। র্যাব জানতে পারে এরই মধ্যে ভিকটিম মিরাজের পক্ষ থেকে মুক্তিপণ হিসেবে রাজিবুল হাসান রাজীবকে ব্যাংকের মাধ্যমে আড়াই লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। ওই টাকা কোন ব্যাংক থেকে উত্তোলিত হতে পারে এ ব্যাপারে নজরদারি করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল ভোরে রাজীবকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে মানিকগঞ্জের ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আরও ৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
তিনি জানান, মূল হোতা সেলিম মোল্লার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে বিপুল আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়। তার তিনতলা বাড়ির একটি কক্ষে ভিকটিমদের নির্যাতন করার জন্য রাখা হয়েছিল।
মুফতি মাহমুদ খান বলেন, আমাদের আভিযানিক দল দেখেছে সেখানে টর্চার করার মতো একটা প্লেস। তিন তলা ওই বাড়িতে সেলিমের নিজস্ব লোকজন ছাড়া আর কেউ বাস করে না। যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের সবাইকে ওই বাড়ির বিভিন্ন কক্ষ থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা লেনদেনের জন্য সেলিমের ছেলে রাজীবের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হতো। আমরা বিষয়টি নিয়ে আরও তদন্ত করছি। এর সাথে অন্য আরও কেউ জড়িত আছে কি না তা পরে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যাবে বলে জানান মুফতি মাহমুদ খান।
ভিকটিমরা জানান, তারা ব্যক্তিগত কাজে বাসা থেকে ফার্মগেটে আসার পর কয়েকজন তাদেরকে ধানমন্ডি কোন দিক দিয়ে যেতে হবে জিজ্ঞাসা করে তাৎক্ষণিকভাবে একটি সাদা মাইক্রো বাসে জোর করে তুলে চোখ, মুখ বেঁধে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। পরে তাদেরকে আস্তানায় নিয়ে মারধর করা শুরু করে এবং মুক্তিপণের টাকা দাবি করে। এত টাকা কোথায় পাবো বলে অনুনয়-বিনয় করলে তখন থেকে অপহরণকারীরা প্রথমে হাত, পা ও চোখ বেঁধে পা উঁচু করে ঝুলিয়ে তাদের টর্চার শুরু করে। তখন তারা নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে পরিবারের সাথে কথা বলে টাকা আনার ব্যবস্থা করেন।
র্যাব জানায়, অপহরণকারীদের চাপে জাফর ইকবাল তার স্ত্রীর সাথে মোবাইলে কথা বললে তার বাসার ড্রয়ারে থাকা চেকবই ও দুই লাখ ৮৫ হাজার টাকা নিয়ে মানিকগঞ্জ নিয়ে আসার জন্য বললে তার বোন মানিকগঞ্জ গিয়ে অপহরণকারী সদস্যদের একজনকে সেই টাকা ও চেকবই দিয়ে আসেন। এ ছাড়া মিরাজ তার স্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করে দ্রুত পাঁচ লাখ টাকা পাঠাতে বলেন এবং একটি অ্যাকাউন্ট নম্বর দেন। পরে তার স্ত্রী অনেক কষ্ট করে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা জোগাড় করে রাজীবের অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেন।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.