ads

এলডিসির চ্যালেঞ্জ যেন গলার কাঁটা না হয়
এলডিসির চ্যালেঞ্জ যেন গলার কাঁটা না হয়

এলডিসির চ্যালেঞ্জ যেন গলার কাঁটা না হয়

মোহাম্মদ আবু নোমান

স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়া জাতির জন্য বিরাট অর্জন হলেও একই সাথে এটি হবে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। বড় অর্জনে চ্যালেঞ্জও অনেক বেশি। এ জটিল চ্যালেঞ্জে আমাদের মাতৃভূমি হারবে, না জিতবে, না গলার কাঁটা হবে এটাই প্রশ্ন। কৃত্রিম উপগ্রহ, পদ্মা সেতু, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, হাতিরঝিল, সমুদ্রবন্দর এভাবে কয়েকটি উন্নয়ন অগ্রযাত্রার ভিডিওচিত্র থাকাই যথেষ্ট নয়। অর্থাৎ অগ্রযাত্রা ও অর্জনে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব ভিডিওচিত্রই সব নয়। চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যথেষ্ট তৈরি না হয়ে ভিডিওচিত্র, থিওরিটিক্যাল চিন্তা বা কভার পেইজ তৈরি করে নিজেদের পায়ে কুড়াল মারার অবস্থা যেন না হয়।

বিশ্বের দেশগুলোকে ‘স্বল্পোন্নত দেশ’, ‘উন্নয়নশীল দেশ’ ও ‘উন্নত দেশ’- এই তিন শ্রেণীতে ভাগ করা হয়। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে বেরিয়ে জাতিসঙ্ঘ থেকে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ। আরো স্পষ্ট করে বললে- বাংলাদেশ এখনও ‘উন্নয়নশীল’ দেশ হয়নি, হওয়ার ‘মহাসড়কে’ উঠেছে মাত্র। লক্ষ্যে পৌঁছাতে এখনো কমপক্ষে ছয় বছর বাকি আছে। তবে এখনই বাংলাদেশের ‘স্বল্পোন্নত’ পরিচয় ঘুচছে না, অর্জিত অগ্রগতির ধারা আরো ছয় বছর বজায় থাকলে ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের প্রবেশ ঘটবে ‘উন্নয়নশীল’ দেশের তালিকায়।

মনে রাখতে হবে, এখনো মানুষ অভাব অনটনে জর্জরিত হয়ে ভিটেমাটি বিক্রি করে, পরিবারের মায়া ত্যাগ করে একটু সচ্ছলতার আশায় নিজের জীবনকে বাজি রেখে উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। এখনো যে দেশের অনেক মানুষ তিন বেলা পেটপুরে খেতে পায় না। ডিগ্রি বা মাস্টার্স পাস হকার বা ফেরিওয়ালা বেশুমার। খাদ্যের অভাবে মা সন্তানের মুখে বিষ ঢেলে নিজেও বিষপান করছে, রেল লাইনে ঝাঁপ দিচ্ছে। সে দেশে শুধু ‘সূচক’ কাজীর কাগজে-কলমে নয়, আগে সর্বসাধারণের বেঁচে থাকার ন্যূনতম জীবন-মানের পর্যায় থাকাই প্রথম।

জাতিসঙ্ঘের সূচকে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এক হাজার ২৭৪ ডলার। তবে সরকারি হিসাব অনুযায়ী এক হাজার ৬১০ ডলার। সংখ্যাটা যাই হোক আসলে এটাই বা ক’জনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আছে? কারো আয় দিনে লাখ টাকা আবার কারো আয় ১০০ টাকাও না। দেশে এখনো তিন কোটির মতো মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। তাহলে মাথা পিছু এক হাজার ২৭৪ ডলার আয় কাগজে-কলজে থাকলেও সর্বসাধারণকে নিয়ে এই অসামঞ্জস্য কমিয়ে আনা জরুরি নয় কি?

বর্তমানে ৪৭টি দেশ স্বল্পোন্নত তালিকায় রয়েছে। যেগুলোকে এলডিসি বলা হয়। এই গ্রুপের সদস্য থাকলে আন্তর্জাতিক মহল থেকে ব্যাপক কিছু সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়। চলতি বছর এই উত্তরণ প্রক্রিয়া শুরু হলেও ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের বাণিজ্য সুবিধা পাবে। কিন্তু তারপর? আলোর উল্টো পাশেই যেমন অন্ধকারের বাস, তেমনি এই সুসংবাদের উল্টো পিঠে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও মোকাবেলা করতে হবে দেশকে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন এ স্বীকৃতির কারণে রফতানি আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, কমে যেতে পারে রেমিট্যান্স, কমবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বৈদেশিক অনুদান। কম সুদে ঋণপ্রাপ্তির দুয়ার সঙ্কুচিত হবে। উচ্চ সুদে ঋণ নেয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। বিদেশের বাজারে প্রাপ্ত ট্যারিফ সুবিধা কমবে, সহজশর্তে বৈদেশিক ঋণ পাওয়া যাবে না। অর্থ সঙ্কট দেখা দিতে পারে এ দেশে কাজ করা বৈদেশিক অনুদান নির্ভর এনজিওগুলোর। দেশ এখনো স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। এখনো বাংলাদেশের বাজেটে আয় হিসেবে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক ঋণের কথা উল্লেখ করতে হয়।

এরপরও এখন থেকে যথাযথ প্রস্তুতি নিলে বাংলাদেশ তার সুফল নিতে পারবে। প্রশ্ন হচ্ছে আমরা যথাযথ প্রস্তুতি নিতে পারব কি? না পারলে বেড়ে যাবে পণ্যের মূল্য, জীবন হবে দুর্বিষহ। সরকার এই চ্যালেঞ্জ সামলাতে গিয়ে দেখা যাবে একটা সিঙ্গারা, ছোমচা, পাউরুটি থেকে জরুরি ওষুধপণ্যের ওপরও ভ্যাট বাড়ানোর সাথে কর আহরণ বাড়াবে। যে দেশে দুর্নীতি কোথায় না বলে, দুর্নীতি কোথায় হয় না বলতে হবে, যে দেশের রিজার্ভের টাকা চুরি হয়, ব্যাংক লুট হয়, শেয়ার মার্কেট দেউলিয়া হয়, সে দেশে এসব বিষয়ে ঠিকমতো পরিকল্পনা না থাকলে আল্লাহ না করুন, রাষ্ট্রও দৈন্যদশাগ্রস্ত হয়ে যেতে পারে।

স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বর্তমানে ইউরোপের ৪০টি দেশে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা পায়। উন্নয়নশীল দেশ হলে এই সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার প্রশ্ন উঠবে। রফতানি খাতে তৈরী পোশাকের ওপর অধিক নির্ভর না হয়ে বিকল্প পণ্য তৈরির দিকে মনোযোগী হবে হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্কসুবিধা, মেধাস্বত্ব সুবিধা ইত্যাদি কমে যাবে, কিংবা উঠে যাবে। ফলে বিশ্ববাজারে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আরো প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে। দেখা গেছে, এ ধরনের নানা কারণে অনেক দেশ এলডিসির তালিকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর সমস্যায় পড়েছে। তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমেছে; রফতানি, বিদেশী সহায়তা, রেমিট্যান্সও কমেছে।

এলডিসিভুক্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বাণিজ্য, শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা, উন্নয়ন অর্থায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও কৌশলগত সহায়তা পেয়ে আসছে। এ ছাড়া ফার্মাসিউটিক্যালস খাতে স্বল্পোন্নত দেশগুলো পেটেন্ট লাইসেন্স ছাড়াই ওষুধ উৎপাদন করতে পারায় এই খাতে যেসব দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারী রয়েছে তারা এ সুবিধা পেয়ে আসছে। জলবায়ু তহবিল থেকেও বর্তমানে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে সুবিধা পেয়ে আসছে। কিন্তু ২০২৪ সালের পর থেকে বাংলাদেশ এসব সুবিধা আর পাবে না। ২০১২-১৫ সালে এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর যত ওডিএ বরাদ্দ ছিল, বাংলাদেশ একাই তার ৭ শতাংশ পেয়েছে। তা ছাড়া স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ ঘটলে বাংলাদেশ অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা হারাবে। সম্ভাবনা রয়েছে রফতানি বাণিজ্য কমে যাওয়ারও।

দেশের মর্যাদা বাড়ায় বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগও বৃদ্ধি পাওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম প্রয়োজন সুশাসন, দীর্ঘ দিনের সঙ্ঘাতময় রাজনীতির অবসান, জনজীবন ও প্রশাসনে অস্থিরতার অবসান। এ ছাড়াও সর্বস্তরে ব্যাপক দুর্নীতি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্বলতা এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের চাপসহ বিনিয়োগ বৃদ্ধির মতো আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করা, যা এখনো তৈরি হয়নি বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।

ads

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.