বিশ্ব অসাম্প্রদায়িক হবে কবে?

হিমেল আহমেদ

স্রষ্টার অপরূপ সৃষ্টি আমাদের প্রিয় এই পৃথিবী। কিন্তু সঙ্কীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার শক্ত শিকলে আবদ্ধ হয়ে মানুষ ভুলতে বসেছে যে, সব ধর্মের ঊর্ধ্বে অন্য রকম একটি ‘ধর্ম’ আছেÑ যেটি ‘মানবতা’। মহান সৃষ্টিকর্তা সবাইকে মানুষ হিসেবেই সৃষ্টি করেছেন, বিভেদ তৈরি করেছে মানুষ নিজেই। সব মানুষের রক্ত লাল। তাহলে কেন ধর্ম-বর্ণ-ভাষাভিত্তিক সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠেছে এই বিশ্ব যে, মানবতার অবক্ষয় করতেও দ্বিধান্বিত হচ্ছে না। সারা বিশ্বে আজ যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই আছে। বাংলাদেশ মুসলিমপ্রধান দেশ। দুঃখের বিষয়, সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর আক্রমণ হয়েছে কখনো কখনো। বিভিন্ন নির্বাচনের আগে দেখা যায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘর, মন্দির, মূর্তি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করার কিছু ঘটনা ঘটায় দুর্বৃত্তরা। বাংলাদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। এ দেশে সব ধর্মের মানুষের বসবাসের অধিকার রয়েছে। এই বিশ্ব যে রকম সব ধর্মবিশ্বাসীদের জন্য, তেমনি অবিশ্বাসীদের জন্যও। সবাই নিজের ধর্ম পালন করবে অবাধে, এটাই নিয়ম।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ এক কোটি ৮০ লাখ মানুষের সিরিয়াকে আজ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ‘কবরস্থান’ বলা হচ্ছে। এটা মানবজাতি বিশেষত মুসলমানদের জন্য বেদনাদায়ক। প্রতিদিন সরকার বনাম বিদ্রোহী যুদ্ধে গোলার আঘাতে মরছেন হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিক। নারী, শিশু, বয়স্ক, বৃদ্ধ, রোগী কেউ রেহাই পাচ্ছেন না এই হত্যাযজ্ঞ থেকে। যেন সিরিয়ায় বসবাস করাই তাদের জন্য অভিশাপ। সিরিয়ান নেটওয়ার্ক ফর হিউম্যান রাইটসের (এসএনএইচআর) মতে, ২০১১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সিরিয়ায় পাঁচ লাখের বেশি মানুষ মারা গেছে। এদের চার লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক। ৩০ হাজারের অধিক আছে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্য। সিরিয়ান সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ এবং বিবিসির এক গবেষণায় একই হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। মহিলা ও শিশু মৃতের সংখ্যা ৫০ হাজারের কাছাকাছি। গত সাত বছরে সিরিয়ায় শিশু মারা গেছে ২৪ হাজারের বেশি আর নারী ২৩ হাজার।

ইউনিসেফ ও হিউম্যান রাইটসের তথ্য মতে, গত ছয় বছরে সিরিয়া বিদ্রোহে নিহত পাঁচ লাখের বেশি, তার মধ্যে শিশু ২৪ হাজার, নারী ২৩ হাজার, বেসামরিক নাগরিক ৪৭ হাজার। আহত হয়েছে ১২ লাখের বেশি। ওই জরিপ অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর সংখ্যা প্রায় ৮৪ লাখ, যা সিরিয়ার মোট শিশুর ৮০ ভাগ। বাস্তুচ্যুত এক কোটি ১৩ লাখ। অভ্যন্তরীণ শরণার্থী ৬৫ লাখ নরনারী। এর মধ্যে শিশু ২৮ লাখ এবং কারাগারে মারা গেছে প্রায় ১২ হাজার মানুষ। অথচ বিশ্ব আজ নির্বাক ও নিশ্চুপ হয়ে দেখছে সব। মজলুমের আর্তনাদ শোনারও কি কেউ নেই? সরকারি বাহিনী ও জঙ্গিসহ বিদ্রোহীদের যুদ্ধে কেন নিরীহ-নির্দোষ বেসামরিক মানুষ মারা যাবে? কোমলমতি শিশুরা সন্ত্রাসী নয়।

এ দিকে, শ্রীলঙ্কায় মুসলিমবিরোধী সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ব্যাপক হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে মসজিদসহ সংখ্যালঘু মুসলমানদের বসতবাড়ি। বহু সাম্প্রদায়িক এই হামলায় মুসলমান মালিকানাধীন ২০০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ১১টি মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে তিনজন নিহত এবং আহত হন অন্তত ২০ জন। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাইটগুলো ব্লক করে দেয়া হয়েছে। দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার দুই কোটি ১০ লাখ জনগোষ্ঠীর প্রায় ১০ শতাংশ মুসলমান। দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলি বৌদ্ধ। শ্রীলঙ্কায় সাম্প্রদায়িক এই হামলাগুলো প্রমাণ করে, বিশ্ব কতটা অসাম্প্রদায়িক আজো। ভারতের আসামেও বেশ কিছু দিন আগে মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা ঘটেছিল। মিয়ানমার সরকার কর্তৃক মুসলিম রোহিঙ্গাদের নির্যাতনের কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। মানবাধিকার প্রতিবেদনে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা হত্যার প্রমাণ পাওয়া গেছে। আসিয়ান পার্লামেন্টারিয়ান ফর হিউম্যান রাইটস (এপিএইচআর) নামে এক কমিটির প্রতিবেদন বলছে, রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পূর্বপরিকল্পিত সহিংসতা জোরালো হওয়ার পর থেকে রোহিঙ্গা শিশুদের ৪৩ হাজার বাবা-মা নিখোঁজ রয়েছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জোট আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত এপিএইচআর বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ওপর জরিপের ভিত্তিতে এবার ওই রিপোর্ট প্রকাশ করেছে।

এর বরাত দিয়ে মার্কিন সাময়িকী টাইম ম্যাগাজিনের খবরে বলা হয়েছে, জরিপের ফলাফল প্রমাণ করে, রাখাইনে নিহতের সংখ্যা মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের স্বীকার করা সংখ্যার চেয়েও অনেক বেশি। রোহিঙ্গা ইস্যুতে রাখাইনে ‘মাত্র ৪০০’ মানুষ নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে মিয়ানমার, যা সর্বৈব মিথ্যা। এ পর্যন্ত মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা। সব মিলিয়ে ১০ লাখের মতো রোহিঙ্গা এখানে আশ্রিত অবস্থায় আছে। বাংলাদেশ সব সময় মানবিকতা ও অসাম্প্রদায়িকতার পরিচয় দিয়েছে। মিয়ানমার কর্তৃক নির্যাতিত এত বিশালসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে নিজ দেশে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ তা প্রমাণ করেছে। এসব শরণার্থীর ৬০ শতাংশই শিশু, যাদের অনেকের সাথেই বাবা-মা নেই। এদের বর্ণনায় উঠে এসেছে, স্বজনদের হত্যার শিকার হতে দেখেছে তারা। বর্মি সেনাসদস্য ও স্থানীয় বৌদ্ধরা বাড়ি ঘিরে ফেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে অনেকের বাবা-মাকে। রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার কথা বললেও মিয়ানমার বিষয়ে তেমন আগ্রহ দেখায়নি। বিশ্বজুড়ে নিরপরাধ শিশু ও বেসামরিক মানুষ হত্যা বন্ধের দাবি জানানো হলেও আমলে নিচ্ছে না। ধর্মের অপব্যবহার ও জঙ্গিবাদ ও নৃতত্ত্বের সন্ত্রাসীদের মোক্ষম হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের মোকাবেলা করা মানবতার স্বার্থেই জরুরি, সাধারণ মানুষ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এ দিকেও লক্ষ রাখা উচিত।

লেখক : শিক্ষার্থী, বগুড়া আযিযুল হক কলেজ

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.