খালেদা জিয়ার জামিন

হাবিবুর রহমান

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে চার মাসের জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের হাইকোর্ট বেঞ্চ নি¤œ আদালত থেকে মামলার নথি আসার পর তা দেখে খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন মঞ্জুর করে গতকাল সোমবার তাকে চার মাসের জামিন দেন।
খালেদা জিয়াকে চার মাসের জামিন দিয়ে হাইকোর্ট এ সময়ের মধ্যে আপিল শুনানির জন্য সংশ্লিষ্ট শাখাকে পেপারবুক প্রস্তুত করতে নির্দেশ দিয়েছেন। পেপারবুক প্রস্তুত হয়ে গেলে যেকোনো পক্ষ শুনানির জন্য আপিল উপস্থাপন করতে পারবে।
চারটি যুক্তি আমলে নিয়ে খালেদা জিয়ার জামিন মঞ্জুরের আদেশ দেয়া হয়। আদালত বলেন, আদেশ দেয়ার সময় আমরা যেসব বিষয় বিবেচনা করেছি সেগুলো হলোÑ এক. সাজার পরিমাণ (বিচারিক আদালতে তাকে যে স্বল্পমেয়াদের সাজা দেয়া হয়েছে)। দুই. মামলাটির বিচারিক আদালতের নথি এসেছে এবং এটি আপিল শুনানির জন্য পেপারবুক তৈরি হয়নি। তিন. বিচারিক আদালতে মামলা চলাকালে তিনি নিয়মিত আদালতে হাজিরা দিয়েছেন, তিনি জামিনে ছিলেন এবং জামিনের অপব্যবহার করেননি এবং চার. তার বয়স এবং শারীরিক অসুস্থতার বিষয়। তিনি ৭৩ বছর বয়স্ক একজন নারী এবং দীর্ঘ দিন ধরে নানা রোগে আক্রান্ত। এসব বিবেচনা করে তাকে চার মাসের জামিন দেয়া হলো।
আদেশের পর খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেন, হাইকোর্ট খালেদা জিয়াকে জামিন দিয়েছেন। সরকার আর কোনো বাধা সৃষ্টি না করলে তিনি মুক্তি পাবেন। তার কারামুক্তিতে কোনো বাধা নেই। হাইকোর্টের জামিন আদেশের পর খালেদা জিয়ার কারামুক্তির পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে জয়নুল আবেদীন বলেন, এখন হাইকোর্টের লিখিত রায় বের হবে। হাইকোর্টের এ আদেশের কপি সাজা হওয়া নি¤œ আদালতে যাবে। সেখানে বেল বন্ড হবে। ওই আদেশ কারাগারে পৌঁছানোর পর খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন।
অন্য দিকে আদেশের পরপরই অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম দুই দিনের জন্য জামিনের আদেশ স্থগিত রাখার আবেদন জানান। তবে আদালত তা নামঞ্জুর করেন। হাইকোর্টের আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল সাংবাদিকদের বলেন, তারা আগামীকালই এ জামিন আদেশ স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতির আদালতে আবেদন করবেন।
অপর দিকে দুদকের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান বলেন, তারা এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন এবং খালেদা জিয়ার জামিন স্থগিত চাইবেন।
শুনানিতে যা বললেন আদালত ও আইনজীবীরা : জামিন আদেশের আগে আদালত উভয় পক্ষের শুনানি গ্রহণ করেন। শুরুতেই বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীনের কাছে জানতে চান, তাদের কিছু বলার আছে কি না। তখন তিনি বলেন, জামিন আবেদনের শুনানি তো শেষ হয়েছে। আমরা আদেশের জন্য অপেক্ষা করছি।
জবাবে আদালত বলেন, আপনারা তো অনেক বই নিয়ে আসলেন; কিছু বলতে চাইলে বলতে পারেন।
এ সময় আদালত অ্যাটর্নি জেনারেলকে বলেন, মি. অ্যাটর্নি, আপনি কিছু বলবেন?
জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল দাঁড়িয়ে বলেন, মাই লর্ড, এটি একটি সেনসেশন (স্পর্শকাতর) মামলা। এ মামলার নথি ইতোমধ্যে এসে গেছে। তাই, নথি দেখে শুনানির পর জামিন আদেশ দেয়া হোক।
আদালত বলেন, ‘কী ধরনের সেনসেশন মামলা?
জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এটি একটি দুর্নীতি মামলা। এখানে এতিমের টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে আত্মসাৎ হয়েছে। সাবেক নথিতে সব পরিষ্কার, কিভাবে টাকা আত্মসাতের জন্য উত্তোলন করা হয়েছে। তাই আমি বলব, এ মামলার আদেশ আরো দুই দিন পর দেয়া হোক। তিনি বলেন, বিচারিক আদালত খালেদা জিয়ার বয়স ও সামাজিক মর্যাদা বিবেচনা করে তাকে ৫ বছর কারাদণ্ড দিয়েছেন। যেহেতু নি¤œ আদালতের নথি এসেছে সেহেতু আপিল শুনানির জন্য পেপারবুক তৈরির নির্দেশ দেন।
এ সময় আইনজীবী জয়নুল আবেদীন বলেন, মাই লর্ড, দুদকের (দুর্নীতি দমন কমিশন) আইনজীবী জামিন না দেয়ার জন্য ইতঃপূর্বে দু’টি যুক্তি দিয়েছিলেন। আমরা এসব মামলার নথি এনেছি। এখানে দেখা গেছে, ওই সব মামলায় আসামিদের হাইকোর্টের একক বেঞ্চ জামিন দিয়েছিলেন।
এই বলে তিনি আদালতে দু’টি মামলার নথি বাড়িয়ে দেন।
এ সময় খালেদা জিয়ার আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী আদালতে বলেন, আগে খালেদা জিয়া অসুস্থ ছিলেন। এই অসুস্থতার কারণে তিনি হাঁটাচলা করতে পারেননি।
এ সময় আদালত দুদকের আইনজীবীকে বলেন, ‘উনাকে পাঁচ বছর সাজা দেয়া হয়েছে। আপনারা কি রায়ের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন?’
জবাবে খুরশিদ আলম খান বলেন, আমরা রায়ে অসন্তুষ্ট।
আদালত বলেন, সোজা কথায় বলেন, আপনারা রায়ের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন কি না?
জবাবে আইনজীবী বলেন, এখনো নিইনি, তবে আমরা রায়ে সন্তুষ্ট না।
খুরশিদ আলম খান বলেন, সাজার পরিমাণ কম এ বিবেচনায় জামিন দেয়া উচিত হবে না। এটা জামিন দেয়ার গ্রাউন্ড হতে পারে না। তারা শারীরিক অসুস্থতার বিষয়ে কোনো মেডিক্যাল সার্টিফিকেট দেখাননি। এ সময় আদালত বলেন, এ শুনানি তো আপনি আগেও করেছেন। নতুন কী আছে সেটা বলুন।
এ সময় আদালত অ্যাটর্নি জেনারেলকে বলেন, উনি তো (খালেদা জিয়া) ফিজিক্যালি ফিট না।
জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সাবেক একজন প্রেসিডেন্টও (হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ) সাড়ে তিন বছর জেলে ছিলেন।
আদালত বলেন, ওই সময় উনার বয়স কত ছিল?
জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘উনার বয়স ৬৫ কিংবা ৬৬ হবে।
এ সময় আদালত বলেন, উনি তো অনেক সামর্থ্যবান ছিলেন। উনি পরে কারাগার থেকে বের হয়ে বিয়ে করলেন। একটি পুত্রসন্তানও হয়েছে শুনেছি।
জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘উনি সামর্থ্যবান ছিলেন। খালেদা জিয়াও সামর্থ্যবান রয়েছেন।’
এ সময় আদালত বলেন, যাই হোক আমরা আদেশ দিচ্ছি।
এরপর আদালত বলেন, আমরা আইনজীবীদের শুনানিগুলো লিখিত আদেশে দিয়ে দেবো। এখানে শুধু আদেশ দিচ্ছি।
পরে আদালত চারটি যুক্তি দেখিয়ে খালেদা জিয়ার চার মাসের জামিন আদেশ দেন এবং চার মাসের মধ্যে পেপারবুক তৈরির জন্য হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখাকে নির্দেশ দেন।
এ সময় বিচারকক্ষের দরজায় অবস্থান করা আইনজীবীরা আনন্দ-উল্লাস প্রকাশ করতে থাকেন। এ ছাড়া বিচারকক্ষের বাইরে এসে আইনজীবী ও নেতাকর্মীরা আনন্দমিছিল করেন।
এ সময় দুর্নীতি মামলায় সাত বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে হাইকোর্টের একক বেঞ্চে জামিন দেয়ার বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি জয়নুল আবেদীন। এ ছাড়া তিনি দুর্নীতি মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার নজির তুলে ধরেন। এরপর আদালত খালেদা জিয়ার জামিনের আদেশ দেন।
জামিনের আদেশে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী আবদুর রেজাক খান। তিনি বলেন, বিচারিক নিয়মে জামিন হওয়ায় তারা সন্তুষ্ট।
হাইকোর্টের জামিন আদেশের পরপরই আদালত কক্ষে অবস্থানরত কিছু আইনজীবী আনন্দ প্রকাশ করেন। এ সময় আদালতের কার্যক্রমে কিছুটা বিঘœ সৃষ্টি হয়। এ সময় সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি জয়নুল আবেদীন আইনজীবীদের শান্ত করেন। আদেশের পর সুপ্রিম কোর্ট এবং আইনজীবী সমিতি কার্যালয়ের সামনে তারা সমবেত হয়ে উল্লাস প্রকাশ করেন। খালেদা জিয়ার জামিনের রায় উপলক্ষে আইনজীবীদের পাশাপাশি বিএনপির অনেক নেতাকর্মীও আদালতে আসেন। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়া হয়।
খালেদা জিয়ার জামিন আদেশের আগে বেলা ১টা থেকে আদালতে কয়েক শ’ আইনজীবী, বিএনপির শীর্ষ নেতা এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা উপস্থিত হন। রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের ভিড়ে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে বিচারকক্ষ। এক পাশে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, অপর পাশে খালেদা জিয়ার কয়েক শ’ আইনজীবী কক্ষে উপস্থিত হন। তবে আদালত এজলাসে ওঠার আগেই একজন পেশকার আইনজীবীদের ডেকে সতর্ক করে দেন। আদালত বলেছেন, আপনারা হইচই করবেন না। এরপর আইনজীবী জয়নুল আবেদীন সহকর্মীদের কোনো শব্দ না করার জন্য সতর্ক করে দেন। এ সময় বেলা ২টা ১৪ মিনিটে এজলাসে আসেন বিচারপতিরা। তখন বিচারকক্ষে থাকা কয়েক শ’ আইনজীবী পিনপতন নীরবতা বজায় রেখে আদেশের অপেক্ষায় থাকেন।
খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের মধ্যে আদালতে উপস্থিত ছিলেন মওদুদ আহমদ, খন্দকার মাহবুব হোসেন, আমিনুল হক, রফিকুল ইসলাম মিয়া, এ জে মোহাম্মদ আলী, আবদুর রেজাক খান, মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন, নিতাই রায় চৌধুরী, মাহবুব উদ্দিন খোকন, সানাউল্লাহ মিয়া, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, বদরুদ্দোজা বাদল, আমিনুল ইসলাম, কায়সার কামাল, নওশাদ জমির, রাগীব রউফ চৌধুরী, জাকির হোসেন ভূঁইয়া, সালমা সুলতানা প্রমুখ।
বিএনপি নেতাদের মধ্যে আদালতে উপস্থিত ছিলেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, নজরুল ইসলাম খান, আবদুল আউয়াল মিন্টু প্রমুখ।
এর আগে রোববার খালেদা জিয়ার জামিনের বিষয়ে আদেশের দিন ধার্য থাকলেও নি¤œ আদালত থেকে নথি না আসায় তারিখ পিছিয়ে গতকাল বেলা ২টায় আদেশের জন্য ধার্য করা হয়। তবে রোববার দুপুর ১২টা ৫৪ মিনিটে পুলিশ পাহারায় বড় একটি ট্রাংকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার নি¤œ আদালতের নথি হাইকোর্টে আসে। পাঁচ হাজার ৩৭৩ পৃষ্ঠার নথি হাইকোর্টে আনা হয়। হাইকোর্টের আদান-প্রদান শাখার কর্মকর্তারা নথি গ্রহণ করেন।
গত বৃহস্পতিবার খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা জামিন আবেদনের বিষয়টি আদালতের নজরে এনে বলেছিলেন, বিচারিক আদালত থেকে ১৫ দিনের মধ্যে নথি আসার কথা, সেই সময় শেষ হয়ে গেছে। তারা জামিনের আদেশ দেয়ার আবেদন জানান। সে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই দিন আদালত রোববার জামিন আবেদনের আদেশের জন্য কার্যতালিকায় রাখার আদেশ দেন।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি নি¤œ আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার আপিল আবেদন শুনানির জন্য গ্রহণ করেন হাইকোর্ট। এ ছাড়া খালেদা জিয়ার জরিমানা স্থগিত করে বিচারিক আদালতের নথি ১৫ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে পাঠানোর আদেশ দেয়া হয়। এরপর ২৫ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার জামিন আবেদনের শুনানি শেষে বিচারিক আদালতের নথি পৌঁছার পর জামিন বিষয়ে আদেশের জন্য সময় নির্ধারণ করেন হাইকোর্ট। এর আগে ২০ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় নি¤œ আদালতের সাজার রায়ের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার খালাস চেয়ে তার আইনজীবীরা হাইকোর্টে আপিল দায়ের করেন।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি বেগম খালেদা জিয়াকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ আদালত এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার পরপরই বেগম খালেদা জিয়াকে আদালত থেকে গ্রেফতার করে পুরান ঢাকার সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ছাড়া এ মামলায় বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। এ ছাড়া মামলায় অপর চার আসামি মাগুরার সাবেক এমপি কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, সাবেক মুখ্যসচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমানকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। তাদেরকে ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার টাকা করে জরিমানাও করা হয়েছে।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.