হুন্ডি প্রতিরোধে বাড়ছে রেমিট্যান্স প্রবাহ
হুন্ডি প্রতিরোধে বাড়ছে রেমিট্যান্স প্রবাহ

হুন্ডি প্রতিরোধে বাড়ছে রেমিট্যান্স প্রবাহ

আশরাফুল ইসলাম

হুন্ডি প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের পদক্ষেপের কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, পাঁচ মাসেই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এক কোটি ভুয়া অ্যাকাউন্ট অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এ সুবাদে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়ে গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ১৬ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিসংখ্যানে এ চিত্র উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান মতে, গত আগস্টে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট ছিল তিন কোটি সাত লাখ ৩০ হাজার। গত জানুয়ারিতে তা কমে নেমেছে দুই কোটি সাত লাখে অর্থাৎ পাঁচ মাসের ব্যবধানে অকার্যকর হয়ে পড়েছে প্রায় সাড়ে ৩৩ শতাংশ।

বিপুল পরিমাণ মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট অকার্যকর হওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘ দিন ধরে অভিযোগ ছিল মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাচার হচ্ছে। এ কারণে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ হ্রাস পাচ্ছে। তিন বছর ধরে রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হচ্ছে। যেমন- ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল এক হাজার ৫৩২ কোটি ডলার, পরের বছরে অর্থাৎ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা কমে হয় এক হাজার ৪৯৩ কোটি ডলার। ওই বছরে কমে যায় আড়াই শতাংশ। গত অর্থবছরের তা আরো কমে যায়। গত অর্থবছরে রেমিট্যান্স আসে ১২৭৭ কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে সাড়ে ১৪ শতাংশ কম।
রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ায় ব্যাংকাররা দিশেহারা হয়ে গড়েন। তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অভিযোগ করেন, অস্বাভাবিক হারে এ রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে হুন্ডি তৎপরতা। তারা বাংলাদেশ ব্যাংককে জানান, ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঁচ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেছে। তারা জানতে পেরেছেন, এসব ছোট ছোট রেমিট্যান্স মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে দেশে আসছে। এসব রেমিট্যান্সের বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসছে না। এভাবেই কমে যাচ্ছে রেমিট্যান্স প্রবাহ।

রেমিট্যান্স প্রবাহের এ ধসের কারণে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় উত্থাপিত অভিযোগ গুরুত্বসহকারে নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। হুন্ডি বন্ধে প্রথমে বিদেশী দূতাবাসগুলোকে সক্রিয় করা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যসহ আটটি দেশের দূতাবাসকে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে হুন্ডির সাথে জড়িত ব্যক্তিদের তালিকা করে সংশ্লিষ্ট দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করতে অনুরোধ করা হয়।

একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যসহ আট দেশে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত দল পাঠানো হয়। তারা সরেজমিন দেখতে পায় মোবাইল ব্যাংকিংয়ের হুন্ডি তৎপরতা। বিদেশে বসেই একটি চক্র প্রবাসীদের কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা কিনে নিজেদের কাছে রেখে দেয়। দেশে থাকা আরেকটি চক্র সুবিধাভোগীদের কাছে স্থানীয় মুদ্রা নিমিষেই পৌঁছে দেয়। এতে বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশেই থেকে যাচ্ছে। এভাবেই অনেকটা ফ্রি স্টাইলে হুন্ডি হচ্ছে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে।

এ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা জানান, গেল বছর বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সিঙ্গাপুরে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়েছিলেন। ওই সময় তিনি সরেজমিন মোবাইল ব্যাংকিং কোম্পানির হুন্ডি তৎপরতা দেখে এসেছেন। হুন্ডি তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহ অস্বাভাবিক হারে কমে যাচ্ছে। তাই রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের দু’টি টিম আলাদাভাবে আট দেশে পরিদর্শনে যায়।
তাই গত বছরের শুরুতেই হুন্ডি প্রতিরোধে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন সীমিত করতে থাকে বাংলাদেশ ব্যাংক। যেমন আগে যেখানে ৫০ হাজার টাকা দিনে লেনদেন করা যেত, তা পর্যায়ক্রমে কমাতে কমাতে এখন দিনে ১৫ হাজার টাকায় লেনদেন নামিয়ে আনা হয়েছে। একই সাথে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থপাচার বন্ধে তদন্ত কার্যক্রম জোরদার করা হয়। এরই ভিত্তিতে গত আগস্ট মাসে মোবাইল কোম্পানির কয়েক হাজার ভুয়া এজেন্ট অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। অন্য দিকে পাঁচ হাজার টাকার ওপরে লেনদেনে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি নেয়া হয়। এভাবেই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হুন্ডি তৎপরতা সীমিত হয়ে আসে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, এর সুফল এরই মধ্যে পাওয়া গেছে। গত আগস্টের পর থেকে গত জানুয়ারি পর্যন্ত এক কোটি ভুয়া মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এর সাথে সাথে লেনদেনও কমে গেছে। গত আগস্টে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মোট লেনদেন হয়েছিল ৩২ হাজার ১৮২ কোটি টাকা, গত জানুয়ারিতে তা কমে নেমেছে ৩০ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রেমিট্যান্স প্রবাহে। চলতি অর্থবছরের আট মাসের হিসাবে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ১৬ শতাংশ।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.