নেপালে ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণের সময় বিধ্বস্ত বিমানটি উদ্ধারের কাজ চলছে :এএফপি
নেপালে ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণের সময় বিধ্বস্ত বিমানটি উদ্ধারের কাজ চলছে :এএফপি

ইউএস বাংলার বিমান কাঠমান্ডুতে বিধ্বস্ত

অর্ধশতাধিক নিহত
বিশেষ সংবাদদাতা

ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি যাত্রীবাহী বিমান গতকাল সোমবার দুপুরে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত হলে অর্ধশতাধিক আরোহী নিহত হয়েছেন। যাত্রীদের মধ্যে ৩৩ জন নেপালি ও ৩২ জন বাংলাদেশী। অন্যরা চীন ও মালদ্বীপের নাগরিক। স্থানীয় সময় বেলা ২টা ১৮ মিনিটে বিমানটি কাঠমান্ডু বিমানবন্দরে অবতরণের পরপরই বিমানটিতে আগুন ধরে যায় বলে স্থানীয় সূত্র উদ্ধৃত করে বিভিন্ন বার্তাসংস্থা খবর দিয়েছে। কানাডায় নির্মিত ড্যাশ-৮ কিউ ৪০০ মডেলের বিমানটি ঢাকা থেকে চারজন পাইলট ও ক্রুসহ ৭১ জন আরোহী নিয়ে উড্ডয়ন করে। নেপাল পুলিশের কর্মকর্তা মনোজ নৃপেন ৪০ জন নিহতের কথা জানিয়েছেন। নেপাল সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা ৫০ জনের বেশি প্রাণহানির কথা জানিয়েছেন। বিমানটির ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ৩১টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। হাসপাতালে নেয়ার পর মারা গেছেন আরো ৯ জন। হতাহতদের প্রায় সবাই আগুনে পুড়ে মারা যান। দুর্ঘটনার পরপরই ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ ঘোষণা করা হয়। রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিমান দুর্ঘটনায় হতাহতদের জন্য শোক প্রকাশ করেছেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ ইমরান জানান, ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ভুল সঙ্কেতের কারণেই বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, পাইলটের সাথে কন্ট্রোল টাওয়ারের কথোপকথনের রেকর্ড তাদের কাছে আছে। ওই কথোপকথনে পরিষ্কার যে বিমানবন্দর থেকে পাইলটকে ভুল সঙ্কেত দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, তাদের কাছে আটজন নিহত হওয়ার নিশ্চিত তথ্য রয়েছে। ১৬ জন আহত হওয়ার খবর তারা জেনেছেন। দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট বিমানটিতে আরোহীদের মধ্যে ৩৭ জন পুরুষ ২৭ জন নারী এবং দু’টি শিশু ছিল। এর মধ্যে একই পরিবারের তিনজন রয়েছেন।
বিভিন্ন বার্তা সংস্থা জানায় নেপাল বেসামরিক বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষের মহাপরিচালক সানজিব গৌতম জানিয়েছেন, দুর্ঘটনাকবলিত বিমানের পাইলটকে বিমানবন্দরের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে রানওয়েতে অবতরণের অনুমতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি উত্তর অংশ থেকে অবতরণের চেষ্টা করেন এ সময় হঠাৎ বিমানটিতে আগুন ধরে যায়। পরে রানওয়ের পাশে একটি ফাঁকা জায়গায় তা আছড়ে পড়ে। বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ একজন যাত্রীর উদ্ধৃতি দিয়ে বিবিসি জানায়, অবতরণের পরপরই বিমানটি কাঁপছিল। এরপরই এটিতে আগুন ধরে যায়। ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুর্ঘটনার পরই সব বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণ বন্ধ করে দেয়া হয়। অপেক্ষমাণ বিমানগুলোকে অন্য বিমানবন্দরে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ জানায়, দুর্ঘটনাকবলিত বিমানটি দুপুর ১২টা ৫১ মিনিটে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কাঠমান্ডুর উদ্দেশে ছেড়ে যায়। বাংলাদেশ সময় ৩টা ৫ মিনিটে এটি বিধ্বস্ত হয়। হতাহতের বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার পর নিয়মানুযায়ী সব জানানো হবে।
এ দিকে কাঠমান্ডু পোস্ট, হিমালয়ান টাইমসসহ বেশ কয়েকটি পত্রিকা জানিয়েছে, বিমানটি ঢাকা থেকে উড্ডয়নের সময় সব কিছুই ঠিক ছিল। কিন্তু কাঠমান্ডু বিমানবন্দরে অবতরণের সময় তা প্রবলভাবে কেঁপে ওঠে।
দুর্ঘটনার পরপরই দমকল বাহিনী আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। পরে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। সেনাবাহিনী ও দমকল কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। এরপর উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। উদ্ধারকৃতদের কাঠমান্ডু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ পাঁচটি হাসপাতালে পাঠানো হয়। বিমানবন্দরের মহাব্যবস্থাপক রাজকুমার ছেতরি জানান, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল থেকে পাইলটকে ২ নম্বর রানওয়ের দক্ষিণ দিক থেকে অবতরণের কথা বলা হয়েছিল। পাইলট তখন জানালেন যে তিনি রানওয়ের উত্তর দিক থেকে অবতরণ করতে চান। তিনি সবকিছু ঠিকঠাক আছে বলে জানান।
ত্রিভুবন বিমানবন্দরে নিয়মিত ফাইট নিয়ে যান এমন একজন পাইলট নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, ‘যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, বরং পাইলটের মনোসংযোগের অভাবে বিমানটি দুর্ঘটনায় পড়ে থাকতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘বিমানটি ত্রিভুবন বিমানবন্দরে দক্ষিণ দিকের রানওয়ে ০২ দিয়ে নামার কথা। কিন্তু এ রানওয়ে দিয়ে নামতে সমস্যা হওয়ায় তিনি উত্তর দিক দিয়ে নামতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়েন। তিনি মনে করেন বিমানটি ঘুরে যে সার্কেল তৈরি করতে হয় সেটি করতে গিয়ে রানওয়ের সাথে সংযোগে ব্যর্থ হন পাইলট। সম্ভবত এ কারণে বিমানটি দুর্ঘটনায় পড়ে।
দুর্ঘটনার পরপরই নেপালের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের পদস্থ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ দিকে দুর্ঘটনার পর ওই বিমানে বাংলাদেশী আরোহীদের স্বজনেরা ইউএস বাংলার অফিসে ছুটে যান। তারা নিখোঁজ আত্মীয়স্বজনের সর্বশেষ অবস্থা জানতে চান। অনেকে এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন। ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স ২০১৪ সালের ১৭ জুলাই ‘ফাই ফাস্ট ফাই সেফ’ স্লোগান নিয়ে যাত্রা শুরু করে। সাড়ে তিন বছরে বিমান সংস্থাটি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে ৩৭ হাজার ফাইট পরিচালনা করেছে। যাত্রা শুরুর পর ৯৮.৭ শতাংশ অনটাইম ফাইট পরিচালনার রেকর্ড রয়েছে তাদের। বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ সব গন্তব্যসহ আন্তর্জাতিক সাতটি রুটে তাদের বিমান চলাচল করে। আগামী ৩ এপ্রিল চীনের গুয়ানজুতে ইউএস বাংলার ফাইট পরিচালনার কথা রয়েছে।
বিধ্বস্ত বিমানের পাইলট ক্যাপ্টেন আবেদ সুলতান জীবিত আছেন উল্লেখ করে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পাইলট আবেদ দক্ষ ও অভিজ্ঞ। পাঁচ হাজার ঘণ্টারও বেশি ফাই করার অভিজ্ঞতা তার রয়েছে। তিনি বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা। এর আগে তিনি বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউনাইটেডে কর্মরত ছিলেন। বিধ্বস্ত বিমানের ক্রু ছিলেন খাজা ও নাবিলা।
ইউএস বাংলার সংবাদ সম্মেলন
এ দিকে গত রাত ১০টায় সংবাদ সম্মেলনে ইউএস বাংলার সিইও ইমরান আসিফ বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হয়েছি যে ১৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। যারা নেপালের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে। ১৯ জনের নাম হচ্ছে : ইমরানা কবির হাসি, পিঞ্জি ধামী, সামিরা বেজাংকার, কবির হোসেন, মেহেদী হাসান, রেজওয়ানা আবদুল্লাহ, সোহারনা সাইয়িদা কামরুন্নাহার, শাহরিন আহমেদ, মো: শাহিন ব্যাপারী, কিশোর ত্রিপাতী, হারি প্রসাদ সুবেদী, দায়রাম তামরাকার, কেশন পান্ডে, বাসন্ত বহুড়া, রণজিৎ, বিনোদরাজ পডুয়াল, সানাম সাকয়া, ডিনেস হুমাগেইন, মো: রেজওয়ানুল হক।
ইউএস বাংলার সিইও আসিফ আরো বলেন, আমরা সব সময় বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে খোঁজ রাখছি। ইতোমধ্যে আমাদের ইউএস বাংলার ক্যাপ্টেন লুৎফর রহমান নেপাল পৌঁছে গেছেন। আমরা, সিভিল এভিয়েশন অথরিটি ও মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি প্রতিনিধিদল কাল সকালে যাবো।
তিনি বলেন, আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করব সহযেগিতা করার। যারা নিহত হয়েছেন, তাদের ফ্যামিলির কাছে পৌঁছানো এবং যারা আহত হয়েছেন তাদেরকে আমাদের দায়িত্বে ঢাকায় এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করব।
হতাহতের স্বজনদের সাথে যোগাযোগ করে নেপালে নিয়ে যাবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেউ যেতে চাইলে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ইউএস বাংলা কার্যালয়ে স্বজনদের ভিড়
বিধ্বস্ত বিমানের যাত্রী কবির হোসেনের ছেলে শাওন এসেছেন ইউএস বাংলা অফিসে বাবার খোঁজ নিতে।
তিনি বলেন, আমার বাবা কবির হোসেন তার দুইজন বন্ধুকে নিয়ে ব্যবসায়িক কাজে গিয়েছিলেন। কিন্তু বিমান বিধ্বস্তের পরে তাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পরে নেপালের স্থানীয় একটি মাধ্যমে জানতে পেরেছি বাবা সেখানকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে। তাই এখানে খোঁজ নিতে এসেছি।
পরে তিনি ইউএস বাংলার মাধ্যমে বাবার সাথে কথা বলেছেন, তার বাবা ভালো আছেন বলে জানিয়েছেন। তাদের বাড়ি রাজধানীর উত্তরখান এলাকায়।
দুর্যোগ মন্ত্রী যা বললেন
বিমান দুর্ঘটনা এক ধরনের দুর্যোগ। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার চাইলে মন্ত্রণালয় সব ধরনের সহযোগিতা করবে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া।
বারিধারা ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের অফিসে বিমান দুর্ঘটনার বিষয়ে জানতে এসে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানান। ত্রাণমন্ত্রী বলেন, ইউএস বাংলা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুর্ঘটনায় নিহতদের তারা নিজ খরচে দেশে আনবে। তিনি বলেন, বিমানের পাইলট জীবিত আছেন। তার কাছে থেকে প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে। আমি বিমানমন্ত্রীকে বলব একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে; যার মাধ্যমে দুর্ঘটনার সঠিক তথ্য বের করে জনগণের কাছে তুলে ধরা যাবে। একটি খুশির খবর হলো সব যাত্রীর বীমা করা আছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এটিসিকেই দায়ী করছে
নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে সোমবার ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ড্যাশ-০৮ কিউ-৪০০ বিমান দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল সিস্টেমের বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদানকে দায়ী করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এ দুর্ঘটনার জন্য পাইলটের ভুল ছিল বলা হলেও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে এটিসির ভুল তথ্য প্রদানের ফলেই পাইলট বিভ্রান্ত হন। বিমানটি উড্ডয়ন ও অবতরণকালে এর কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল না। পাইলট অবতরণের জন্য এটিসির সাথে সংযোগ স্থাপন করেন এবং কিয়ারেন্সের জন্য অনুরোধ জানান।
আলজাজিরা ও নেপালি একাধিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, এটিসি থেকে প্রথমে পাইলটকে রানওয়ের দক্ষিণ দিক থেকে অবতরণের জন্য বলা হয়। সে অনুযায়ী পাইলট অবতরণের প্রস্তুতি গ্রহণের পর আবার এটিসি থেকে দিক পরিবর্তন করে উত্তর দিকে যেতে বলা হয়। পাইলট পরিস্থিতি সামাল দিয়ে অবতরণের প্রস্তুতি নিতেই রানওয়ে পরিবর্তন করে ০২ নম্বরটি ব্যবহারের জন্য বলা হয়। ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দু’টি রানওয়ে রয়েছে। শেষ মুহূর্তে আবার রানওয়ে পরিবর্তন করার জন্য পাইলটকে নির্দেশ দিলে তিনি আর বিমানটি সামাল দিতে পারেননি। ত্রিভুবন বিমানবন্দরটি বিশ্বের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বিমানবন্দর। এ পর্যন্ত এই বিমানবন্দরে ৭০টিরও অধিক বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.