ads

পদ্মবতী

ঊষার মাহমুদ


প্রতি শুক্রবার বিকেলে মুক্তপাখি হয়ে ঘুরে বেড়ান দু’জন। মাসের শেষ শুক্রবার নিজেদের সাধ্যমতো কখনো বই খাতা, কখনো খাবারের প্যাকেট নিয়ে অনাথ শিশুদের হাতে তুলে দেন।
আজ প্রথম বিবাহবার্ষিকী। তাই পদ্মবতীর পছন্দের নীল রঙের পাঞ্জাবি এবং সবুজ রঙের কটি পরেছেন পরান। পরানের প্রিয় রঙ সবুজ। তাই সবুজ শাড়ি আর নীল হিজাবে সেজেছেন পদ্মবতী। আজকের এই বিশেষ দিন, হাতিরঝিলের পাশের অনাথ শিশুদের সাথে কাটাবেন। আগে থেকেই দু’জন ঠিক করে রেখেছেন। তাই আজ সবুজ আর নীল রঙের কিছু কাপড় নিয়ে অনাথ শিশুদের কাছে ছুটে এলেন। নিজদের হাতে প্রতিটা ছেলেমেয়েকে পরিয়ে দিলেন কাপড়গুলো। নতুন কাপড় পেয়ে আনন্দে আত্মহারা! বাচ্চাদের মুখে ফুটে উঠল জ্যোতির্ময় হাসি।
আমাদের বাসার ভাড়াটিয়াÑ পরান ও পদ্মবতী। ওরা যেন একটি দেহের দু’টি প্রাণ। ১০ মাসেরও বেশি সময় ধরে আছেন এখানে। ফেসবুক থেকে আসা মেয়ে। এসব মেয়ে ভালো হয় না। আবার মেয়েটা হিন্দু তাই পরানের বাবা-মা এই মেয়েকে কোনোভাবেই মেনে নেবেন না। পরানের এক কথা। যে মেয়ে আমাকে ভালোবেসে, আমার জন্য সাতক্ষীরা থেকে তিতাস পাড় চলে এসেছে, সে যদি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কোনো খারাপ হয়, আমি তাকে ফিরিয়ে দেবো না। পদ্মবতীকে ধরে রাখতে গিয়ে যদি সব বন্ধন ছিন্ন করতে হয়, আমি তাই করব। সব আরাম-আয়েশ ত্যাগ করে পদ্মবতীকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন।
পরান রিকশা চালান, আর পদ্মবতী গার্মেন্টে চাকরি করেন। দু’টো হাত এক করে নেমে পড়েন বেঁচে থাকার সংগ্রামে। প্রতিদিন সকালে নিজ রিকশা করে প্রিয়তমা স্ত্রীকে গার্মেন্টের গেটে নামিয়ে দিয়ে আসেন। আবার দুপুরের লাঞ্চ টাইমে গিয়ে নিয়ে আসেন। যেখানে যেভাবেই থাকুন না কেন, নিজ স্ত্রীকে আনা-নেয়ায় ভুল করেন না। রাতে বাসায় ফিরে দু’জন এক সাথে রান্না করেন। কখনো কখনো বেলকনিতে বসে জোছনার রাতের জোছনা বিলাস আর বৃষ্টিদিনের বৃষ্টি বিলাস। কোনোটাই যেন তাদের ভালোলাগা থেকে বাদ পড়ে না। এ যেন এক অনন্য বন্ধন।
পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর আর দামি জিনিসটা পদ্মবতীকে যতটা না আন্দোলিত করতে পারে, তার চেয়ে শতগুণ বেশি আন্দোলিত করে তার প্রিয়তম স্বামীর নিজ হাতে যতনে বানানো ঘাসের পায়েল। ভালোলাগা আর ভালোবাসা আকাশের সীমারেখা যেন আরো বাড়তে থাকে পদ্মবতীর; যখন পরান তার খোলা পায়ে পরিয়ে দেয় সবুজ ঘাসের পায়েল। প্রায়ই হাতিরঝিল লেকের পাশ ধরে কাশফুল নাড়িয়ে নাড়িয়ে হেঁটে বেড়ান দু’জন। দূর্বাঘাস পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ঘুড়ি বানিয়ে পরিয়ে দেন প্রিয়তমার হাতে! গোধূলিলগ্নে নীল আর সবুজ রঙের কাগজের নৌকা জলে ভাসিয়ে হারিয়ে যান দু’জন স্বপ্নের দেশে...।


ফেসবুকে পরিচয়। এক সময় ভালো বন্ধু হয়ে ওঠেন। ছেলে আর মেয়ে বন্ধুত্বের শেষ পরিণাম প্রেম। ওদের সম্পর্ক একই পথেই পূর্ণতা পেয়েছিল। পরান আর পদ্মবতী ছিল রাতজাগা পাখি। কথায় আর কথায় ভোর হয়ে যেত। তবুও শেষ হতো না কথোপকথন! পরান ভালোবেসে পদ্মবতীকে ‘চড়–ই’ বলে ডাকে। আর পদ্মবতী ডাকে ‘বাবুই’। শৈশবের স্মৃতিকাতর মেয়ে পদ্মবতী। তাল পাতার বাঁশি, নারিকেল পাতার চশমা, ঘড়ি ও কাগজের নৌকায় খুঁজে ফেরে সুখ। প্রতিদিন একটি করে চিঠি চায়। পদ্মবতীর পাগলামিতে চিঠিওয়ালা হয়ে উঠেন পরান। প্রতিনিয়ত চিঠির চালাচালি হয় তাদের।


পদ্মবতীর ফোনে প্রতিদিন ফজরের সময় ঘুম ভাঙে পরানের। এখন প্রতিদিন ফজরের নামাজ পড়া হয়। পদ্মবতীর কথামতো প্রতিদিন কোনো-না-কোনো একটা ভালোকাজ করার চেষ্টা করেন। নিঃশ্বাসে-বিশ্বাসে মিশে যাওয়া দু’টি নাম পরান-পদ্মবতী। একদিন কথা না হলে পাগল হয়ে ওঠেন দু’জন। আজ পনেরো দিনেরও বেশি হলো পাওয়া যাচ্ছে না পদ্মবতিকে। বারবার মেসেজ দিলেও কোনো রিপ্লাই দিচ্ছে না। মনজুড়ে হাজারো প্রশ্ন, কেন এমন করলে? তুমি কথা দিয়েছিলে কখনো ভুলে যাবে না। হারিয়ে যাও ক্ষতি নাই। অপরাধ কী সেটা তো বলে যাও। হঠাৎ অচেনা একটি নম্বর থেকে একটি মেসেজ এলো। মেসেজটা ওপেন করে পড়তে থাকে।

‘প্রিয় বাবুই,
তোমার-আমার প্রেমের কথা জানাজানি হয়ে গেছে। তাই বাবা আমার হাত থেকে ফোন নিয়ে নিয়েছেন। কোথাও বের হওয়া আমার জন্য নিষেধ। মা সব সময় চোখে চোখে রাখেন। শুধু তাই না, আগামী শনিবার আমার বিয়ে। তাই মায়ের ফোন থেকে চুরি করে এই মেসেজ লেখা। বাবুই, আমি যে তোমাকে না পেলে মরে যাবো। আমি মরতে চাই না। তোমাকে নিয়ে বাঁচতে চাই। তাই আজ রাতেই সব কিছু ফেলে সুদূর সাতক্ষীরা থেকে তোমার উদ্দেশে ঘর ছাড়ব। যে করেই হোক আমি তোমার তিতাস পাড়ে এসে পৌঁছব। বাবুই তুমি আমাকে ফেলে দিও না যেন’।
তারপর থেকে শুরু হয় পরান আর পদ্মবতীর নতুন অধ্যায়।
কুয়ালালামপুর, মালয়েশিয়া

ads

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.