ads

অলঙ্করণ : হামিদুল ইসলাম
অলঙ্করণ : হামিদুল ইসলাম

টগর-পলাশের গল্প

শওকত নূর

এখন বসন্তকাল। শীত নেই। শেষরাতে টগর-পলাশের ঘুম ভেঙে যায়। ওরা কান পেতে শোনে একটা পাখি ওদের বাইর আঙিনার গাছ থেকে বারবার বলছে, চোখ গেল! ওরা পিট পিট করে তাকায়। দেখে ঘরের কার্নিশের নিচ দিয়ে জোছনার আলো এসে পড়েছে ওদের পায়ের কাছে বিছানায়। ওরা ফিস ফিস করে কথা বলে। বাইরে ঘরের চালের ওপরের পাখিরা তা যেন শুনতে পেয়েছে। আনন্দে তারা তাই একযোগে কলরব করে ওঠে। বিচিত্র সুরের কোলাহল। তারা যেন ডাকছে ওদের দুই ভাইকে : এসো টগর, এসো পলাশ। এসো, এসো সবে মিলে গান করি। টি-টি-টি-টি-টি।

ওরা দুই ভাই খাট থেকে মাথা তুলে দেখল ও পাশের খাটে ওদের বাবা-মা ঘুমাচ্ছেন। পাশের বাড়ির গোয়ালঘর থেকে বাছুরের হাম্বা ডাক ভেসে এলো। ওদের প্রতিবেশী লাল মামুদ চাচ্চু বাছুরের উদ্দেশে অন্য ঘর থেকে প্রতিদিনের মতো বলে উঠল : এই ভারে (আস্তে)। আসতাছি, সবুর কর।
ওরা বুঝতে পারল এখনই আজান পড়বে। গাই দোয়ানোর সময় হয়ে গেছে। প্রতিদিনের মতো উঠে পড়ল ওরা। দরজা খুলে বাইরে এসে ক’পা বাড়াতেই চার দিকে আজানের শব্দ শুরু হয়ে গেল। ওরা বুঝে নিলো, এখন আর ভয়ের কিছু নেই। দৌড়ে আঙ্গিনা পেরিয়ে গেল ওরা।

চার দিক ফর্সা হয়ে যাচ্ছে। গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি সব ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছে। আর যে পাখির কোলাহল। দোয়েলগুলো গাছে গাছে কী যে নাচানাচি করছে! ওরা দৌড়ে চলে এলো পুকুরচালার পাশে। দেখল চালার পাশের বেড়া দেয়া বাগানটাতে একটা লোক উবু হয়ে কী যেন করছেন। তিনি ওদের দিকে মুখ তুলে একবার তাকিয়ে আবার কাজে মনোযোগ দিলেন। ওরা দেখতে পেল বাগানটাতে নানা রঙের ফুল। বাতাসে খুব দুলছে ফুলগুলো। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল ওরা। বাগানের বেড়া ঘেঁষে চুপচাপ দাঁড়াল। লোকটা তখনই মুখ তুলে তাকালেন। একেবারে অচেনা লোক। তিন দিন ধরে গাঁয়ে এসেছে ওরা। বেশ ঘোরাফেরা হয়ে গেছে এরই মধ্যে। এমন কাউকে দেখেনি। তাই কিছুটা ভয় পেয়ে গেল। লোকটা বললেন, কী খবর?
ভালো। সমস্বরে বলল ওরা। খুব ভালো। ভালো থাকলেই ভালো।
আপনি কে?
মন্ত্রী।
এবারে ওরা ভড়কে গেল। মন্ত্রী মানে তো অনেক বড় লোক। মন্ত্রীদের শহরের বাড়ির টিভিতে ওরা দেখেছে। মন্ত্রীর সামনে চলে এসেছে ওরা? ভয়ঙ্কর ব্যাপার! একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করে তড়াক করে পিছিয়ে এলো ওরা। লোকটা বললেন, কী হলো? ভয় পেয়েছ নাকি? ভয় নেই, এসো।

ওরা আবারো মুখ চাওয়া চাওয়ি করে দৌড়াতে গেল। এবারে লোকটা বেশ জোরেশোরে বললেন, কী হলো, বাবারা, সোনামানিকরা, যাচ্ছো কেন? কোনো ভয় নেই। আমি তোমাদের কাকা। মন্ত্রী কাকা। আদর করব তোমাদের। এসো। এই যে দেখ কত সুন্দর ফুল! হলুদ আছে, সাদা আছে। ওরা দেখল লোকটার হাতে নানা রঙ-বেরঙের ফুল। ফুলগুলো বাতাসে দুলছে। এবারে ওরা এক পা দুই পা এগিয়ে গেল। বাগানের ধার ঘেঁষতেই লোকটা ফুলগুলো ওদের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, কী নাম সোনামানিকদের?

টগর-পলাশ। ওরা একযোগে বলল।
বেশ নাম। ফুলের নামে নাম। খুবই সুন্দর।
ধন্যবাদ। ওরা মৃদুস্বরে বলল।
তা সোনামানিকরা কি টগর-পলাশ ফুল দেখেছ?
জি না।
তাহলে চলো, টগর ও পলাশ গাছের দিকে যাই। নিজের নামের ফুল দেখতে পাবে। ওই যে গাছগুলো!
লোকটা ওদেরকে পুকুরচালার পেছন দিকটায় নিয়ে গেলেন। দুটো গাছ দেখিয়ে বললেন, ওই যে দেখো টগর গাছ, ওই হলো পলাশ। ওরা দেখল চমৎকার ফুলে দুটো গাছ ছেয়ে আছে। ওরা ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইল। লোকটা বললেন, তবে যাও এবার। বাড়ি চলে যাও। এসব ফুল ছিঁড়তে নেই। শুধু দেখতে হয়। দেখাতেই শান্তি।

ওরা লোকটার দেয়া সাদা ও হলুদ রঙের ফুল হাতে বাড়িতে চলে এলো। উঠানে ঢুকতেই ওদের দাদু বললেন, কী দাদু ভাইরা, ফুল হাতে দেখছি! মুলা আর রাঁই সরিষার ফুল। কোথায় পেলে? মন্ত্রী দিয়েছে।
মন্ত্রী দিয়েছে মানে? কী বলছ এসব?
হ্যাঁ, মন্ত্রী বাগানে কাজ করছে। আমাদের ফুল দিয়েছে।
ওদের দাদু অবাক হয়ে চেয়ে রইলেন। ওদের বাবাও তখন সেখানে এসে দাঁড়িয়েছেন। দু’জনই গভীরভাবে ভাবলেন একটুক্ষণ। তার পর ওদের দাদু বললেন, এ গাঁয়ে তো কোনো মন্ত্রী মিনিস্টার নেই। তবে মন্ত্রী নামের এক লোক ছিল। নদীর ওপারে বাড়ি। সে অসুখে মারা গেছে অনেক আগে। তার এক যমজ ভাই অবশ্য ছিল। তারও নাম মন্ত্রী ছিল। সে তো বাড়ি থেকে রাগ করে হারিয়ে গেছে বছর বিশেক আগে। কোথায় গেছে, মরে গেছে কী বেঁচে আছে কেউ কিছুই জানে না তার সম্পর্কে। হারিয়ে যাওয়া মন্ত্রীর একখণ্ড জমি অবশ্য পুকুরচালায় আছে। মৃত মন্ত্রীর ছেলেরা তা আবাদ করে।

কথা বলতে বলতে টগর-পলাশের দাদু ও বাবা বারান্দা থেকে নেমে হাঁটা ধরলেন। বাড়ির আঙ্গিনা পেরিয়ে পুকুরচালায় চলে এলেন তারা। দেখলেন, মৃত মন্ত্রীর এক ছেলে পুকুরচালায় দাঁড়িয়ে আছে। টগর-পলাশরা এরই মধ্যে তাদের দাদু ও বাবার পেছন পেছন এসে সেই বাগানটাতে ঢুকেছে। ওরা হলুদ ও সাদা ফুলে হাত দিতেই পুকুরচালায় দাঁড়ানো ছেলেটা বলে উঠল, এই যে গ্যাদারা, ফুল তুইলো না। কাইল বিকেলে মন্ত্রী কাকা ফেরা আসছে। ওইটা মন্ত্রী কাকার বাগান!

ads

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.