ads

চোর

ইয়াছিন খন্দকার লোভা

জসীম কাকা আমাদের দূরসম্পর্কের আত্মীয়। সম্পর্কে বাবার চাচাতো ভাই হন। বাবার মতো জসীম কাকাও ব্যাংকজব করতেন। তো গ্রামে জসীম কাকাদের ঘর চুরি হয়েছিল সেদিন। জসীম কাকা নিজের ফ্যামিলি নিয়ে থাকতেন নতুন বাড়িতে। তখন আমাদের গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। জসীম কাকার ঘরেও তাই বিদ্যুৎ ছিল না। অন্যদের মতো হারিকেন আর চেরাগ দিয়ে জসীম কাকার ঘরেও তাই রাতের বেলায় আলো জ্বলত। জসীম কাকার ঘর ছিল চার দিকের ওপরের অংশে বাঁশের বেড়া এবং নিচের অংশে টিন দিয়ে ঘেরা। আর ভিটেখানা ছিল মাটি দিয়ে তৈরি। একক নতুন বাড়ি হওয়াতে জসীম কাকার ঘর ছিল অনেকটাই নীরব। প্রায় ২০০ গজ দূরে জসীম কাকাদের পুরনো বাড়ি অবস্থিত। আমাদের বাড়িটা হাইওয়ে রাস্তার পাশে হলেও জসীম কাকা থাকতেন গ্রামের একদম উত্তরের ভেতরে। তাই জসীম কাকা নতুন বাড়িতে বসবাস করলেও নিজে ফ্যামিলি নিয়ে খুব ভয় ও আতঙ্কে থাকতেন সব সময়।
আমাদের গ্রামে তখন কিছু ছিচকে ধরনের চোরের বসবাস ছিল। চোর মানে ঘরে ঢুকে দামি জিনিসপাতির সাথে পরিহিত পুরনো কাপড়চোপড় এবং বাথরুমের বদনাটাও পর্যন্ত নিয়ে যেত। জসীম কাকার ঘরে সেদিন চুরি করার জন্য বিশেষ কারণও ছিল চোরের। জসীম কাকার ঘরে গয়না আর কিছু অর্থকড়ি কাঠের আলমারিতে জমা থাকত সব সময়। জসীম কাকার সংসারে তখন পাঁচ ও আট বছরের দুটি ছোট বাচ্চা ছিল। চোরের আতঙ্কে জসীম কাকা এবং চাচী প্রতি রাতে কাঠের আলমারি থেকে গয়নাগাটি আর অর্থকড়ি স্থান পরিবর্তন করে রাখতেন। সেগুলো ঘরের বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে রাখতেন তারা। পরদিন সকালবেলা আবার সেগুলোকে কাঠের আলমারিতে সাজিয়ে রাখতেন। যেমন প্রতি রাতে কাঠের আলমারি থেকে জিনিসগুলো সরিয়ে নিয়ে কিছুটা ঠোঙায় এবং কিছুটা পাতিলে ভরে লুকিয়ে রাখতেন। এভাবে প্রতি রাতে দামি জিনিসগুলো জায়গা অদল-বদল করে রাখতেন তারা। এই অদল-বদলের মানে ছিল চোর যেন দামি জিনিসগুলো খুঁজে না পায়। এভাবে চলতে চলতে অনেক দিন কেটে যায় জসীম কাকাদের। একদিন সন্ধ্যা রাতে জসীম কাকা বাড়ি ফিরতে কিছুটা দেরি হবে বলে অগ্রিম জানালেন চাচীকে। পরের দিনের দেরি করে বাড়ি ফেরার কথাটা জসীম কাকা চাচীকে আগের রাতে বলেছিলেন। কিন্তু কথাটা কিভাবে যেন সে রাতে চোরের কানে গিয়ে পৌঁছে যায়। এতে করে জসীম কাকাদের ঘটে যায় তির কারণ। কিন্তু চোর কান পেতে শুনে যাওয়ার বিষয়টা জসীম কাকা আর চাচী টের পেল না। সেদিন রাতে জসীম কাকা ঘরে ফিরতে দেরি হবে। জসীম কাকা না থাকাতে চাচী একলা সবকিছুর স্থান আগের মতো পরিবর্তন না করে ছোট বাচ্চা দুটোকে সাথে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। চাচী ঘুমানোর আগে ভাবছিলেন জসীম কাকা বাড়ি ফিরলে এক সাথে কাঠের আলমারি থেকে জিনিসগুলো সরিয়ে নেবেন। কিন্তু সে রাতে জসীম কাকা কখন বাড়ি ফিরবেন তার নির্দিষ্ট সময় চাচীর জানা ছিল না এমনকি জসীম কাকাও চাচীকে নির্দিষ্ট সময় বলেনি। জসীম কাকার অবর্তমানে সুযোগ পেয়ে বসল চোর। যেহেতু চুরির জন্য প্রায় প্রতি রাতেই জসীম কাকার ঘরের আশপাশে চোর ঘুরঘুর করত। চোর সেদিন রাতে শাবল দিয়ে জসীম কাকার মাটির ভিটায় সুড়ঙ্গ করে ফেলল এবং জসীম কাকার ঘরে ঢুকল। চাচী তখন বিছানায় ঘুমাচ্ছিলেন। তখন রাত প্রায় সাড়ে ১২টার মতো।
কিন্তু চোর ততণে ঘরে ঢুকে তার নিজস্ব কাজ চালিয়ে নিচ্ছিল। চোর পুরো ঘর তল্লাশি করে কাঠের আলমারি খুঁজে নিলো। চাবি লাগানো না থাকায় সহজে আলমারিটা খুলে ফেলল এবং গয়নাগাটি আর অর্থকড়ি দেখে খুশিতে যেন তখন মহানন্দিত হয়েছিল চোর। একে একে চোর কাঠের আলমারি থেকে সব জিনিস তুলে নিয়ে ব্যাগে বাঁধছিল। তখন বাইরে ছিল চাঁদনী রাত। ঘরে হারিকেন নেভানো থাকায় আলো না থাকলেও বাইরের চাঁদের আলোয় হালকা আলো দিচ্ছিল জসীম কাকার ঘরের ভেতর। হঠাৎ চাচীর ঘুম ভাঙল। চোখ মুছতে গিয়ে হালকা আলোয় দেখতে পেল আজ জসীম কাকা একাই সব জিনিস কাঠের আলমারি থেকে সরিয়ে নিচ্ছেন। কিন্তু তা দেখে চাচী তখন ঘুমের ঘোরের কারণে বুঝে উঠতে পারেনি কাকা যে সেদিন রাতে তখনো ঘরে ফেরেনি। খুশিতে আটখানা হয়ে চাচী কাকাকে উদ্দেশ করে চুপে চুপে ফুসফুস করে বলল, ‘ভালো করে সরিয়ে রেখো যেন চোরায় কিছুতেই টের না পায়।’
ঘুমের ঘোরে এ কথাটা বলে চাচী তখন আবার ঘুমিয়ে পড়লেন। অথচ ওই দিকে চোরায় বুঝতে পেরেও চুপ মেরে টুঁ শব্দ করল না। তারপর যেখান দিয়ে চোর ঘরে ঢুকেছিল ঠিক সেখান দিয়ে চুরি করা জিনিস নিয়ে পুনরায় বাইরে বের হলো না। এমনিতে গ্রামের চোর যেখান দিয়ে চুরির মতলবে ঢোকে ঠিক সেখান দিয়ে না বের হয়ে ঘরের যেকোনো বড় দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়ে। সেদিন ওই চোরটাও বড় দরজা দিয়ে বের হয়ে পড়ল। তারপর চোর বেরিয়ে যাওয়ার কিছুণ পরে জসীম কাকা বাড়ি ফিরলেন। চাচীকে দরজা খোলার জন্য ডাকতে গিয়ে দেখলেন আজ এমনিতে বড় দরজা খোলা। তা দেখে জসীম কাকার মাঝে সন্দেহ ঢুকে পড়ল। চাচীকে জোর গলায় আওয়াজ দিয়ে ঘুম থেকে উঠালেন এবং চাচীর কাছে জানতে চাইলেন আজ দরজা কেন এখনো খোলা? জসীম কাকার কথা শুনে চাচী মুহূর্তেই মাথা ঘুরিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। জসীম কাকা জলদি করে চেষ্টা চালিয়ে চাচীর মুখে জগের পানি ছিটিয়ে বেহুঁশ থেকে হুঁশ ফেরালেন। তারপর জসীম কাকা চাচীর কাছ থেকে জানতে চাইলেন চাচী ঘুরে পড়ে যাওয়ার মানে কী? কিন্তু চাচীর মুখ থেকে কোনো কথাই তখন বের হচ্ছিল না। হাউমাউ করে কান্নাকাটি শুরু করে দিলেন চাচী। কিন্তু জসীম কাকা ঘটনার কিছুই বুঝতে পারছিলেন না ওই মুহূর্তে। চাচী হয়তো জসীম কাকাকে ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছিলেন না। একপর্যায়ে জসীম কাকার চেঁচামেচিতে চাচী ততণে মুখ খুলতে বাধ্য হলেন। চাচী জসীম কাকাকে বললেন, সে আজ আলমারি থেকে একটি জিনিসও এদিক ওদিক অদল-বদল না করেই তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিল। চাচী আরো বললেন, রাতে যখন হঠাৎ ঘুম ভাঙল তখন ঘুমের ঘোরে চোখ ভালো করে না মেলে চোরকে জসীম কাকা ভেবে বলেওছিল যে, ‘আজ তুমি একা একাই কাঠের আলমারি থেকে সব জিনিস সরিয়ে নিচ্ছ? ভালো করে সরিয়ে রাখো যেন চোর বাইর থেকে টের না পায়। তাই পুনরায় নিশ্চিন্তে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।’
কথাগুলো চাচীর মুখ থেকে শুনে জসীম কাকা দৌড়ে গিয়ে আলমারিটা চেক করে দেখলেন আলমারির ভেতর কিছুই নেই। সবই চোর নিয়ে গেছে। আহ তখন জসীম কাকার মাথায় হাত আর চাচীর সে কি কান্দন বিলাপ।

 

ads

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.