ডব্লিউ এইচ অডেনের একটি কবিতা সময় ও প্রেমের কথোপকথন

রিজভী আহমেদ

বিংশ শতাব্দীর খ্যাতিমান আমেরিকান-ইংরেজ কবি উইস্টান হিউগ অডেন (W H Auden) সমসাময়িক যশস্বী কবিদের মধ্যে কাব্যশৈলী ও নান্দনিকতায় স্বতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসিত। গত শতাব্দীর তিরিশ ও চল্লিশ দশকে অডেন কাব্যজগতে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন এবং সমাজ, রাজনীতি, ইতিহাস ও জীবন-জগতের দর্শনে জারিত তার কাব্যসৃষ্টি ইংরেজি কাব্যজগতে তিনি স্বীকৃতি পান একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী স্রষ্টার। সময় একজন কবিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সমসাময়িকতা একজন বড় কবির সৃষ্টিতে স্থায়ী দাগ রেখে যায়, কবিকে করে তোলে সমাজঘনিষ্ঠ ও সময়ের মুখপাত্র। যুদ্ধ, সংগ্রাম, শ্রেণিদ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক সঙ্কট, বেকারত্ব, হতাশা, সামাজিক অন্যায় ইত্যাদি অভিঘাত ডব্লিউ এইচ অডেনকেও স্পর্শ করেছে। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে দুই মহাযুদ্ধের ডামাডোলে ইউরোপের সমাজজীবনে নানা বিভীষিকার আত্মপ্রকাশ অডেনের কবিমানস বিনির্মাণে বিশেষ অবদান রেখেছে। কবির বেশির ভাগ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোতে যার প্রতিফলন লক্ষণীয়।
কালজয়ী একটি কবিতা পাঠককে অনাবিল আনন্দ দেয়, পাঠকের নান্দনিক রুচি তৈরি করে। সৃষ্টিমুহূর্তের যুগকে অতিক্রম করে সুদীর্ঘকাল ধরে উত্তরপ্রজন্মের কাব্যামোদি মানুষকে আবিষ্ট করে সেসব অনন্য কবিতা। W H Auden-এর কাব্যপাঠে যেসব কবিতা মুগ্ধতা ছড়ায় মনের গভীরে সেগুলোর মধ্যে একটি কবিতা As I walk out one evening এখন আমার আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য। কবির অসংখ্য তুলনাহীন কাব্যের মধ্যে এটি বোধ ও অবোধের সংশয়ে কাব্যপ্রেমিকের হৃদয়কে হিল্লোলিত করে।
বিংশ শতাব্দীর ত্রিশ দশকের মধ্যভাগে রচিত ‘As I walk out one evening’ গীতি কবিতাটি ১৫টি স্তবকে সজ্জিত, প্রতিটি স্তবক চতুষ্পদী অর্থাৎ চার লাইনে গঠিত। কবিতায় ইংরেজি চারণ বা লোকসঙ্গীতের ধারা সুস্পষ্ট। অন্তমিলের এই কবিতা উপমা-উৎপ্রেক্ষা আর রূপকের গাঁথুনিতে বাস্তব ও পরাবাস্তবের দোলায় দুলিয়ে দেয় পাঠকের প্রাণ-মন। কবিতাটির অন্তর্নিহিত সুর হচ্ছেÑ প্রেম ও সময়ের স্থায়িত্বের আলাপন। প্রেমের অনন্ততা নয়, বরং সময় জীবন-মৃত্যুর চক্র প্রেমকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এই কবিতায় প্রেম ও প্রেমিক মূলত জীবন ও মানুষের প্রতীক।
কবিতার প্রথম স্তবকে নগর-গ্রামের পরিচিতি পৃথক করা যায় না, এক দিকে শহুরে শান বাঁধানো রাস্তায় মানুষের ভিড় আর অন্য দিকে কাটা ফসলের মাঠ ইত্যাদি বর্ণনায় নগর-গ্রামের যুগপৎ দৃশ্য একই সাথে দৃষ্টিগোচর হয়; যা হয়তো কবি জীবনের আনন্দ ও মানুষের মরণশীলতার বিষাদের চক্র আঁকতে চেয়েছেনÑ যেমন : Walking down Bristol Street… were fields of harvest wheat.. এখানেৃ Bristol Street পরিপূর্ণ জীবনের স্ফুর্তির দ্যোতক। আর harvest wheat জীবনের শেষ পরিণতি, মরণের ধূসর প্রান্তর। Wheat বা গম হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট সময়কাল অথবা ঋতু চক্রের প্রতিনিধি।
এই কবিতাটিতে কয়েকজনের আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে নাটকীয় কাইমেক্সের উঠানামা লক্ষ্য করি। কথক (কবি), গায়ক-প্রেমিক এবং সময় ও সময়ের প্রতিনিধি শহরের সব ঘড়ি ব্যক্তিরূপে যেন এই কবিতার মুখ্য চরিত্র। এরা জীবন-মৃত্যু, আনন্দ-ভালোবাসা, আলো-অন্ধকার ও কাল-মহাকালের ভাষ্যকার। সময়ের নির্দেশ যাই থাকুক অন্তহীন ভালোবাসা সব কালকে অতিক্রম করে যায়Ñ এটি প্রেমিকের ধারণা। যেমন দ্বিতীয় স্তবকে আমরা দেখি Under an arch of the Railway/Love has no ending. রেলসেতুর খিলান একটি নির্দিষ্ট কালপর্ব। কিন্তু ভালোবাসা বা প্রেমের প্রবাহমানতার কোনো অন্ত নেই।
এই কবিতার তিন ও চার স্তবকগুলোর মর্মার্থে যেন মনে হয় ভালোবাসা প্রাকৃতিক দুর্লঙ্ঘনীয় বাধা অতিক্রম করতে চায়। কবি প্রেমকে বিজয়ী করার জন্য অসম্ভবকে তুচ্ছ জ্ঞান করেছেন। I will love you, dear, I will love you/till China & Africa meets/And the rivers jump upon the mountains/And the salmon sing in the street.
অনন্ত আকাশে মহাজাগতিক প্রান্তে ভালোবাসা ঠাঁই খোঁজে, রোমান্টিক উন্মাদনায় রূপকের মায়াজালে প্রেমের গতিময়তা যা সীমার মাঝে অসীমকালের পথে ধায়। নিচের চরণগুলোতে অপরূপ রূপকের ব্যবহার আমাদের চমক লাগায়।
I will love you till the ocean/Is folded and hang up to dry/And the seven stars go squaking/Like geese about sky.
পঞ্চম স্তবক থেকে পরবর্তী কয়েকটি স্তবকে এসে কবিতার মূল সুর ভিন্ন দিকে বাঁক নেয়। দৃশ্যপটে অন্যরঙের পালা। ঘড়ি সময়কে পরিচিতি দেয়, শহরের ঘড়িগুলো ঐকতান সৃষ্টি করে ঘোষণা দিলো, না তুমি সময়ের ওপর বিজয় অর্জন করতে পারো না, এই নিষ্ঠুর সত্যটি মনে রেখ। তাই শহরের সময় নির্দেশক ঘড়িগুলো যেন জীবন-মরণের বাস্তবতার বার্তাবহ, চার্চের ঘণ্টাধ্বনি যেমনÑ মৃতদেহের আগমন বার্তা।
ঘড়িগুলো আরো জানাচ্ছে যে, মানুষের অবসাদ ও অসুস্থতা সময়ের পাটাতনের ওপর আরুঢ়। কবি অডেন এই কবিতায় যেমন চিত্রিত করেছেন, But all the clocks in the city/Began to whirr and chime/Let not time deceive you/You can’t conquer the time.. অর্থাৎ কবি Whirr and chime- হয়তো শহরের ঘণ্টাধ্বনিতে জীবনের গানের কথা বলেছেন। কিন্তু তবুও প্রেমের অসীমত্বে বিশ্বাসী প্রেমিকের স্বর্গীয় আনন্দে মৃত্যুর ছায়া ঘনিয়ে আসে। সময়ের মুখপাত্র ঘড়ি সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করছে, প্রেম বা জীবন সময়ের ওপর প্রভুত্ব করতে পারে না। কারণ কেউ সময়ের ওপর বিজয় লাভ করতে পারে না। জীবন যেন মৃত্যুরই বাঁশির সুর। অতএব সময়ের কাছে তাকে আত্মসমর্পণ করতেই হবে। সময়ের সাথে প্রেম তথা জীবনের আলাপনে অপূর্ব রূপক ও অসাধারণ চিত্রকল্পে কথক (কবি) বুদ্ধিদীপ্তভাবে মানবজীবনের দৈহিক ও আবেগগত ক্ষয়ের একটি চিত্র এঁকেছেন নিপুণ ব্যঞ্জনায়। কারণ যতই প্রেমের অমরত্বের কথা বলা হোক না কেন, সময়ের ব্যাপকতায় ভালোবাসা বা জীবন সীমাবদ্ধ, ক্রমে তা রুগ্ণ ও ভগ্ন হয়। তাই জীবনের এক নির্দিষ্ট ক্ষণে অন্ধকার নামতে থাকে মৃত্যুর গন্তব্যে পৌঁছানোর পথচলায়। সুতরাং সময়ের চেয়ে প্রেম মোটেও শক্তিশালী নয়। Into many a green valleys/Drifts the appalling snow/Time breaks the threaded dances/And the divers brilliant bow সৌন্দর্য ও যৌবন চিরদিন ধরে রাখা যায় না, এটাই তাদের ট্র্যাজিডি। বয়োবৃদ্ধির সাথে সাথে তা ভেঙেচুরে যায়।
আবার রূপকার্থে সময়কে বেয়াড়া হিসেবে অভিহিত করেছেন কবি। In the burrows of the nightmare... time watches the lovers from the shadow and coughs, when you would kiss. প্রেমিকের প্রেমানন্দ নির্বিঘœ নয়। দুঃস্বপ্নের গুহায় বাস করে সময় প্রেমিকের দিকে চোখ রাখে। সময়ের গতি নিরবচ্ছিন্ন, জরা-ব্যাধি, আনন্দ-উল্লাস, ভয়-আতঙ্ক সময়কে এড়িয়ে যেতে পারে না।
পরের স্তবকগুলোতে সময় ও ভালোবাসার সমন্বয়ের অন্তর্নিহিত সুর ধ্বনিত হয়। প্রেমের ওপর সময়ের অখণ্ড কর্তৃত্ব ঘোষণার পরেও সময়ের অভিভাবক ঘড়ি প্রেমিককে স্মরণ করিয়ে দেয়-নশ্বরতার বিষাদের মধ্যেও জীবন স্বয়ং একটি আশীর্বাদ। যদিও জীবনে বিয়োগান্তক পরিণতি আছে, তথাপি অস্থির ভালোবাসা এখনো অপরিহার্য। O look look in the mirror/O look in your distress/Life remains a blessing/Although you can’t bless.
মানবীয় অপরিশুদ্ধতা ও মরণশীলতা সত্ত্বেও এবং বিষণœ বেদনায় নিমজ্জিত হয়েও সময়ের পরিচালক ঘড়িগুলো আমাদেরকে একে অন্যের প্রতি ভালোবাসতে বলে। O stand stand at the window/As the tears scald and start/We shall love your crooked neighbour/With your crooked hearts/
আসলে সময়ের ধারক ঘড়ি প্রেমিককে সময় সম্পর্কে বেশ কিছু উপদেশ দিলেও প্রেমিক থাকে অব্যক্ত। সময়ের অসীমতা ও ব্যাপক ইতিহাসের মধ্যে প্রেমিকের স্থান খুব অল্প এবং সময় অনন্ত চলমান। It was late, late in the evening/The lovers, they were gone/And the clocks had ceased their chiming/ ঘড়িগুলোর ঘণ্টাধ্বনির ঐকতান যেন জীবনেরই কোলাহল। আর জীবনের অবসান তো অবধারিত। অতএব জগতে সময়ই ভিত্তি, আর জীবন-মৃত্যু ও প্রেমের চিরন্তন আবর্ত এর একটি খণ্ডিত অংশ।
ডব্লিউ এইচ অডেনের এই কবিতাটিতে টি এস ইলিয়টের Westland এর আভাসও আমরা লক্ষ্য করি। এই কবিতায় গতিময় পার্থিব বিচরণের দৃশ্যের মধ্যে কোথাও কোথাও শুকনো, অনুর্বর, আতঙ্কিত নির্জন বিরান ভূমির চিত্রও পরিলক্ষিত হয়। গভীর প্রবাহমান নদীও শুকিয়ে যাওয়ারও ইঙ্গিত মেলে। Is folded and hang up to dry অথবা Drifts the appalling snow ev And the deep river ran on.
কথক (কবি) সারা কবিতায় আনন্দময় উদ্বেল অভিযাত্রার যাত্রী প্রেমিক, প্রেম বা জীবন ও সময়ের গভীর বোধের কথোপকথনে দার্শনিকতার এক বিমূর্ত স্তরে আমাদেরকে পৌঁছে দেন। কবি তাঁর এই কবিতায় প্রেমের গতিময়তা ও অসীমকালের আলোচনার এক অনবদ্য কাব্যভাষা আমাদের কাছে উপস্থাপন করেন। সমসাময়িক কাল, ভূগোল, মহাজাগতিক বিস্ময়, আদিম আতঙ্ক আর প্রেম-সময়ের সংলাপ কেন্দ্রীভূত হয়েছে অডেনের এই কবিতায়।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.