ads

মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মজিদ জীবনযুদ্ধে পরাজিত

শওকত আলী রতন

১৯৭১ সালের মার্চ মাস। পশ্চিম পাকিস্তানিরা পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের ওপর আক্রমণের আভাসের গুঞ্জন চলছিল চারদিকে। সেই সময় ঢাকার দোহার উপজেলার লটাখোলা গ্রামের আব্দুর রহমান খানের ছেলে আব্দুল মজিদ খান পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে কর্মরত। যুদ্ধের ঘনঘাটা দেখে দেশের পক্ষে যুদ্ধ করার জন্য ২০ বছরের যুবক আব্দুল মজিদ খান পাকিস্তানের করাচি থেকে দেশে আসার জন্য ১ মার্চ ২ মাসের ছুটির আবেদন করেন।
ছুটির আবেদনও মঞ্জুর করেন সে দেশের সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা; কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানেরর সাথে পূর্ব পাকিস্তানের বিমান চলাচল শিথিল হয়ে যাওয়ায় দেশে ফিরতে পারছিলেন না আব্দুল মজিদ। ভীষণভাবে চিন্তিত হয়ে পড়েন তার দেশে ফেরা নিয়ে। অবশেষে ১৭ মার্চ বিমানযোগে ঢাকায় পৌঁছে ক্যান্টনমেন্টের অফিসে সবার সাথে দেখা করে লটাখোলা গ্রামের তার মায়ের কাছে আসার ইচ্ছা পোষণ করলেও ঢাকায় কোনো ধরনের যানবাহন চলাচল না করায় কঠিন হয়ে পড়ে তার বাড়িতে আসা। পায়ে হেঁটে ঢাকার সদরঘাট পর্যন্ত কোনোরকম পৌঁছতে পারলেও সেখান থেকে বাড়িতে আসার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। বাড়িতে পৌঁছতে সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হতে হয় তাকে। অবশেষে বাড়িতে পৌঁছে মাত্র এক দিনের বিশ্রাম নিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে রাইপাড়া ইউয়নিয়নের তৎকালীন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সিরাজ উদ্দিন আহমেদের বাড়িতে সবাই মিলিত হয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতির শলাপরামর্শ করেন। সেই সময় মজিদ খানসহ হাতেগোনা কয়েকজন সিরাজ মিয়ার বাড়িতে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। তার মধ্যে আব্দুল মজিদ, সিরাজ মাস্টার, সোহবার উদ্দিন, লরা গমেজ,, রউফ মোল্লা, দলিলুর রহমান, বাবুল দেওয়ান, হারবাট গজেম, মোহাম্মদ আলীসহ আরো কয়েকজন। প্রতিদিন গভীর রাত পর্যন্ত যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে কথোপকথন চলত পাশাপাশি প্রশিক্ষিত সেনাসদস্য হিসেবে অন্যদের যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন আব্দুল মজিদ। এরই মধ্যে ২৫ মার্চ রাতে ঢাকাসহ সারা দেশে পাক হানাদার বাহিনী নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করলে রুখে দাঁড়ায় বাঙালিরা।
এ সময় দোহারের মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পটি সিরাজ উদ্দিন আহমেদের বাড়ি থেকে পরিচালিত হতো। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তিনিও তার এলাকার সবাইকে যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ করতে থাকেন। পাকিস্তানি সৈন্যরা দোহারের রাইপাড়া সিরাজ উদ্দিন আহমেদের বাড়িতে অবস্থিত মুক্তিযোদ্ধার ক্যাম্পে আক্রমণের ছক আঁকতে থাকে। পাকিস্তানি সৈন্যরা বাঙালিদের ছত্রভঙ্গ করতে সিরাজ উদ্দিন আহমেদের বাড়িতে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে রাইপাড়া মোল্লা বাড়ির সামনে খাল পাড়ি দেয়ার সময় পাকিস্তানি সৈন্যদের স্থানীয় মুক্তিবাহিনীরা তুমুল প্রতিরোধ করে তোলে এবং শেষ পর্যন্ত ভারী অস্ত্র না থাকায় পিছু হটতে হয় তাদের। এ সময় ক্ষিপ্ত হয়ে পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা সিরাজ উদ্দিন আহমেদের বাড়ি আগুন দিয়ে পুড়ে দেয়। এরপর মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্পটি রাইপাড়া থেকে সরিয়ে লক্ষ্মীপ্রসাদ পোদ্দার বাড়িতে চলে যায়। তখন ২ নং সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন হালিম চৌধুরী খবর পেয়ে প্রশিক্ষক হিসেবে আব্দুল মজিদকে মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করতে মজিদ খান তার অস্ত্রটি পোদ্দার বাড়ি ক্যাম্পে জমা দিয়ে হরিরামপুর চলে যান। সেখানে তিনি ওই এলাকার মুক্তিবাহিনীদের যুদ্ধের ট্রেনিং দিয়ে প্রশিক্ষিত করে গড়ে তোলেন। মানিকগঞ্জ সাবডিভিশনে গুরুত্বপূর্ণ যে কয়েকটি অপারেশন সংঘটিত হয়েছে সবগুলোতেই আব্দুল মজিদ অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে হরিরামপুরের বালিরটেকে হামলা, সাভার ধল্যা ব্রিজ উড়িয়ে দেয়া এবং সিঙ্গাইরের গোলাইডাঙ্গা পাকিস্তানি ক্যাম্পে হামলা। এর মধ্যে মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর তুমুল আক্রমণের শিকার হয়ে পিছু হটতে গিয়ে একটা বিলের মধ্যে আটকা পড়েন। সেখান থেকে জীবন বাঁচাতে সাঁতার কেটে পানির মধ্যে কাটাতে হয়েছে পুরো একটি দিন। সেই সময়ে তার সাথে দুই যোদ্ধাও ছিলেন। তার সহযোদ্ধারা ধারণা করেছিলেন সে পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। কিন্তু অলৌলিকভাবে সেই বিল থেকে পালিয়ে একদিন পর ক্যাম্পে ফিরে আসেন। আব্দুল মজিদ জানান, আমি বেঁচে আছি না মরে গেছি সে খবর পর্যন্ত নেয়নি আমার সহযোদ্ধারা। মহান আল্লাহর কৃপায় সেদিন কোনোরকম প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলাম। তবু দেশকে শত্রুমুক্ত করার জন্য পিছপা হইনি। সাভারের ধল্যা ব্রিজটি উড়িয়ে দেয়ার অপারেশনেও তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। এ ছাড়া মানিকগঞ্জের গোডাউন এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পে অপারেশনে অংশ নিয়ে শত্রুপক্ষের গুলিতে নিহত হন তার খুব কাছের একজন সহযোদ্ধা দলিল উদ্দিন। এভাবেই রণাঙ্গনের দিনগুলো কাটান তারুণ্যে উজ্জীবিত ও টগবগে এক যুবক আব্দুল মজিদ খান। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধের পর দেশ শত্রুমুক্ত হলে মানিকগঞ্জের পিটিআই সেন্টারে মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্রটি জমা দিয়ে পুনরায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন আব্দুল মজিদ। এর এক বছর পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে অব্যাহতি নেন। ১৯৭৪ সালে বিয়ে করে সংসারের টানাপড়েনের কারণে ওই বছরই ঢাকা টোব্যাকো কোম্পানিতে সিকিউরিটি পদে তিন বছর এবং পূবালী ব্যাংকে সাত বছর চাকরি করার পর ১৯৮৪ সালে চাকরির উদ্দেশ্যে মধ্যপাচ্যের লেবাননে চলে যান। সেখান থেকে গুরুতর অসুস্থ হয়ে ১৯৯৬ সালে দেশে ফিরে আসেন। সেই থেকেই রোগে শোকে অতি অর্থকষ্টে জীবনযাপন করছেন তিনি। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে পৈতৃক বাড়িটিও বিক্রি করতে হয়েছে। আব্দুল মজিদ আক্ষেপের সাথে বলেন, আমি যাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি তারা আজ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারি ভাতা পাচ্ছেন। দোহারে অনেক অমুক্তিযোদ্ধা তারাও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাতা পাচ্ছেন। তিনি বলেন, দোহার উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা অফিসে গেলে আমার দিকে অনেকে তাকিয়ে থাকে। আবার অনেকে জানতে চায় আমি কোথায় যুদ্ধ করেছি। আর এর প্রধান কারণ আমার নাম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্তি না থাকায় এসব প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়।
এই বীর সৈনিক স্বাধীনতা যুদ্ধের অগ্রনায়কের পরিচয় বুকে ধারণ করে চলা জীবনযুদ্ধে পরাজিত এক সৈনিক। স্ত্রী, দুই সন্তান ও নাতি-নাতনী নিয়ে তার সংসার। ধারদেনা করে দুই ছেলেকে বিদেশে পাঠালেও সে দেশে কাজ না থাকায় বাড়িতে ঠিক মতো টাকা পাঠাতে পারছে না।
কাজ করতে না পারায় সাংসারিক দৈন্য তার পিছু ছাড়ছে না। যে কারণে এক রকম মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য আবেদন করেছেন একাধিকবার। সবার নাম মুক্তিযোদ্ধার গেজেটে প্রকাশ পেলেও অজ্ঞাত কারণে তার নাম থেকে যায় তালিকার বাইরে। মুক্তিযোদ্ধাদের নাম তালিকাভুক্ত করার জন্য যারা দায়িত্ব পালন করেছেন তারাই বা কেন তার নামটি তালিকাভুক্ত করেননি সে বিষয়টি তাকে ভাবিয়ে তোলে। আর নাম তালিকাভুক্ত না হওয়ায় অবহেলিত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রয়ে গেছেন। তিনি বলেন, আমি অনেক কষ্টে দিনাতিপাত করলেও আমার সহযোদ্ধা যারা এখনো জীবিত আছে তারা কেউ আমার ভালোমন্দের খবর নেয় না। সবশেষ অনলাইলে মুক্তিযোদ্ধার জন্য আবেদন করলে তাকে স্বীকৃতপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা সার্বিকভাবে সহযোগিতা করবে বলে তিনি জানান। এ ব্যাপারে দোহার উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার রজ্জব মোল্লা বলেন, সম্প্রতি সারা দেশে নতুন মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাইয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে সেখানে আব্দুল মজিদের নাম রয়েছে। নতুন গেজেটে তার নাম যাতে থাকে এ ব্যাপারে আমাদের সহযোগিতা থাকবে এবং আব্দুল মজিদের নাম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্তি হবে।

ads

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.