বিবেক

চারাগল্প
মোনোয়ার হোসেন

এত দিন যে তকমাটা গায়েই মাখিনি। হেসে উড়িয়ে দিয়েছি বারবার। আজ মনে হচ্ছে সেই তকমাটাই সত্যি। আমি বোকা! আমাকে দিয়ে কিছুই হবে না।
আমাদের অফিসের পিয়নকে নিয়ে দৈনিক পত্রিকায় আজ একটা খবর বেরিয়েছে। পিয়ন থেকে কোটিপতি!
খবরটা পড়েই মাথাটা ভনভন করে ঘুরতে লাগল। পরে খবরের সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে যেন কেঁচো খুঁড়তেই সাপ বেরিয়ে এলো!
শুধু পিয়ন কেন? অফিসের মালীরাও কোটিপতি বনে গেছেন। সহকর্মীরা ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাটের পাশাপাশি বিদেশেও ফ্ল্যাট ক্রয় করছেন।
আর আমি?
মাসের শেষ দিকে চলতে পারি না। বিশ তারিখ পার হলেই হাতে যেন শনি এসে বসে। ধারদেনা করে চলতে হয়।
বউ বলে, সবাই বাড়ি করছে। গাড়ি করছে। আর তুমি শুধু চলতেই পারো না? তোমাকে দিয়ে কিছুই হবে না। তুমি একটা আমড়া কাঠের ঢেঁকি! বোকা।
আমি হাসি। হেসেই বউয়ের কথাটা উড়িয়ে দেই।
কিন্তু আজ মনে হচ্ছে বউয়ের কথাটাই সত্যি। আমি বোকা! বোকা না হলে এমন হয় নাকি? পিয়ন, মালী হচ্ছে কোটিপতি। আর আমি মাসেই চলতেই পারি না!
সাদনান সাহেব বললেন, স্যার, আপনি বিষয়টা একটু ভেবে দেখুন।
চোখ তুলে তাকালাম সাদনান সাহেবের দিকে। এ অসম্ভব সাদনান। টাকার বিনিময়ে আমি অযোগ্য কাউকে চাকরি দিতে পারব না।
আপনি যোগ্যদেরই চাকরি দেবেন স্যার।
কিভাবে?
এক্সপার্ট সাদনান সব কিছু বেশ ভালোভাবে গুছিয়ে বুঝিয়ে বললেন আমাকে। স্যার, যাদের মেধা আছে আপনি শুধু তাদেরই চাকরি দেবেন এবং টাকাও নেবেন।
কিভাবে?
এখন সবাই জানে টাকা ছাড়া চাকরি হয় না। সবাই চাকরির জন্য টাকা ধরে আছে। যাদের চাকরি হবে, আপনি শুধু তাদের কাছেই টাকা নেবেন।
যুক্তিটা বেশ পছন্দ হলো আমার।
রাজি হয়ে গেলাম।
লোকটার কাছে টাকাটা নিয়ে নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হচ্ছে এখন। ভেতরটা কেমন খচখচ করছে। ডায়েরি বের করে ফোন নাম্বার নিয়ে লোকটাকে কল দিলাম।
বাবাজি, আপনার ছেলের তো চাকরিটা হয়ে গেছে। আপনি একটা সত্য কথা বলবেন?
কী কথা স্যার?
আপনি এই টাকাগুলো কিভাবে দিলেন?
সাথে সাথে ওপাশে কান্নাজড়ানো ভারী কণ্ঠে লোকটা বললেন, আমার শেষ সম্বল একটু আবাদি জমি ছিল স্যার। সেই জমিটা বিক্রি করে দিয়েছি।
বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। কে যেন বুকে হাতুড়ি দিয়ে পেটাতে লাগল। নাহ, লোকটার এই জমি বিক্রি করা কষ্টের টাকা আমি নিতে পারব না।
ড্রাইভারকে ডেকে বললাম গাড়ি বের করতে।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখছি। আজকের বৃষ্টিটাকে আমার বড্ড অচেনা লাগছে। এ যেন আকাশের শীতল বৃষ্টি নয়, কোনো চোখের কষ্টের গরম পানি। বৃষ্টি হয়ে ঝড়ছে। এই বৃষ্টি আমার শরীরে এক ফোঁটা পড়লেই আমি পুড়ে ছাই হয়ে যাবো। ড্রাইভারকে বললাম, আরো দ্রুত গাড়ি টানো।
লোকটার বাসায় গিয়ে টাকাটা ফেরত দিয়ে বললাম, বাবাজি, আপনার টাকাটা রাখুন। আমি আপনার টাকা নিতে পারব না। কোনো ভয় নেই, আপনার ছেলের এমনিতেই চাকরি হবে। লোকটাকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে আমি দ্রুত গাড়িতে উঠে বসলাম।
গাড়ি ছাড়ার আগে একবার পেছনে তাকালাম। দেখি লোকটা টাকাগুলো গভীর মমতায় বুকে জড়িয়ে ধরে আছে। তার চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.